অশান্ত ভূরাজনৈতিক অবস্থার মাঝে, এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন ভারত। অপারেশন সিঁদুর পরবর্তী সময় থেকে সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের মধ্যস্থতা পর্ব— এ যাবৎ আমেরিকাকে পাকিস্তানের তরফেই ঝুঁকতে দেখা গিয়েছে। তা ছাড়া, আমেরিকা সম্প্রতি নয়াদিল্লিকে এও জানিয়েছে যে, পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতের ক্ষেত্রে তারা একতরফা ভাবে ভারতকে সমর্থন করবে না। এ বার, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আসা নতুন কিছু মন্তব্য নয়াদিল্লিতে একটি পুরনো কৌশলগত প্রশ্নকে পুনরায় উস্কে দিয়েছে: আমেরিকা যখন পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে, তখন ভারতের কী প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত? ইরান যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত আলোচনার প্রসঙ্গে সম্প্রতি হোয়াইট হাউস-এর সংবাদমাধ্যম-সচিব ক্যারোলিন লেভিট-এর বক্তব্য, পাকিস্তানিরা অসাধারণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছেন। এমনিতেই এই বিষয়ে পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের কার্যকলাপের বিশেষ তারিফ শোনা গিয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মুখে।
লক্ষণীয়, পশ্চিম এশিয়ায় পাকিস্তান নিজেকে একটি কার্যকর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। বাস্তব চিত্রটি কিন্তু অন্য— এ যাবৎ আমেরিকার সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক মূলত লেনদেনমূলক এবং নিরাপত্তানির্ভর। আসলে, উপসাগরীয় অঞ্চলে ওয়াশিংটনের এমন এক সামরিক ভাবে সক্ষম ইসলামি অংশীদার দরকার, যে ওখানকার আঞ্চলিক কূটনীতি সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল এবং প্রয়োজনে আমেরিকার উদ্দেশ্য সাধনে সহায়তা করতে সক্ষম। অন্য দিকে, পাকিস্তানের জন্য অর্থপ্রবাহ এবং আন্তর্জাতিক বৈধতা— উভয়ই জরুরি। সেই দেশের বর্তমান নেতৃত্ব স্বাভাবিক ভাবেই এই মুহূর্তটিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের বৈশ্বিক অবস্থানকে পুনর্গঠন করতে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থন আদায় করতে আগ্রহী। মূলত, প্রতিবেশী অঞ্চলের চাপের মুখে সাড়া দিচ্ছে পাকিস্তান। শুধু তা-ই নয়, এ যাবৎ, কূটনীতির পাশাপাশি জ্বালানি, বিনিয়োগ এবং নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও সৌদি আরবের মতো উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে দিল্লি সম্পর্ক প্রসারিত করায়, এই অঞ্চলে ইসলামাবাদের ঐতিহ্যবাহী পরিসর সঙ্কুচিত হয়েছে। এমতাবস্থায় পাকিস্তানের জন্য উপসাগরীয় সমর্থন আদায় এখন আর স্বয়ংক্রিয় নয়, বরং আরও শর্তসাপেক্ষ হয়ে উঠেছে।
এ-হেন ক্রম-পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে ভারতের উচিত কোনও হঠকারী পদক্ষেপ না করে রাশিয়া, ইউরোপ, এমনকি উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক যত্নসহকারে আরও প্রসারিত ও সুদৃঢ় করা। সম্ভবত এটাই ভারতের বিদেশনীতির উভয়সঙ্কট— এবং শক্তির মূলও বটে। বস্তুত, ঠান্ডা যুদ্ধের যুগের ন্যায় দিল্লি আজ আর দ্বিমুখী পছন্দের মধ্যে আবদ্ধ নয়। বরং এক দিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা, এবং অন্য দিকে ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়া ও এর বাইরে অংশীদারি সম্প্রসারণের মতো কূটনৈতিক সুযোগ রয়েছে তার কাছে। প্রশ্ন হল, ক্রমবর্ধমান লেনদেনমূলক বিশ্বব্যবস্থায় ভারত তার বহু-সংযুক্ত কৌশল টিকিয়ে রাখতে পারবে কি? আপাতত এর উত্তরটি দিক পরিবর্তন নয়, বরং ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা। কূটনীতিতে কখন থেমে গিয়ে ধৈর্য দেখাতে হয়, সেটা বোঝাও গুরুত্বপূর্ণ।