২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারপর্বে আমাদের গৃহপরিচারিকা এক দিন খুব উত্তেজিত হয়ে এসে বলল, বিখ্যাত গায়িকা-প্রার্থী নির্বাচনী প্রচারে বেরিয়ে তার বাড়ির দাওয়ায় বসে জল চেয়ে খেয়েছেন, মিষ্টি করে জিজ্ঞেস করেছেন তার কোনও সমস্যা আছে কি না। সে আপ্লুত হয়ে বলেছে, সামনে কেষ্টপুর খালের জল উপচে আসে, এটুকু যা সমস্যা। বর্ষায় তার টালির ছাদের ফুটো দিয়ে জল পড়ে, করোনাকালে স্কুল বন্ধ হয়ে গিয়ে (স্মার্টফোন পেয়েও) তার ছেলেকে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়, তার মা কিছু দিন আগে পা ভেঙে বীভৎস যন্ত্রণা পেয়ে মারা গেল সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থা ও অসংবেদনার কারণে— এগুলো তার কোনও সমস্যাই মনে হয়নি। আমাদের দাবিদাওয়া সব যদি স্থানীয় পরিসরেই সীমাবদ্ধ, তা হলে শুধু পুরসভার নির্বাচন করলেই তো গণতন্ত্র সার্থক হয়। এত ঘটা করে বিধানসভা, লোকসভা নির্বাচনের দরকার কী?
নীতিনির্ধারণ নির্বাচকমণ্ডলীর গণতান্ত্রিক এক্তিয়ারে পড়ে না। এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রীয়তার অবক্ষয়ের ফলে রাজ্য স্তরে নীতিনির্ধারণের গুরুত্ব কম। তা ছাড়া নীতি তো সব রাজনৈতিক দলেরই এক, যে কারণে আপসে লড়া এবং সহজেই দলবদল। নীতি বলতে খয়রাতি, ডুবন্ত মানুষের হাতের কাছে খড়কুটো হিসেবে যার মূল্য থাকলেও সত্যি করেই সশক্তিকরণে সহায়ক নয়, তা ছাড়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার নিরিখে দেখলে যা হল— অধিকারের গরু মেরে দাক্ষিণ্যের জুতো দান। শাসকদের আর একটি নীতি— মানুষকে অবিরাম উৎসবে মাতিয়ে রাখা। গোষ্ঠীগত আত্মপরিচিতিতে মদত দেওয়া তো আছেই, জাতধর্মের ভিত্তিতে। আর আছে ‘উন্নয়ন’, যার মানে রাস্তা, সেতু, বিমানবন্দর, হোটেল, শপিং মল, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেগুলিতে কার কতটা উপকার হবে, হাসপাতালে চিকিৎসা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশোনা ঠিকমতো হবে কি না, তা বিবেচ্য নয়। এটাও জানা, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলি অধিকাংশত কথার কথা, এবং যে-ই ক্ষমতায় আসুক, সব কিছু এ ভাবেই চলবে। বস্তুত ভোটও এ দেশে একটি মহোৎসব বই নয়!
গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয় নিয়ে জনপরিসরে কোনও আলোচনাই হয় না, এমনকি আইনসভাতেও নয়। ছোট-বড় সব প্রতিষ্ঠান কর্তৃত্ববাদী ধাঁচে চলে। নির্বাচন হলেও শাসক সেগুলিকে কব্জা করতে জানেন। ‘স্টেকহোল্ডার’দেরও নীতি নিয়ে কিছু বলার সুযোগ নেই। মাঝেমধ্যে আমরা দুর্নীতির প্রতিবাদ করি। সব দল সব দলকে নিন্দেমন্দ করে এ নিয়ে। আমরাও সেই অলীক কুনাট্যরঙ্গে মজে থাকি। দুর্নীতি যে নীতি থেকেই উৎসারিত, এটা বুঝি না। আর একটি বড় সমস্যা অবশ্য আমাদের রয়েছে— আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের রাষ্ট্রে থাকব, না কি হিন্দু-অহিন্দু সবাই মিলে বাঁচব? এই একটি সমস্যা যেন কৃষ্ণগহ্বরের মতো আমাদের আর সব সমস্যাকে গিলে ফেলেছে, এবং এটি একটি নির্বাচনী আলোচ্য বটে! এটাও যে অনেকটা ভোটকুশল রাজনীতিকদের বানানো সমস্যা, আমরা বুঝি না। তাদের প্ররোচনায় ধর্মের নামে মারামারি করে মরি।
কেন আমাদের রাজনৈতিক সত্তার এমন বি-রাজনীতিকরণ হল, ধর্মের অধর্মায়নের সঙ্গে? মূলত কি অর্থনীতির অনর্থায়ন তার জন্য দায়ী? এটা স্পষ্ট যে, অর্থনৈতিক উদারীকরণ-উত্তর যুগই আমাদের বিকল্প চিন্তা কেড়ে নিয়েছে, সারা পৃথিবী জুড়েই। এই অর্থনীতির অন্যতম আদি প্রবক্তা মার্গারেট থ্যাচার সেই যে ‘টিআইএনএ’ (দেয়ার ইজ় নো অল্টারনেটিভ) তত্ত্ব পেশ করেছিলেন, সেটাই আমরা ক্রমে মেনে নিলাম। নব্য উদারনীতির আগেও পুঁজিবাদ ছিল, কিন্তু অন্য রকম কিছু হতে পারে এমন সাহসী সাম্যবাদী/সমাজবাদী ভাবনাও ছিল অনেকের মনে। সেই সাহসটা বিলীন হল। রাষ্ট্রের আংশিক অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ যেটুকু ছিল তা লোপ করে পুঁজি সব কিছুর দখল নিল। রাষ্ট্রও হল পুঁজির অধীন। সবচেয়ে মারাত্মক, সাধারণ মানুষের মনেরও দখল নিল এই অর্থনীতি। বামপন্থীরাও বাদ রইলেন না। তার পর ২০০৮ সালে আমেরিকায় হাউজ়িং সঙ্কটের মধ্য দিয়ে অর্থনীতির যে দুর্দিন এল, তা সামলাতে দেশে দেশে বসাতে হল কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রনায়কদের। অর্থনীতিতে নব্য-উদারনীতি আর রাজনীতিতে স্বৈরাচারী আধিপত্যবাদ তথা ফ্যাসিবাদ হরিহরাত্মা। ডিজিটাল যুগে অ্যালগরিদমের সাহায্যে ভোক্তা ও ভোটারদের দখল নিতে থাকল তারা।
পুঁজিকে তো রাজনীতির সাহায্য নিতেই হবে। নানা সঙ্কট থেকে উদ্ধার, কর মকুব, অনৈতিক কাজে সহায়তা, রাষ্ট্রীয় সম্পদে থাবা বসানো, শ্রমিক অধিকার হরণ করে তাঁদের যৎপরোনাস্তি শোষণ, ‘ফিসক্যাল ডেফিসিট’ সীমায়িত রাখা ইত্যাদির জন্য। সর্বোপরি মতাদর্শগত দুর্বলতা চাপা দেওয়ার জন্য। নিজের বাস্তববাদিতার দাবি প্রমাণের জন্য বাস্তবে যে পরীক্ষায় পাশ করা দরকার ছিল, তা তো সে করেনি। শুধু যে বহু মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে তা নয়, উন্নয়নের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে, ব্যাপক যুদ্ধবিগ্রহে উৎসাহ দিয়ে, সমগ্র সভ্যতা এমনকি গ্রহটিকেও বিপন্ন করে তুলেছে। বন্ধু স্বৈরাচারী শাসকরা অর্থনীতির এই অন্ধকার দিকগুলি চাপা দিতে সাহায্য করেন, জাতিগৌরবের নামে মানুষের সব ক্ষোভের অভিমুখ কোনও শত্রুগোষ্ঠীর দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া তাঁদের পুরনো কৌশল কিনা!
প্রশ্ন হল, রাজনীতিকরা কেন ব্যবসাদারদের তোয়াজ করেন? সরাসরি অর্থপ্রাপ্তি (বহুবিধ চাঁদা, ঘুষ) বড় কারণ। তা ছাড়া এই অর্থনীতির কেন্দ্রীয় চালিকাশক্তি অসাম্য, যাকে সামাজিক সচলতার প্রেরণা বলে তারিফ করেছিলেন তাত্ত্বিক মিলটন ফ্রিডম্যান, এবং যা ফ্যাসিবাদী শাসকদের রমরমাতেও বিলক্ষণ সাহায্য করে। দু’টি মতাদর্শই অসাম্যবাদী। কিন্তু যে সব রাজনীতিক নিজেদের লিবারাল, এমনকি বামপন্থী বলেন, তাঁদের হলটা কী? সব শাসকের মধ্যেই কি অল্পবিস্তর ফ্যাসিবাদ থাকে? না কি, এই মতাদর্শের বিপুল সমাজগ্রাহ্যতা বুঝে এর বিরোধিতা করার সাহস পাচ্ছেন না, বরং ফ্যাসিবাদীদেরই অনুকরণকরছেন, প্রতিযোগিতামূলক ধর্মাচরণ যার একটি বড় উদাহরণ? তা ছাড়া, একটা ভয় তো শাসক শ্রেণির থাকেই— ব্যবসাদাররা লগ্নি তুলে নিয়ে চলে গেলে কর্মসংস্থান কমে যাবে, মানুষের অসন্তোষ প্রকট হবে।
অথচ বিকল্প অর্থনীতি সম্ভব— যেমন, সমবায় (অনেক দিনের ঐতিহ্য, ইদানীং মনড্রাগন কর্পোরেশন-এর সমবায়-ভিত্তিক মডেল বহু-আলোচিত), জন রোমার-এর প্রস্তাবিত ‘বাজার সমাজতন্ত্র’, অথবা ই পি টমসনের ‘ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি’। বেশ কিছু দিন ধরে অতি-ধনী ব্যবসাদারদের উপরে চড়া হারে কর বসানো এবং নানা জনকল্যাণমূলক নীতির প্রস্তাব দিচ্ছেন টমাস পিকেটি, ইম্যানুয়েল সেজ়, গ্যাব্রিয়েল জ়ুকম্যানের মতো অর্থনীতিবিদরা। কিন্তু রাজনীতিকরা বিকল্প ভাবতে ভয় পান। যদিও পরস্পরের মুণ্ডপাত ও গোষ্ঠীগত হিংসা উস্কানোর বদলে এই জায়গাটাতেই তাঁরা সত্যিকারের সাহসের পরিচয় দিতে পারতেন।
নব্য উদারনীতি, ফ্যাসিবাদ, এবং ডিজিটাল বিপ্লব মিলিয়ে মানুষই এত বদলে গেল— রাজনীতিকদের কাছে কী বা প্রত্যাশা! এখন আমাদের জীবন জুড়ে বাজার আর রাষ্ট্র। দুইয়ে মিলে আমাদের মোহগ্রস্ত করছে, আবার ত্রস্তও করছে। উত্তর-ন্যায়নীতি, উত্তর-সত্য যুগে মতাদর্শ বলতে অবিকল্প ক্ষমতাবাদ আর মুনাফাবাদ, কিংবা স্রেফ লুটবাজি। উঁচু স্তরে রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে কর্পোরেটদের আঁতাঁত; আর তলার দিকে নামতে নামতে পাড়ার প্রোমোটারের সঙ্গে স্থানীয় নেতার— আমরা মেনেই নিয়েছি। খুব বড় ধাক্কা খেলে তবেই প্রতিবাদ করি, তাও সঙ্কীর্ণ দাবিতে। স্বার্থপর, লোভী, লোক-দেখানো ব্যক্তিবাদ হল যুগধর্ম। তদনুযায়ী সাধারণ মানুষ প্রত্যেকে নিজের উন্নয়নের কথাই শুধু ভাবে। যার অনেক আছে সে আরও পাওয়ার জন্য, এবং যার ন্যূনতম সঙ্গতিও নেই সে কোনও ক্রমে বাঁচার জন্য শক্তিশালী শাসকের কাছে নতজানু। শাসকের নীতিচিন্তন ও অনুশীলনের জন্য নয়, দয়াপরবশ পৃষ্ঠপোষণার জন্য।
কেমন হত, যদি এক দিন সকালে উঠে দেওয়ালে দেওয়ালে রাজনৈতিক দলগুলির নির্বাচনী পোস্টারের পাশাপাশি দেখতাম এ রকম অনেক অনামা পোস্টার— ‘রাজনৈতিক দলগুলির পারস্পরিক দোষারোপে আমরা ক্লান্ত, বর্তমান ব্যবস্থার বিকল্প কী হতে পারে জানতে চাই’, ‘নেতারা শুনুন, বিকল্প হতে পারে, যদি সাধারণ মানুষের সাগ্রহ সহযোগিতা নিশ্চিত করতে পারেন’, ‘কেন্দ্র ও রাজ্যে একনায়কতন্ত্র এবং স্থানীয় স্তরে নেতাতন্ত্রের বদলে আমরা চাই সত্যিকারের গণতন্ত্র— আলোচনা ভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক’, ‘নেতারা শুনুন, মানুষের মতো বাঁচা আমাদের অধিকার, আপনাদের দয়ার দান নয়’? ছবিটা কি একটু হলেও পাল্টাত?