ভোটার্থী: বাংলাদেশের ত্রয়োদশতম জাতীয় নির্বাচনের দিন, ঢাকা, ১২ ফেব্রুয়ারি। ছবি: রয়টার্স।
বাংলাদেশের নির্বাচনে যে ফলাফল আশা করা যাচ্ছিল, সেই ফলাফলই হয়েছে। আশা থেকে আশঙ্কার দূরত্ব অবশ্য খুব লম্বা নয়। কিন্তু মব আর ‘বট’-কে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের সামগ্রিক প্রতিচ্ছবি বলে ধরে নেওয়ার কারণ আছে বলে মনে হয়নি। সেই ভরসা তাঁরা নির্বাচনে তাঁদের মত প্রকাশের মধ্যেও অটুট রেখেছেন। সাধারণ ভাবে মৌলবাদ, স্বৈরতন্ত্র ইত্যাদি জাঁকিয়ে বসার সুযোগ পায় কোনও এক টালমাটাল সময়ের কারণে। ভারতের ক্ষেত্রে মৌলবাদের উত্থানে যদিও তেমন দুঃসময়ের আবহও প্রয়োজন হয়নি। বাংলাদেশ একটা টালমাটালের মধ্যে দিয়ে গেল বটে, কিন্তু মৌলবাদকে ক্ষমতায় আনার ভুলটি করে বসল না। এতে যদি ভরসা না-জাগে, তো জাগবে কিসে? এ বার এই ভরসা তারেক রহমানের নেতৃত্বে কতখানি আগুয়ান হতে পারবে, সেটা ভবিষ্যৎ বলবে। তার আগে পদ্মার এ-পার থেকেও কিছু হিসেব মিলিয়ে নেওয়া ভাল।
জুলাই আন্দোলনের পর থেকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে যে অবনতি হয়েছে, সেটা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারত খুব বেশি কোলাকুলি করতে চায়নি। নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষা করেছে। নির্বাচন এবং গণতন্ত্রের প্রতি এতখানি আস্থা দেখলে এমনিতে আনন্দ হওয়ারই কথা। কিন্তু সেই যুক্তিতে আফগানিস্তানের অনির্বাচিত সরকারের সঙ্গে দহরম মহরমের ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া কঠিন। সেই যুক্তিতে বাংলাদেশের অতীত নির্বাচন নিয়ে যখন বারে বারে প্রশ্ন উঠেছে, তখন চোখ বুজে থাকার ঔচিত্য নিয়েও প্রশ্ন থাকে। মেলানো যায় না আরও সব তত্ত্ব।
এই যেমন এখন একের পর এক রাজ্য জুড়ে ভোটার তালিকা ঝাড়াই বাছাই চলছে। বলা হচ্ছে, চালে নাকি কাঁকর থিকথিক করছে। কারা সেই কাঁকর? ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’। কিছুতেই বুঝে ওঠা যায় না, ও-পারে এত বছর ধরে ‘বন্ধু সরকার’ থাকা সত্ত্বেও কোটি কোটি অনুপ্রবেশকারী এ-দেশে ঢুকে পড়ল? ‘বন্ধু’র সঙ্গে এ কেমন বোঝাপড়া? এ বার বাংলাদেশ নতুন নির্বাচিত সরকার পাচ্ছে। আমাদের সরকার বাহাদুর কি কূটনীতির নতুন অধ্যায় শুরু করবেন? হিমন্তবিশ্ব শর্মার ঘৃণাভাষণে ক্ষান্তি দেবেন কি?
বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বেড়ে ওঠা ভারত-বিদ্বেষ নিয়ে আলাপ-আলোচনা সর্বত্র। এতটাই যে, মাঝেমধ্যে ভ্রম হয়, এই বিদ্বেষে আমরা কি সত্যিই অখুশি? না কি এই বিদ্বেষ, এই সংখ্যালঘু পীড়নের মতো বিষয় বেঁচে থাকলেই আখেরে সুবিধা? যদি সত্যি সত্যি এই বিষিয়ে যাওয়া সম্পর্ক, সংখ্যালঘু নিরাপত্তার মতো প্রশ্নগুলো আমাদের কুরে খেত, কিছুটা আত্মসমীক্ষার প্রয়োজনও অনুভূত হত। সেটা ঘটে উঠতে দেখিনি। এক বারও নিজের দিকে আয়না ধরে বলতে ইচ্ছা হয়নি, স্ব-দেশে সংখ্যালঘুদের প্রতি যত্নবান না-হলে অপরের দিকে আঙুল তোলা কঠিন হয়ে যায়। নিজের মাটিতে মৌলবাদকে ঘাস-জল দিলে পড়শি দেশের মৌলবাদও বাড়তি উৎসাহ পায়। এ-দেশে মহম্মদ আখলাক সুরক্ষিত থাকলেই ও-দেশে দীপু দাস সুরক্ষিত থাকবেন— এমন নিশ্চিতি হয়তো দেওয়া যায় না। কিন্তু আখলাককে নিরাপদে রাখতে পারলে দীপু হত্যায় প্রতিবাদের জোর অনেক বাড়ে। আমরা সে পথে হাঁটিনি। বরং বাংলাদেশে হিন্দুর প্রাণহানিতে ক্ষুব্ধ হয়ে এ দেশের রাজ্যে রাজ্যে বাংলাভাষীদের উপরে আক্রমণ নামিয়ে এনেছি। বাংলাদেশ-পাকিস্তানকে একাসনে না বসানোর কূটনীতি জলাঞ্জলি দিয়ে বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে ফেরত পাঠিয়েছি।
আসলে আমাদের ভারী রাগ হয়েছে। আমরা ধরে নিয়েছিলাম, পদ্মা-পার চিরটা কাল আমাদের ‘বড়দাদা’ বলে ডেকে ধূপধুনো দেবে। ভুলে গিয়েছিলাম, দীর্ঘ দিন ধরে দাদাগিরি চালিয়ে গেলে খাঁটি ভালবাসার ধারও ক্ষয়ে যায়। আন্তরিক কৃতজ্ঞতাও একটা সময়ের পর অনুগ্রহের বোঝা বলে মনে হতে থাকে। বাংলাদেশে একাধিক মহল থেকে সুপরিকল্পিত ভাবে ভারত-বিদ্বেষ উস্কে দেওয়া হয়েছে, ঠিকই। তার পিছনে সেখানকার নানা গোষ্ঠীর কায়েমি স্বার্থ অবশ্যই সক্রিয়। কিন্তু এও ঠিক, সেই বিদ্বেষ উস্কে দেওয়া সহজ হয়েছে জমিটা তৈরি ছিল বলে। আর সেই জমি তৈরির কাজে তালি এক হাতে বাজেনি। আর সব কিছু বাদ দিলেও এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, অতিরিক্ত হাসিনা-কেন্দ্রিকতা ভারতের পক্ষে ভাল বিজ্ঞাপন হয়নি। ঠিক যে ভাবে অস্বীকার করা যাবে না, বাংলাদেশ যে উত্তাল সময়টা পার করল, তার দায় শেখ হাসিনারই। অতীতের নির্বাচন সুষ্ঠু ভাবে হতে দিলে এবং জুলাই আন্দোলনের উপরে অবর্ণনীয় দমনপীড়ন নামিয়ে না আনলে তাঁকে দেশ ছেড়ে পালাতে হত না। এ স্বখাতসলিল তিনি এড়াতে পারতেন। বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পন্ন হল আওয়ামী লীগকে সরিয়ে রেখে— ২০২৪-র সালের জুন মাসেও এমন একটি নিকট ভবিষ্যতের কথা কল্পনা করা গিয়েছিল কি? এই অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছেন হাসিনা নিজেই, এটা দুঃখের হলেও সত্য বটে।
এই দুঃখজনক সত্য থেকেই কিছু শিক্ষা নেওয়ার অবকাশ আছে। সকলের তরফেই আছে। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে যোগ দিতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু তাই বলে বাংলাদেশ থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলার চেষ্টা হলে সেটাও ফ্যাসিবাদের আর এক অবয়বই তৈরি করবে। আজ আওয়ামীকে যে দিনটা দেখতে হল, ভবিষ্যতে আওয়ামী-বিরোধীদের জন্য অনুরূপ একটি দিন অপেক্ষা করে থাকতে পারে। সুতরাং গা-জোয়ারির রাস্তায় না-হেঁটে, মৌলবাদকে শক্তি বাড়াতে না-দিয়ে, গণতন্ত্রকে মজবুত করাটাই কাজের কাজ। জামায়াতের সঙ্গে জোটে না গিয়ে বিএনপি এই গুরুদায়িত্বটি কী ভাবে সামলায়, দেখার আগ্রহ থাকবে। তবে এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগেরও অনেকখানি দায়িত্ব থেকে যায়। তাঁরা নিজেদের ভুল শুধরে নেওয়ার কথা ভাববেন কি না, সেটা তাঁরাই ঠিক করবেন। দলনেত্রী হাসিনা অবশ্য প্রাথমিক ভাবে ৫০ শতাংশ ভোট পড়ার হিসেবকেই নিজের জয় বলে ধরে নিয়েছিলেন। বহু আওয়ামী সমর্থক ভোট দিতে যাননি, এ কথা অনস্বীকার্য। ভোটে কিছু বেনিয়ম কোথাও হয়নি, এমনও নিশ্চয় নয়। কিন্তু চূড়ান্ত গুনতিতে প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছেন। তাঁরা কি ভোটার পদবাচ্য নন? হাসিনা নিশ্চয় ভুলে যাননি, ২০২৪-এর নির্বাচনে কত ভোট পড়েছিল! ৪১.৮ শতাংশ। আর নদীর এ-পার থেকে আওয়ামীহীন নির্বাচন নিয়ে যাঁরা চোখের জল ফেলছেন, তাঁদের কথা একেবারেই আলাদা। কংগ্রেসমুক্ত ভারতের স্লোগান তাঁদের উল্লসিত করে, আওয়ামী নিয়ে কাতর। বঙ্গবন্ধুর মূর্তিতে হাত পড়লে উদ্বেগ, নিজে নাথুরাম গডসের পূজারি। স্বদেশে সাংবাদিকরা জেলে যাক, প্রথম আলোয় হামলা হলে দুশ্চিন্তা! এঁদের কুম্ভীরাশ্রু নিয়ে যত কম বলা যায়, তত ভাল।
ছায়ানট-প্রথম আলো-দীপু দাস-ধানমন্ডির হামলা— বাস্তবিকই স্তম্ভিত করে দেওয়ার মতো ঘটনা সব ক’টাই। এই দেড় বছরে বাংলাদেশে এমন আরও অজস্র ঘটনা ঘটেছে। হাসিনার আমলেও ঘটেনি, এমন নয়। যে কোনও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের তাতে স্তম্ভিত হওয়ারই কথা। হওয়া উচিত। কোনও সন্দেহ নেই তাতে। সন্দেহটা অন্যত্র। শুভবুদ্ধির শর্ত বলে যে, আগে ঘর তবে পর। যে ঘটনা নিজের দেশে ঘটলে স্তম্ভিত হই না, পড়শি দেশে ঘটলে চোখ কপালে তুলি কেন? তেমন যখন ঘটে, তখন শুভবুদ্ধির মোড়কটিকে নিয়েই সন্দেহ জাগে। সন্দেহ জাগে, ‘গেল গেল’ রব তোলার পিছনে অন্য অঙ্ক কাজ করছে— এক) হাসিনার পতন মানেই বাংলাদেশের পতন, এই সমীকরণটিকে মান্যতা দেওয়ার চেষ্টা, দুই) ‘বিপন্ন হিন্দু’র জিগিরকে শক্তিশালী করে ভোট গোছানোর ফন্দি। খেয়াল করলেই দেখা যাবে, বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন নিয়ে এ-পারে যত উত্তেজনা, বাংলাদেশের গণভোট নিয়ে তার কণামাত্র নেই। কারণ গণভোটের বিষয়ে আলোচনা করতে হলে জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনা করতে হয়, জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে জুলাই আন্দোলনকে একটা পর্যায় অবধি মান্যতা দিতে হয়। জুলাই আন্দোলনকে মান্যতা দিতে হলে হাসিনা-কেন্দ্রিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হয়।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র। তার নাগরিকেরা তাঁদের আশা-আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন। এই নির্বাচনে তাঁরা তাঁদের জনমত প্রকাশ করেছেন। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলে সংবিধানের সুরক্ষায় সায় দিয়েছেন। মৌলবাদ প্রত্যাখ্যান করেছেন। সেই সঙ্গে অনুচ্চারে আমাদের বলে দিয়েছেন, যাও সবে নিজ নিজ কাজে।