আশাহত: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সভা ঘিরে বিশেষ জন-উদ্দীপনার পর, সিঙ্গুর, ১৮ জানুয়ারি। ছবি: পিটিআই।
এই রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের জমানায় বিরাট বিরাট কারখানা হবে, শিল্পায়নের ফলে রাজ্যের ভোল বদলে যাবে, এমনটা বোধ হয় তৃণমূলের অন্ধ সমর্থকরাও আশা করেননি। তার প্রধান কারণ সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে শিল্পের জন্য চাষের জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে পুঁজি করেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রীর গদিতে এসেছিলেন। তার পরে একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে তাঁর সরকারের পক্ষে রাজ্যের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থানের স্বার্থে জমি অধিগ্রহণ করাটা কঠিন ছিল।
আশা না-থাকলেও হতাশা তৈরি হয়। গত পনেরো বছরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার সম্পর্কে যাঁরা হতাশ, তাঁদের অন্যতম প্রধান অভিযোগ, রাজ্যে তেমন কোনও বড় শিল্প আসেনি। বড় শিল্পের অনুসারী হিসেবে ক্ষুদ্র, ছোট শিল্পও হয়নি। দক্ষ, আধা-দক্ষ বা অদক্ষ কর্মী-শ্রমিকদের নিয়োগের সুযোগ না-হওয়ায় রাজ্যের মানুষকে কাজ খুঁজতে ভিন রাজ্যে পাড়ি দিতে হয়েছে।
যাঁরা মনে করেন, তৃণমূলকে সরিয়ে বিজেপি এলে রাজ্যে শিল্পও আসবে, তাঁরা আশা করে গত ১৯ জানুয়ারি মোদীর সিঙ্গুরের জনসভার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। সেই সিঙ্গুর, যেখানে গাড়ির কারখানার কাজ শুরু করেও টাটাকে বিদায় নিতে হয়েছিল। বিজেপির রাজ্য সভাপতি ঘোষণা করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী বাংলায় ‘শিল্পের বধ্যভূমি’-তে দাঁড়িয়েই শিল্পায়নের বার্তা দেবেন। কিন্তু না, বার্তা এল না। মোদী সিঙ্গুরে গিয়ে শিল্পায়ন নিয়ে একটি কথাও বলেননি। শুধু বলেছিলেন, রাজ্যে আইনের শাসন নেই বলেই বিনিয়োগ আসছে না। বিজেপি ক্ষমতায় এলে সিন্ডিকেট, মাফিয়া-রাজ নির্মূল হবে।
আইনের শাসন না থাকা যে-কোনও রাজ্যেই শিল্পের পথে বাধা। শুধু পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেই এই নিয়ম প্রযোজ্য, এমন নয়। পশ্চিমবঙ্গে ভারী শিল্পের পথে আসল বাধা— জমি। জমি অধিগ্রহণের সমস্যা। পশ্চিমবঙ্গে ভূমি সংস্কার হয়েছে। তার ফলে রাজ্যে মাথাপিছু জমির মালিকানার গড় মাপ সর্বভারতীয় গড় মাপের থেকে অনেক কম। হরিয়ানা, পঞ্জাব, রাজস্থানে এক-এক জন চাষির হাতে গড়ে দুই থেকে সাড়ে তিন হেক্টর পর্যন্ত জমি থাকে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এক হেক্টরেরও কম। যার অর্থ, উত্তর ভারতের রাজ্যে শিল্পের জন্য একশো একর জমি নিতে গেলে যত জন চাষিকে রাজি করাতে হয়, পশ্চিমবঙ্গে তার দুই থেকে তিনগুণ বেশি চাষিকে রাজি করাতে হবে। এই পরিস্থিতিতে বহু জমির মালিকের সম্মতি আদায় করতেই রাজ্য সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গায়ের জোরে অধিগ্রহণ নয়। ঐকমত্য তৈরি করাও সরকারের কাজ।
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য শিল্পায়ন করতে গিয়ে ঐকমত্য তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারে এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টাই হয়নি। বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যে শিল্পের জন্য জমির সমস্যার কী ভাবে সমাধান করবে, রাজ্যের মানুষ তা নরেন্দ্র মোদীর থেকে জানার জন্য উৎসুক ছিলেন। সিঙ্গুরের জনসভায় এর উত্তর মেলেনি। মুশকিল হল, বিজেপির রাজ্য নেতাদের থেকেও এই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। তাঁরা কৃষি-শিল্পের সহাবস্থানের মতো কিছু হাওয়া-হাওয়ায় কথা বলেছেন। শিল্পপতি জমি কিনতে চাইলে আগ্রহী জমির মালিক তা বিক্রি করতে পারেন বলে দাবি করেছেন। ও-সব কথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বলে থাকেন। বিজেপি ক্ষমতায় এলে জমি অধিগ্রহণের প্রশ্নে কী বিকল্প নীতি নেবে, রাজ্য নেতারা সেই দিশা দেখাতে পারেননি। তাঁরা নিজেরাই মোদীর থেকে সমাধানের অপেক্ষায় ছিলেন। মোদী উত্তর দেননি।
আসল কথা, উত্তর মেলার কথাও ছিল না। নরেন্দ্র মোদী নিজেই গত এগারো বছরে জমি অধিগ্রহণের সমস্যার সমাধান করার সাহস দেখাতে পারেননি। নরেন্দ্র মোদীর সিঙ্গুরের জনসভার দু’সপ্তাহ আগেই কেন্দ্রীয় সরকারের ক্যাবিনেট সচিবের সাংবাদিক সম্মেলনে দেখা গিয়েছিল, জমি অধিগ্রহণের জটে রেল, সড়ক, বিদ্যুৎ ক্ষেত্রের বড় মাপের পরিকাঠামো প্রকল্প আটকে যাচ্ছে। তবুও ক্যাবিনেট সচিব টি ভি এস সোমনাথন জানিয়ে দিয়েছিলেন, জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন আইনে সংশোধন করার পরিকল্পনা সরকারের নেই। অথচ এই মোদী সরকারই ক্ষমতায় এসেই ২০১৫ সালে জমি অধিগ্রহণ আইনে সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করেছিল, যাতে শিল্প, পরিকাঠামোর জন্য জমি অধিগ্রহণ সহজ হয়। রাহুল গান্ধীর ‘স্যুট-বুট কি সরকার’ বলে আক্রমণ, রাজ্যসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না-থাকায় মোদী সরকার পিছু হটে। অধ্যাদেশ আইনে পরিণত হয়নি। তার পরে লোকসভার মতো রাজ্যসভায় সরকারের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা এলেও গত এগারো বছরে মোদী সরকার আর জমি অধিগ্রহণ আইনে সংস্কারের সাহস দেখাতে পারেনি।
এ দেশে সরকারি খাতায় কৃষিজমি নথিবদ্ধ করার কাজ শুরু হয়েছিল মোগল জমানায়, আকবরের আমলে। ১৬০১ খ্রিস্টাব্দে এই কাজ শুরুর পিছনে লক্ষ্য ছিল জমির মালিকানা নির্ধারণ করে খাজনা আদায় করা। মোগলরা জমি অধিগ্রহণের আইন জারি করেনি। ব্রিটিশরা এসে শিল্পভিত্তিক ব্যবসাবাণিজ্য শুরু করে। তার জন্য জমি অধিগ্রহণের দরকার পড়ে। ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির উপরেও রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব স্থাপন করতে ১৮৯৪ সালে ব্রিটিশরা জমি অধিগ্রহণ আইন তৈরি করেছিল।
পশ্চিমবঙ্গে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমলে যখন সিঙ্গুর, নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণের চেষ্টা হচ্ছে, তখনও দেশে সেই ব্রিটিশদের তৈরি ১৮৯৪ সালের জমি অধিগ্রহণ আইনই চালু ছিল। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের ঘটনার প্রেক্ষিতে ইউপিএ সরকার ২০১৩ সালে নতুন জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন আইন চালু করে। সেই আইন তৈরিতে সে সময় সংসদে বিরোধী দলের নেতানেত্রী অরুণ জেটলি, সুষমা স্বরাজও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। কৃষক তথা জমির মালিকদের স্বার্থ দেখতে গিয়ে আইনে জমি অধিগ্রহণ কঠিন হয়ে গিয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, বেসরকারি সংস্থার জন্য সরকারকে জমি অধিগ্রহণ করতে হলে ৮০ শতাংশ জমির মালিকের সম্মতি নিতে হবে। সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগের জন্য জমি অধিগ্রহণ করতে হলে ৭০ শতাংশ জমির মালিকের সম্মতি দরকার হবে। মোদী সরকারের অধ্যাদেশে বহু সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পকে এই শর্ত থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই অধ্যাদেশ সংসদে পাশ হয়নি। ২০১৩ সালের পুরনো আইনই বলবৎ রয়েছে। ফলে এখন বড় মাপের সরকারি পরিকাঠামো প্রকল্পের কাজও আটকে যাচ্ছে।
জমি অধিগ্রহণ সংবিধানের যৌথ তালিকাভুক্ত বিষয়। যার অর্থ, কেন্দ্রের পাশাপাশি রাজ্য সরকার নিজস্ব জমি অধিগ্রহণ আইন জারি করতে পারে। মোদী সরকার নিজে জমি অধিগ্রহণ আইনে সংশোধন করতে না পেরে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলির হাতে নিজের মতো জমি অধিগ্রহণ আইন তৈরির দায়িত্ব দিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যের নিজস্ব জমি অধিগ্রহণ আইন আনবে কি না, সে উত্তর মেলেনি। তাঁরা খোঁজ নিলে জানতে পারতেন, পশ্চিমবঙ্গে একদা নিজস্ব জমি অধিগ্রহণ আইন ছিল। ১৯৪৮ সালেই ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ল্যান্ড রিকুইজিশন অ্যান্ড অ্যাকুইজিশন অ্যাক্ট’ চালু হয়েছিল। ব্রিটিশ জমানার ১৮৯৪ সালের আইনের থেকেও কঠোর এই আইনে বলা ছিল, ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আগেই সরকার জমি নিয়ে নিতে পারবে। ‘হুকুম দখল’ আইন হিসেবে কুখ্যাত এই আইন জারির কারণ হিসেবে কংগ্রেস সরকার যুক্তি দিয়েছিল, উদ্বাস্তুদের জন্য দ্রুত জমির বন্দোবস্ত করতে হবে।‘হুকুম দখল’ আইন জারির সময় তার আয়ু ঠিক হয়েছিল মাত্র পাঁচ বছর। কিন্তু একের পর এক সরকার আইন পুনর্নবীকরণ করে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত এই আইন টিকিয়ে রাখে। বাম জমানায় এই আইন টিকিয়ে রাখার পিছনে ভূমি ও ভূমি রাজস্বমন্ত্রীরা শিল্পনগরী, আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার যুক্তি দিয়েছিলেন। ১৯৯৩ সালের এপ্রিলের পর থেকে এই আইনের সাহায্যে জমি অধিগ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়।
হয়তো বিজেপি নেতারা ‘অনুপ্রবেশকারী’ সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় রাজ্যে শিল্পায়ন, জমি অধিগ্রহণের সমস্যা নিয়ে ভাবার সময় পাননি। হয়তো নরেন্দ্র মোদী বাংলার সব সমস্যার উত্তর খুঁজে দেবেন বলে রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব আশা করে বসে রয়েছেন।