একটি কথা বললে দু’দিকের লোকই সম্ভবত চটে যাবেন, তবু বলি— প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকৃত প্রস্তাবে একই রাজনৈতিক ছাঁচে গড়া। তাঁরা একই রকম বর্ণময়; নিজস্ব রাজনীতির প্রতি তাঁদের অধ্যবসায়ও একই রকম নিরন্তর; এবং দুর্জনে বলবে, দু’জনের রাজনীতিই সমপরিমাণ ক্লান্তিকর। একেবারে রাস্তার রাজনীতি থেকে, কোনও বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকার ছাড়াই উঠে এসেও তাঁরা দু’জনেই কয়েক দশক ধরে নিজেদের এমন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নির্মাণ করেছেন, যা বিস্তৃত এবং সর্বগ্রাসী, যা তাঁদের নিজেদের দলকেও কার্যত গ্রাস করে ফেলেছে। বিজেপিতে মোদী ছাড়া আর কেউ গুরুত্বপূর্ণ নন। তৃণমূল কংগ্রেসেও কার্যত দিদি ছাড়া আর কেউ নেই— অন্তত অতীতে কেউ ছিলেন না। এই মিল কাকতালীয় নয়; সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিকল্পনার ফসল। পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন আসলে এই দুই ব্যক্তিত্বের সম্মুখসমর।
‘একমাত্র মুখ’ হয়ে ওঠার প্রকল্পটি মোদীর দীর্ঘ দিনের। রাজনৈতিক ইতিহাসের বিশ্লেষক ক্রিস্তফ জাফরেলো লিখেছিলেন যে, গুজরাতে বিজেপির প্রচারে ‘মোদীর ছবিই সর্ব ক্ষণ সামনে রাখা হত’, যা তাঁর ভাষায় মোদীর ‘আত্মমুগ্ধ প্রবণতা’ এবং নিজের সম্পর্কে অত্যন্ত উচ্চ ধারণার প্রতিফলন। সরকারি বিজ্ঞাপন, জনকল্যাণ প্রকল্পের হোর্ডিং, রাস্তার ধারের ব্যানার— সর্বত্র তাঁর মুখ। কিন্তু ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ যুক্তি দিয়েছিলেন, মোদী কেবল আত্মগর্বে আচ্ছন্ন নন— তিনি এক মতাদর্শগত প্রকল্পেরও ধারক। তাঁর ব্যক্তিত্বের উপর চাপানো রয়েছে হিন্দুত্বের একটি আবরণ (যা হিন্দুধর্ম থেকে পৃথক), যা ভারতীয় সমাজের বুনটকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ কারণেই তিনি কেবল আত্মকেন্দ্রিক রাজনীতিকের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক— তাঁর ছবিকে ঘিরে ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি এবং সভ্যতাগত প্রকল্প একাকার হয়ে গিয়েছে। প্রতিটি নির্বাচনী পরাজয় আর শুধু রাজনৈতিক ধাক্কা নয়— তা তাঁর কাছে ব্যক্তিগত আঘাত, যার প্রতিশোধ চাই। বিরোধী সরকার ভেঙে দেওয়া, প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে সিবিআই ও ইডি-কে প্রয়োজনীয় অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা, দিল্লি থেকে পশ্চিমবঙ্গকে গিলে ফেলার নিরলস চেষ্টা— এগুলি কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়। এগুলি এমন এক মানুষের প্রতিক্রিয়া, যিনি প্রতিরোধ সহ্য করতে পারেন না।
তবে এক জন গুজরাতি এবং এক জন নারী হিসাবে আমি বলব, আমার কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই ভারতের একমাত্র রাজনীতিক, যিনি কার্যকর এবং কৌশলী ভাবে মোদী ও বিজেপির মোকাবিলা করেছেন। আমদাবাদকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকব্যাপী সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, পশ্চিমবঙ্গের বাইরে থেকে অনেক রাজনীতিবোদ্ধাই মনে করেন, তিনি ধুরন্ধর রাজনীতিক। গুজরাতিতে একটি প্রবাদ আছে: ‘লোধু জ লোধানে কাপে’— লোহাকে কেবল লোহাই কাটতে পারে— মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই লোহা। মোদী বিজেপির রাজনীতি ও সংগঠন দলীয় উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন, আর মমতা প্রায় একাই শক্তিতে তৃণমূল কংগ্রেস গড়ে তুলেছেন।
তিনি বাংলায় ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে অন্যতম বিস্তৃত জনকল্যাণ কাঠামো তৈরি করেছেন। গুজরাত থেকেও আমরা কন্যাশ্রীর কথা শুনেছি; কিশোরীদের জন্য শর্তসাপেক্ষ নগদ সহায়তা প্রকল্প, যা ২০১৭ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জ ৬২টি দেশের ৫৫২টি সামাজিক প্রকল্পের মধ্যে সেরা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। মেয়েরা স্কুলে থাকছে। লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্প কয়েক কোটি মহিলাকে মাসিক নগদ সহায়তা দেয়— এমন এক প্রকল্প, যা এখন বাংলার গৃহস্থ অর্থনীতিতে এতটাই প্রোথিত যে, উপভোক্তারা একে অনুগ্রহ নয়, অধিকার বলে মনে করেন। স্বাস্থ্যসাথী প্রতি পরিবারে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিমা দেয়। খাদ্যসাথী ভর্তুকিযুক্ত খাদ্যশস্য দেয়। স্টুডেন্টস ক্রেডিট কার্ড উচ্চশিক্ষার অর্থ জোগায়। এর নির্বাচনী ফলও স্পষ্ট। সিএসডিএস-লোকনীতি’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ৫৩ শতাংশ মহিলা ভোটার তৃণমূলকে সমর্থন করেছেন— ২০১৯-এর তুলনায় ১১ শতাংশ-বিন্দু বেশি। মুসলিম ভোটারদের মধ্যে, যাঁরা বাংলার মোট ভোটারের প্রায় ২৭ শতাংশ, ২০২৪ সালে তৃণমূল পেয়েছে ৭৩ শতাংশ ভোট, যা ১৩ শতাংশ-বিন্দু বৃদ্ধি। এগুলি এমন এক কল্যাণরাষ্ট্রের পরিসংখ্যান, যা বাস্তবে মানুষের জীবনে পৌঁছেছে।
অন্য দিকে, মোদী শাসন করেন ১৪৫ কোটির দেশ। তাঁর আমলে ভারতের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির অবক্ষয় ঘটেছে প্রবল ভাবে, সাঙাততন্ত্র এবং বাজারে প্রতিযোগিতা নির্মূল করা জাতীয় স্তরে ক্রমে ‘স্বাভাবিক’ হয়ে উঠেছে। তৃণমূলের পেশিশক্তি প্রদর্শন উদ্বেগজনক, সংবাদমাধ্যমকে ‘শত্রু’ হিসাবে চিহ্নিত করা হতাশাজনক— এ সব মানতেই হবে। একই সঙ্গে এ কথাও স্বীকার করতে হবে যে, সর্বভারতীয় স্তরের তুলনায়, অথবা বিজেপি-শাসিত অধিকাংশ রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলি এখনও তুলনায় অনেক কম ভীত বা পক্ষপাতদুষ্ট। প্রশাসনিক কৃতিত্বও অনস্বীকার্য— গুজরাতের তুলনায় বাংলা অনেক গরিব, অথচ সেখানে অপুষ্টির হার তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে কম। প্রশাসনের অভিমুখ কোথায় কতিপয় শিল্পপতির দিকে, আর কোথায় জনগণের দিকে, পরিসংখ্যান সে কথা স্পষ্ট করে দেয়। ২০২৫-২৬ সালে বাংলার জিএসডিপি বৃদ্ধির হার ৭.৬২% হওয়ার পূর্বাভাস, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি। রাজ্যের বেকারত্বের হার ৩.৬%, জাতীয় গড় ৪.৮%। সরকারের দাবি, ১.৭২ কোটি মানুষ দারিদ্রসীমার উপরে উঠেছেন এবং ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে বেকারত্ব ছ’বছরে ৪৫ শতাংশেরও বেশি কমেছে। রাজ্য সরকারের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়; কিন্তু লক্ষ্মীর ভান্ডারের আড়াই কোটি উপভোক্তাকে অস্বীকার করা যায় কি?
এর অর্থ এই নয় যে, মমতার পক্ষে চতুর্থ বার ক্ষমতায় ফেরা সহজ হবে। অন্তত দু’টি মোক্ষম প্রশ্ন তাঁর বিপক্ষে যাচ্ছে— এক, আর জি কর-কাণ্ড; এবং দুই, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি। তবে, যত দিন যাচ্ছে, এ কথাও ততই স্পষ্ট হচ্ছে, এ দু’টি প্রসঙ্গ ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন নয়— এ বারের নির্বাচনী আখ্যান ঘুরছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনকে কেন্দ্র করে। নাম বাতিলের পরিসংখ্যান যতটুকু সামনে এসেছে, তাতে মনে হচ্ছে যে, যৌক্তিক অসঙ্গতির অজুহাতে সংখ্যালঘু ভোটারদের নাম বাদ পড়েছে জনসংখ্যায় তাঁদের অনুপাতের চেয়ে অনেক বেশি হারে। এত দিনে যে-হেতু স্পষ্ট যে, রাজ্যের মুসলমান জনসংখ্যার ভোটের সিংহভাগ তৃণমূল কংগ্রেসের দিকেই যাওয়ার সম্ভাবনা, ফলে নাম বাতিলের প্রভাবও মমতার জয়ের সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কে বাংলা শাসন করবে? পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার মানে তা প্রকৃতার্থে পরিচালিত হবে দিল্লি থেকে, দিল্লির দ্বারা, এবং দিল্লির জন্য। এই নির্বাচনে আরএসএসের অংশগ্রহণ কোনও নাগরিক সংগঠনের গণতান্ত্রিক উপস্থিতি নয়; এটি এমন এক সভ্যতাগত প্রকল্পের সুপরিকল্পিত কাজ, যার বাংলার বহুত্ববাদী, সমন্বয়বাদী, তর্কপ্রিয় সংস্কৃতির প্রতি বিশেষ আগ্রহ নেই। অন্য দিকে, মমতা তাঁর সমস্ত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, বাংলার। তাঁর জন্ম এখানে, লড়াই এখানে, হার এখানে, জয়ও এখানে। বাঙালির সামনে এখন বিকল্প অতএব দু’টি— হয় দিল্লির আধিপত্য স্বীকার করে নেওয়া; অথবা, বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক বহুত্বের উত্তরাধিকার বহন করা।
পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ মানুষেরই স্বভাবত ভিন রাজ্যে বসবাসের অভিজ্ঞতা নেই। ফলে, বিজেপির সাম্প্রদায়িক চেহারার প্রতি ভীতি থাকা সত্ত্বেও অনেকেই হয়তো ভাবছেন, তারা ক্ষমতায় এলে রাজ্যের আর্থিক উন্নতি ঘটবে। গুজরাতের বাসিন্দা হিসাবে আমি জানি যে, সেই ‘ভাইব্র্যান্ট’ রাজ্য মোটেই সবার জন্য সমান নয়। ২০০২ সালের পর সেখানে বৈষম্য ও বিভাজন অনেক বেশি বেড়েছে। যে কোনও আর্থ-সামাজিক সূচকই বলবে, গুজরাতে সাধারণ মানুষ ভাল নেই। গুজরাতে বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিকেট স্টেডিয়াম হয়েছে; বাংলায় প্রতি মাসে আড়াই কোটি মহিলার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকছে। উন্নয়নের জন্য কোনটা বেশি প্রয়োজন, বুঝতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
লেখার গোড়ায় বলেছিলাম, মোদী ও মমতার রাজনৈতিক ছাঁচটি একই। কিন্তু, ছাঁচই তো শেষ কথা নয়। কার রাজনীতি কাকে জনগণের প্রতি বিশ্বস্ত করেছে, আর কাকে কতিপয় শিল্পপতির প্রতি, কার শাসন শেষ অবধি সাধারণের স্বার্থের অনুকূল— সে কথাও একই রকম গুরুত্বপূর্ণ। আমার বিশ্বাস, বঙ্গবাসী উন্নয়নের স্বরূপ চিনতে ভুল করবেন না।