কী কোট চান? মোদী কোট, জোধপুরি কোট, প্রিন্স কোট?” যে গলাবন্ধ জ্যাকেটটি দেখানো হল, ছোট থেকে তাকে ‘জওহর কোট’ নামেই জানতাম!
“এটা ‘মোদী কোট’? তা হলে ‘জওহর কোট’ কোনটা?” বৃদ্ধ মানুষটি উত্তর দিলেন, “আসল নাম ‘বন্ধগলা কোট’ বা ‘বণ্ডি’। দর্জিরা ওই নামেই কাপড় কাটেন এটা বানানোর জন্য। আমরাও ‘জওহর কোট’ই বলতাম, এখন সবাই বলে ‘মোদী কোট’। ওই শুনে শুনে আমার ছেলে কাস্টমারদের দেখানোর সময়ে ‘মোদী কোট’-ই বলে।”
‘জওহর কোট’ কি ‘মোদী কোট’-এ পরিবর্তিত? নিউ মার্কেট থেকে গড়িয়াহাটের দোকান, ফুটপাত থেকে শপিং মল— সর্বত্র খুঁজলাম। নিউ মার্কেটের কিছু পুরনো দোকান ছাড়া সর্বত্র শুনলাম, ‘ও! মোদী কোট খুঁজছেন?’ ভারতীয় রাজনীতিতে পটপরিবর্তন মানে যে মানুষের স্মৃতিকেও সমূলে উপড়ে ফেলা, এই অনুভূতিই প্রবল হচ্ছিল।
নিউ মার্কেটের পুরনো দোকানের মালিক জ়াকির আলি জানালেন, জওহর কোট বা নেহরু কোট আর মোদী কোট একই দেখতে হলেও ফারাক সূক্ষ্ম। “সময় কা দূরি জ্যায়সা!”— এত বড় দার্শনিক অনুভূতির পরও নির্লিপ্তির রেশ রেখেই বললেন, “জওহর কোট ছিল পিয়োর খাদি কাপড়। মোদী কোটে লিনেন, মটকা সিল্ক, পলিয়েস্টার মেশানো। জওহর কোটের চেয়ে সামান্য দৈর্ঘ্যে বড়। বোতামেও সূক্ষ্ম ফারাক। মোদী কোটের রংও একটু বেশি উজ্জ্বল।”
“এখনও কি কেউ জওহর কোট চান?” হাতের কাপড় থেকে চোখ না সরিয়েই জবাব, “যে নামেই ডাকুক, আসলে তো সেই একই জিনিস চায় সবাই। যার যার সুবিধামতো উল্টেপাল্টে নেয় আর কী।” এ কেবল ভারত নয়, গোটা পৃথিবীরই সহজ সত্য। একই বস্তুকে ভিন্ন নামে ডাকার অমোঘ সত্য এই বঙ্গজাতির চেতনায় উপলব্ধ করিয়েছিলেন শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব।
ফোন করলাম আমাদের স্কুলের ইতিহাসের শিক্ষিকা লতিকাদিকে। বই খুলে নয়, গল্প বলার ভঙ্গিতে খিলাফত আন্দোলন থেকে অসহযোগ, পঠান, আফগান, মোগল, মরাঠা, দাক্ষিণাত্যের ইতিহাস পড়াতেন। ইতিহাসের সিধু জ্যাঠা, লতিকাদিদিমণিই জওহর কোটের উৎস জানালেন।
মোতিলাল নেহরুর স্যুট তৈরি হত লন্ডনের স্যাভিল রো থেকে। স্বদেশি আন্দোলনের ডাকে পুত্র জওহরলাল বিদেশি পোশাক বর্জন করলেন। কিন্তু কী ধরনের দেশি পোশাক পরবেন? ছোটবেলা থেকে যে অভিজাত রুচির মধ্যে বড় হয়েছেন, তার মানানসইও হতে হবে। খাদির কাপড় বেছে দেশীয় আচকানের নিখুঁত কাটে তৈরি করালেন আচকানের চেয়ে দৈর্ঘ্যে ছোট, হাতাছাড়া জ্যাকেট। ইতিহাসসচেতন নেহরু জানতেন, আচকান মোগল আমলের চাপকান বা চোগার সঙ্গে রাজস্থানি পোশাকের মিশেলে ভারতীয় আবহাওয়ার উপযুক্ত অভিজাত পোশাক। ভারতের স্থাপত্যকলার মতো পোশাকের বিবর্তনেও ইন্দো-পারসিক মিলনের ছোঁয়া সম্পর্কে তাঁর অবহিত থাকাই স্বাভাবিক। এই পোশাকেই জনসমক্ষে এলেন। জ্যাকেট বা কোটটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এক ইউনিফর্ম হয়ে উঠল।
নেহরুর পোশাক খুব পছন্দ ছিল বিটলস-এর। ষাটের দশকে বিটলস এবং শন কনোরি এই পোশাক পরে মঞ্চে উঠলে ‘জওহর কোট’ ভারতের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেল। স্যুট-টাইয়ের মতো আড়ম্বরপূর্ণ আনুষ্ঠানিক পোশাকের বিকল্প হিসাবে পূর্বের আধুনিক আভিজাত্যের প্রতীক এই পোশাকটিকে টাইম পত্রিকা ‘নেহরু লুক’ বলে অভিহিত করেছিল।
মোদী জমানার কথা আর লতিকাদি বলেননি। ২০১৫-য় বারাক ওবামা ভারত-সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পরনে পোশাকটি দেখে মুগ্ধ হয়ে ‘ফ্যাশন আইকন’ আখ্যা দিয়েছিলেন। এর পর থেকেই আন্তর্জাতিক বিপণনমাধ্যম যেন কোনও অদৃশ্য নির্দেশে ‘জওহর কোট’ শব্দবন্ধের বদলে ‘মোদী কোট’ শব্দবন্ধটির প্রচলন করতে সচেষ্ট হয়ে উঠল। অনেকের যুক্তি, নেহরু-গান্ধী পরিবারের বলয় থেকে বেরিয়ে এক নতুন ভারতের পরিচয়ের বাহক এই নামটি।
২০১৮-য় দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে-ইন’এর ভারত সফরে প্রধানমন্ত্রী এই পোশাকটি উপহার দিলেন। মুন জায়ে-ইন টুইটে বিশ্বকে প্রাপ্তির কথা জানিয়ে পোশাকটিকে ‘মোদী ভেস্ট’ সম্বোধন করলেন। ভারতের সীমানা পেরিয়ে ‘জওহর কোট’ বদলে গেল ‘মোদী কোট’-এ।
আমরা এখন বহির্বিশ্বকে অনুসরণ করি অনেক বেশি। যদিও ‘অন্তর্বিশ্ব অনুসন্ধান’— এই নামের আড়ালেই চলে আমাদের অনুসরণ। তাই ভারতের বহুসংখ্যক মানুষ, বিশেষ করে ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়া মানুষজন ও নবনির্মিত ইতিহাস পড়া নবীন প্রজন্ম, হয়তো ‘জওহর কোট’ নামটাই এক দিন ভুলে গিয়ে নতুন নামটাকেই স্বীকৃতি দেবে।
কিন্তু লতিকাদি কেন জেনে গেলেন না এই বিবর্তনের কথা? দোকান থেকে বেরিয়ে তাঁকে তো আর কখনও ফোন করাই হয়নি। স্মৃতি ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল এক দূর অতীতের কথোপকথনে। জওহর কোটের গোলাপের প্রসঙ্গেই এত কথা বলেছিলেন এক দিন। গান্ধী, নেহরু, সুভাষ, ক্ষুদিরাম, সূর্য সেন, প্রীতিলতা, মাতঙ্গিনী, বিনয়-বাদল-দীনেশের ভারতের স্মৃতি নিয়ে ২০০০ সালে ছাত্রীদের প্রিয় লতিকাদিও ইহলোক ত্যাগ করেছেন!