সময়টা ১৮৭৬-৭৮। ভারতে তখন ব্রিটিশ শাসন। সেই সময় এক অভূতপূর্ব দুর্ভিক্ষে দক্ষিণ ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতের একাংশে ক্ষুধার্ত মানুষের ঢল নামল রাস্তায়। একমুঠো খাবারের খোঁজে, কঙ্কালসার, ধুঁকতে থাকা চেহারা নিয়ে। আলোকচিত্রগুলিতে ধরা পড়েছিল সেই মর্মান্তিক ছবি। পর পর অনাবৃষ্টিতে কৃষিজমি ফেটে চৌচির। জল নেই, ফসল নেই, কাজ নেই। ব্রিটিশ শাসনের উদাসীনতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছিল। পরিণতি, দুর্ভিক্ষ, রোগ এবং অনাহারে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু।
এর কারণ হিসাবে পরবর্তী কালের গবেষণায় একটি বিশেষ ধরনের শক্তিশালী প্রাকৃতিক অবস্থাকে দায়ী করা হয়— সুপার এল নিনিয়ো। অবশ্যই ইতিহাস কখনও হুবহু ফিরে আসে না। দেড়শো বছর আগের ভারত আর আজকের ভারত এক নয়। কিন্তু ইতিহাস সতর্ক করে। কারণ বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, এ বছর আবারও একটি শক্তিশালী, এমনকি অতি-শক্তিশালী সুপার এল নিনিয়ো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অভিজ্ঞতা বলে, এল নিনিয়ো-র প্রভাব শুধুমাত্র আবহাওয়ার ক্ষেত্রটিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, ভারতের কৃষি, খাদ্য, জ্বালানি, মূল্যবৃদ্ধি, সরকারি অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা— সব কিছুর সঙ্গেই এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
এল নিনিয়ো নতুন কোনও ঘটনা নয়। দুই থেকে সাত বছর অন্তরই এর আবির্ভাব ঘটে। মধ্য ও পূর্ব ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠ অস্বাভাবিক ভাবে উষ্ণ হয়ে উঠলে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার স্বাভাবিক ছন্দ বদলে যায়। কোথাও খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও তাপপ্রবাহ। তার উল্টো চরিত্র লা নিনা। কিন্তু যখন এই উষ্ণায়ন অত্যন্ত তীব্র হয়ে ওঠে, তখন তাকে বলা হয় ‘সুপার এল নিনিয়ো’। ইতিহাস বলছে, সুপার এল নিনিয়োর অভিঘাত একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। যেমন, ১৮৭৬-৭৮ সালের মধ্যে খরা পরিস্থিতি শুধুমাত্র ভারতেই নয়, থাবা বসিয়েছিল চিনেও। রেহাই পায়নি ব্রাজ়িলের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলও। উত্তর আমেরিকায় দেখা গিয়েছিল অদ্ভুত তাপমাত্রা বৃদ্ধি। বলা হয়, সামগ্রিক ভাবে বিশ্বের জনসংখ্যার ৩-৪ শতাংশ মুছে গিয়েছিল এর প্রভাবে।
ভারত শেষ বার শক্তিশালী সুপার এল নিনিয়োর মুখোমুখি হয়েছিল প্রায় এক দশক আগে। তখনও বর্ষায় ঘাটতি, কৃষিক্ষেত্রে খরা, জলাধারে জলের সঙ্কট এবং খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি দেশকে চাপে ফেলেছিল। এ বার পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হতে পারে। কারণ, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির মাত্রা তিন ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভারতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা বর্ষা। দেশের মোট বৃষ্টিপাতের প্রায় সত্তর শতাংশ আসে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর মাধ্যমে। আবার কৃষিজীবী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনও খরিফ মরসুমের চাষের জন্য সরাসরি বর্ষার উপর নির্ভরশীল। সেচব্যবস্থা বিস্তৃত হয়েছে, প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে, কিন্তু প্রকৃতির উপর নির্ভরতা পুরোপুরি কমেনি। সমস্যা শুধু কতটা বৃষ্টি হল, তা নয়; কখন বৃষ্টি হল, কৃষির ক্ষেত্রে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। খরিফ চাষের মরসুমে জুন থেকে অগস্টের মধ্যে যদি বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দেয়, তবে বীজ বপনই ব্যাহত হবে। আবার মরসুমের শেষ দিকে বৃষ্টি বাড়লে উৎপাদিত ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশের ডাল উৎপাদনের বড় অংশ মহারাষ্ট্রে হয়, অথচ সেখানে এখনও বিপুল পরিমাণ জমি বৃষ্টিনির্ভর। ফলে বর্ষার ঘাটতি সরাসরি উৎপাদনে আঘাত হানতে পারে। ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক হলেও, জলাধারের স্তর নেমে গেলে পরবর্তী রবি শস্যের উপর তার প্রভাব পড়বে।
কৃষিক্ষেত্রের সমস্যার অর্থ কেবল কৃষকের সমস্যা নয়। ভারতের মতো দেশে কৃষি এখনও খাদ্যমূল্যের অন্যতম প্রধান নিয়ামক। ডাল, তৈলবীজ, আনাজপাতি কিংবা পশুখাদ্যের উৎপাদন কমে গেলে তার প্রভাব দ্রুত বাজারে পৌঁছয়। খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের উপর সবচেয়ে বেশি চাপ সৃষ্টি করে। কারণ তাদের আয় সীমিত, কিন্তু আয়ের একটি বড় অংশ খাদ্য কেনার জন্যই ব্যয় হয়।
এই কারণেই এল নিনিয়ো শুধু আবহাওয়ার ঘটনা নয়; এটি মূল্যবৃদ্ধির ঘটনাও। বহু ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, শক্তিশালী এল নিনিয়োর বছরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দ্রুত বেড়ে যায়। কৃষি উৎপাদন কমলে সরবরাহ কমে, দাম বাড়ে, এবং সেই অভিঘাত অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাও তখন কঠিন হয়ে ওঠে। সমস্যা এখানেই শেষ নয়। কম বৃষ্টি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনকেও ব্যাহত করতে পারে। জলাধারের স্তর নেমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ বাড়বে। তার ফলে বিকল্প জ্বালানির উপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। বিশেষত এমন সময়ে যখন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার নিজেই অস্থির।
এ বারের সঙ্কটকে আলাদা করে দেখার কারণও এখানেই। পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষ এবং হরমুজ় প্রণালীকে ঘিরে অনিশ্চয়তা ইতিমধ্যেই ভারতের তেল আমদানির উপর চাপ তৈরি করেছে। কেন্দ্রীয় সরকার যতই বিকল্প পথে জ্বালানির জোগান নিয়ে আশ্বস্ত করুক, বাজারে পেট্রল-ডিজ়েলের দাম ইতিমধ্যেই কয়েক দফা বেড়েছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি মানেই পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি। আর পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি মানেই খাদ্য থেকে শিল্পপণ্য— প্রায় সব কিছুর দাম বাড়ার সম্ভাবনা।
যুদ্ধ পরিস্থিতি সারের জোগানকেও প্রভাবিত করতে পারে। ভারতের কৃষি এখনও রাসায়নিক সারের উপর উল্লেখযোগ্য ভাবে নির্ভরশীল। সারের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়ে। উৎপাদন খরচ বাড়লে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন, আবার সেই খরচের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার উপরও বর্তায়। ফলে কৃষি, জ্বালানি এবং আন্তর্জাতিক সংঘর্ষ— তিনটি আলাদা ক্ষেত্র একটি বিন্দুতে এসে মিলিত হচ্ছে। সরকারের সামনেও তাই কঠিন সমীকরণ। এক দিকে খাদ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অন্য দিকে নাগরিককে কিছুটা স্বস্তি দিতে জ্বালানি ও সারে ভর্তুকি দিতে হবে। খাদ্যশস্যের মজুত বাড়ানো, আমদানির ব্যবস্থা করা, কৃষকদের সহায়তা করা— সব কিছুর জন্যই অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ, জলবায়ুগত বিপর্যয়ের অভিঘাত শেষ পর্যন্ত সরকারি অর্থব্যবস্থাতেও পৌঁছতে পারে।
তবে খরা পরিস্থিতির সবচেয়ে কম আলোচিত অভিঘাতটি অর্থনীতিতে নয়, সমাজের মধ্যে নিহিত। বিশেষ করে নারীদের জীবনে। ভারতের বহু অঞ্চলে গৃহস্থালির দৈনন্দিন জল সংগ্রহের দায়িত্ব এখনও মূলত মেয়েদের কাঁধেই। জল যত দূরে সরে যায়, তাঁদের শ্রমও তত বাড়ে। আরও বেশি পথ হাঁটতে হয়, আরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয় জল সংগ্রহের লাইনে। এই অতিরিক্ত শ্রমের অর্থ শুধু শারীরিক কষ্ট নয়। এর অর্থ শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়া, আয়ের কাজে কম সময় দেওয়া, এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সম্ভাবনা সঙ্কুচিত হয়ে আসা। বহু গবেষণাই দেখিয়েছে, জলসঙ্কটের প্রথম অভিঘাতটি পড়ে মেয়েদের উপর। খরা তাই শুধু কৃষির সঙ্কট নয়; তা লিঙ্গ-সাম্যের সঙ্কটও। অন্য দিকে, দিনের বেলা তাপপ্রবাহ যত বাড়ে, শ্রমিকের শ্রমঘণ্টা সঙ্কুচিত হয়। দিনের অনেকটা সময় কর্মহীন অবস্থায় তাঁরা বাড়িতে কাটাতে বাধ্য হন। রোজগেরে পুরুষ কর্মহীন অবস্থায় গৃহে আবদ্ধ হলে গার্হস্থ হিংসা যে লক্ষণীয় বৃদ্ধি পায়, কোভিডকাল তা দেখিয়েছে।
তা ছাড়া খরা দীর্ঘস্থায়ী হলে গ্রাম থেকে শহরে কাজের খোঁজে মানুষের স্থানান্তর বাড়ে। কৃষিকাজে আয় কমে গেলে পরিবারগুলি বিকল্প জীবিকার সন্ধান করে। ফলে নগর পরিকাঠামোর উপরও নতুন চাপ তৈরি হয়। অর্থাৎ, একটি আবহাওয়াগত ঘটনা ধীরে ধীরে অর্থনীতি, সমাজ এবং জনসংখ্যার গতিবিধিকেও প্রভাবিত করতে শুরু করে।
ভারত অতীতেও শক্তিশালী এল নিনিয়োর মুখোমুখি হয়েছে। ফলে পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা আজ অনেক বেশি। আবহাওয়ার পূর্বাভাস উন্নত হয়েছে, খাদ্যশস্যের সরকারি মজুত রয়েছে, দুর্যোগ মোকাবিলার কাঠামোও আগের তুলনায় শক্তিশালী। তবুও উদ্বেগের কারণ রয়েছে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে প্রতিটি এল নিনিয়ো আগের তুলনায় আরও তীব্র অভিঘাত সৃষ্টি করতে পারে।
সুপার এল নিনিয়ো আসবে কি না, তার তীব্রতা কত হবে, ভারত মহাসাগরের পশ্চিম ভাগে উষ্ণতা বৃদ্ধি এর প্রভাবকে কিছুটা কমাবে কি না, তা আগামী কয়েক মাসেই স্পষ্ট হবে। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত— জলবায়ুগত বিপর্যয় কৃষি, শিল্প, মূল্যবৃদ্ধি, রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি এবং সামাজিক জীবনের প্রতিটি স্তরকে স্পর্শ করে। দেড়শো বছর আগে ভারত সেই শিক্ষা পেয়েছিল ভয়াবহ মূল্যে। এ বছর সেই সতর্কবার্তা উপযুক্ত গুরুত্ব পাবে তো?