সংবিধান গণতন্ত্রকে রক্ষা করে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সামনের পথকে সুগম করে দেয়। গণতন্ত্র সংবিধানকে আরও শক্তিশালী করে। সাংবিধানিক চেতনাকে রাজনীতির জনপরিসরের অন্যতম মৌলিক শক্তি করে তোলে গণতান্ত্রিক আচার ও ব্যবহার।
আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক শিক্ষার প্রয়োজন লাগে না এই কথা বোঝার জন্য। প্রতিনিয়ত প্রচারমাধ্যম, রাজনৈতিক ঘোষণা, সংসদ ও বিধানসভায় ভাষণ, এবং বিচারকদের বাণী আমাদের মনে এই দুটো শব্দের আন্তঃসম্পর্ককে গেঁথে দিয়েছে: সংবিধান ও গণতন্ত্র। একটা ব্যতিরেকে অন্যটা চলবে না। এই দুই মিলিয়ে কোটি কোটি ভারতবাসী দায়িত্বশীল নাগরিক হয়ে উঠবে।
তা হলে বার বার এত ছন্দপতন হচ্ছে কেন? কর্তৃত্ববাদী পদক্ষেপ ও ভাবনা সাংবিধানিক স্বীকৃতি পাচ্ছে কী ভাবে? সংবিধানের লঙ্ঘন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জয়ধ্বনির সঙ্গে অভ্যর্থনা ও সাদর স্বীকৃতি পাচ্ছে কী করে? নতুন নতুন এক-একটা ব্যাখ্যায় সাদা কালো হয়ে যাচ্ছে। বিড়াল রুমাল হয়ে যাচ্ছে। সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় কী জাদুশক্তি আছে যা ত্রিকালজ্ঞরাও ঠিক করতে পারেন না?
বিজ্ঞ লোকজন, যাঁরা আবার কিছুটা সংশয়বাদী, তাঁরা বলেন, জনপরিসরে আলাপচারিতাকে গৌণ করে দিয়ে বা একেবারে থামিয়ে দিয়ে সাংবিধানিক শাসনের নামে যে ভাবে আইনের অনুশাসন প্রবর্তন করা হয়, গন্ডগোল সেইখানে। একটা পর্যায় পর্যন্ত আইনের চৌহদ্দিতে তর্ক-কূটতর্ক চলতে থাকে, ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো এই রায় এক পক্ষে যায় ও ওই রায় অন্য পক্ষে। কিন্তু মূলে গন্ডগোল থাকে না। মৌলিক ভাবে কার্যনির্বাহী বিভাগের বিরুদ্ধে বিচারবিভাগ যায় না। আইনসভার তো শাসনবিভাগের বিরুদ্ধে যাওয়ার প্রশ্ন নেই। আইনসভাই যত্ন করে শাসনবিভাগের হাতে সব ক্ষমতা তুলে দেয়।
পড়ে থাকে শুধু জনতা। যারা বলতে থাকে, বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।
আমাদের দেশে সংবিধান প্রণয়নের সময়ে অনেকে অনেক বার নেতৃবৃন্দকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে কার্যনির্বাহী বিভাগ বা শাসনবিভাগের হাতে অত ক্ষমতা দিয়ো না, রাষ্ট্রকে অত শক্তিশালী কোরো না, প্রত্যেকটা মৌলিক অধিকারকে সঙ্কোচনের রাস্তা রেখে দিয়ো না। কিন্তু কে কার কথা শোনে? শক্ত রাষ্ট্র চাই, শক্ত আইন চাই, শক্ত শাসনবিভাগ চাই। আর বিচারসভা তো আছেই। কাজেই সাংবিধানিক গণতন্ত্র এ দেশে নিশ্চিত। বৈধতার বিষয়টিকে দৃঢ় করে আইনের অনুশাসনকে দৃঢ় করা হয়েছে।
গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে আলাপচারিতা ও সংলাপী মনোভাবকে বহিষ্কার করে আমরা খাল কেটে কুমির এনেছি। কর্তৃত্ববাদ বা স্বেচ্ছাতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্র বৈধ পথে এখন রাজনীতি দখল করেছে। গণতন্ত্র কী ভাবে কার্যকর হবে তার দিগ্নির্দেশ করছে কর্তৃত্ববাদ। যুক্তি উঠে আসছে, কড়া শাসন না হলে গণতন্ত্র চলবে কী করে? ডিম না ভেঙে ডিমভাজা তৈরি করা যায়?
রাজনীতি ও গণপরিসর থেকে আলাপচারিতাকে বহিষ্কার করার পিছনে বিচারবিভাগের ভূমিকাও গৌণ নয়। একাধিক রায়ে, যেমন বাবরি মসজিদ ভাঙা এবং নতুন মন্দির ওই স্থানে গড়া, সংবিধানের ৩৭০ নম্বর ধারার বিলোপ, নির্দিষ্ট অনুসন্ধান ও বিচার ছাড়া রাজনৈতিক বন্দিদের বছরের পর বছর কারারুদ্ধ রাখা— এ ধরনের দৃষ্টান্ত একাধিক। তার উপর সাংবিধানিক কর্তৃত্বকে শক্তিশালী করার জন্য এক উদগ্র মনোভাব, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি থেকে বোঝা যায়।
মানুষ মরে যাক, পরিযায়ী শ্রমিক দেশান্তরে পথবাসী হয়ে পড়ে থাকুক, প্রলয় হলেও সঠিক ভোটার তালিকা চাই। এই ‘সঠিক’ ভোটার তালিকা কী? কে ঠিক করবে, কোনটা সঠিক মানদণ্ড? কে বলে দেবে যে অমুক লোক নাগরিক নয়, তাই তার ভোটাধিকার নেই? নির্বাচন কমিশনের হাতে এত ক্ষমতা থাকবে— কার ব্যাখ্যায় এটা স্থির হল?
এই প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে বিচারবিভাগের ভূমিকা স্পষ্ট। সংবিধানকে তুলে ধরার উদগ্র মানসিকতা যে সাংবিধানিক চৈতন্যকেই শেষ করে দিচ্ছে, কে সে কথা বিচারবিভাগকে বা শাসনবিভাগকে বোঝাবে?
এই ভাবে কেন্দ্রীয় অনুসন্ধানকারী সংস্থার কাজকর্ম, নির্বাচনকে এক সামরিক প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত করা, যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তরাষ্ট্রীয় চরিত্রকে কোণঠাসা করা— এই সবই বৈধতার ছাপ লাগিয়ে চলছে। কারণ, আমরা ভোট দেব। আমাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে জবরদস্ত শাসন চাই।
এক ফরাসি ইতিহাসবিদ পিয়ের রোজ়াঁভ্যালোঁ দেখিয়েছিলেন, কী ভাবে আধুনিক গণতন্ত্রের জন্মলগ্ন থেকে গণতন্ত্রের প্রতি এই সব কারণে সমাজের নানা অংশে গভীর সন্দেহ জেগেছে। সংবাদপত্র, নাগরিক সমাজ বা জনসমাজ, আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে সমাজের যে সব অংশ, কৃষক সমাজের এক বিপুলাংশ— এই ধরনের বিভিন্ন গোষ্ঠী বা অংশ প্রথম থেকেই আধুনিক গণতন্ত্রের প্রতি সন্দিহান। এদের সঙ্গে রয়েছে সমাজের সংখ্যালঘু অংশ। এদের মতে, গণতন্ত্রের কৌশল হল, একতরফা শাসন এবং সম্পত্তি ব্যবস্থার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি যুক্ত শাসন সমাজের উপর চাপিয়ে দেওয়া। তিনি এই বৈশিষ্ট্যের নাম দিয়েছিলেন কাউন্টার-ডেমোক্র্যাসি বা প্রতি-গণতন্ত্র। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক শাসনের বিরোধী দিক।
আইনের শাসন, বিচার ব্যবস্থা, জবরদস্তির সুযোগ, আইনের দোহাই দিয়ে সমাজের উপর শৃঙ্খলা চাপানো— এই সব দিয়ে সমাজের নানা অংশের কথোপকথন বন্ধ করে দেওয়া হয়। সংলাপের পরিবর্তে আসে নিজস্ব দাবি ও চাহিদা নিয়ে সমাজের নানা অংশের অনমনীয় মনোভাব এবং একই সঙ্গে বিরোধিতাদীর্ণ সমাজকে সচল রাখবে শক্ত আইন। আমাদের সমবেত জীবনের পৌরোহিত্য করবে আইনের অনুশাসন।
আইন এই ভাবেই বেআইন সৃষ্টি করে। গণতন্ত্র এই কায়দায় কর্তৃত্বকে সামাজিক চালিকাশক্তিগুলির প্রধানতম করে তোলে। গণতন্ত্রের ভিতর থেকেই আবির্ভাব হয় কর্তৃত্ববাদের। সংবিধানকে খর্ব বা ধ্বংস করে স্বেচ্ছাতন্ত্র আসে না। সংবিধানের রাস্তা ধরেই প্রতাপশালী কর্তৃত্বের উদয় হয়।
অনেকের ধারণা, সমাজে অধিকারবোধ শক্তিশালী হলে স্বেচ্ছাতন্ত্রের উদয় হত না। অধিকারবোধ আইনের শাসনকে বাস্তবায়িত করে, স্বেচ্ছাতন্ত্রের প্রবণতাকে সামলে রাখে। রাজনীতির অনেক কল্পকাহিনির মতো এ-ও এক কল্পকাহিনি।
মানবিক অধিকারবোধ সমাজের অনেক উপকার করেছে। এবং এই উপকার সক্ষম হয়েছে যখন অধিকারবোধ ন্যায়বোধের সঙ্গে যুক্ত থেকেছে। ন্যায়বোধ থেকে বিচ্ছিন্ন, স্বীয় গোষ্ঠীবলে বলীয়ান অধিকারবোধ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বরং সমাজে কলহ বেড়েছে। সহমর্মিতা কমেছে। পারস্পরিক যত্ন, সেবা, পরিচর্যা ও সহবোধ কমেছে। আইনসর্বস্ব অধিকারবোধ ন্যায়বিচারকে সমাজের গভীরে নিয়ে যেতে পারেনি।
তবু, এ সব সমস্যা নিয়েই রাজনৈতিক সমাজ চলতে পারে, চলেও। কিন্তু বাদ সাধে আইনের অনুশাসন, বৈধতার নিগড়, আইনি বিচারের প্রতি অন্ধ আস্থা। এর অর্থ, সালিশি প্রথায় প্রত্যাবর্তন নয়, অথবা পুরনো দিনের রাজতন্ত্রেও ফিরে যাওয়া নয়।
কথাবার্তার চলন, সংলাপী কৃষ্টি, এবং আলোচনাভিত্তিক সমাজ-পরিচালনার কথা আমাদের জাতীয় আন্দোলনের যুগে অনেকেই ভেবেছিলেন। ন্যায় নিয়ে ধ্যানধারণাতেও সৃজনশীলতা ছিল। সম্পত্তি ও বল প্রদর্শনকারী শক্তিভিত্তিক আইনের অনুশাসনের প্রচলনের মাধ্যমে দেশ চালানোর মনোভাব সে যুগে অতটা শক্ত হয়ে বসেনি। আজ নির্বাচনকেন্দ্রিক যুগে বা নির্বাচনকে উপলক্ষ করে দেশের গোটা রাজনৈতিক সমাজকে পুলিশি প্রহরায় আনা হচ্ছে। এবং আইনি স্বেচ্ছাচারের বিরোধিতা করলেই সংবিধান-বিরোধী তকমা লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
অথচ, আলাপচারী রাজনীতিরও এক স্বতন্ত্র ইতিহাস আছে। অনেক শহর, গ্রাম, বস্তি, পাড়া, কৌম আলাপচারিতায় ভরসা করে অনেক ভাল কাজ করে। সহানুভূতি ও সহমর্মিতা অনেক দুরূহ ও অসম্ভবকে সম্ভব করে। অতিমারির সময় পুলিশ, কোর্ট, আইন আমাদের বাঁচায়নি, বাঁচিয়েছিল সংলাপ ও সহমর্মিতার মূল্যবোধ।
আমরা চাই বা না চাই, আমাদের দেশের নির্বাচনগুলি ক্রমশই এই দুই বিরোধী রাজনৈতিক বোধের সংগ্রামের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কোন বোধ জয়ী হবে, এখনই তা বলা শক্ত।