কাকদ্বীপের সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। — নিজস্ব চিত্র।
প্রথম দফা ভোটের প্রায় ঘণ্টা চারেক হওয়ার পরে নির্বাচনী প্রচারে রাজ্যে পরিবর্তনের জন্য মহিলাদের উদ্দেশে নির্দিষ্ট বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বৃহস্পতিবার প্রথমার্ধের দু’টি সভায় রাজ্যে প্রধান প্রতিপক্ষ তৃণমূল কংগ্রেসকে মহিলা-স্বার্থ বিরোধী হিসাবে উল্লেখ করলেন তিনি। একই সঙ্গে, বিজেপি এই রাজ্যে সরকার বদলের যে স্লোগান দিয়েছে, তাতে মহিলা ও যুবদের যোগদানের জন্য আহ্বান জানালেন। মথুরাপুরের সভায় তিনি বলেছেন, “এই নির্মম সরকারের সব থেকে বড় শিকার যদি কেউ হয়ে থাকেন, তাঁরা আমাদের মহিলারাই। আমাদের মেয়েরাই হয়েছেন।”
প্রথম দফার ভোট শুরু হয়েছিল সকাল ৭টায়। তার কিছু সময় পরে নদিয়ার কৃষ্ণনগরে বিজেপি প্রার্থীদের জন্য সভা করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। বেলা ৩টে নাগাদ দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাকদ্বীপের সভায় বক্তৃতার শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, বাংলায় পরিবর্তনে দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছেন মহিলারাই।” এই দাবির পক্ষে রাজ্যের শাসক তৃণমূলকে কাঠগড়ায় তুলে মোদী বলেন, “ধর্ষণ (এখানে) প্রতি দিনের ঘটনা। আর জি কর-কাণ্ড, সন্দেশখালির মতো ঘটনায় ধর্ষকদের আশ্রয় দিয়েছে তৃণমূলই।” এই প্রেক্ষিতেই মোদীর বক্তব্য, “যখনই কেউ অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছে, এখানকার মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছেন। এই মাটিতেই তেভাগা আন্দোলনে কৃষক ও শ্রমিক নিজের অধিকারের জন্য লড়াই করেছেন। বাংলার মানুষকে ভয় দেখানো যায়নি।’’ এর পরেই বিজেপির মথুরাপুর সাংগঠনিক জেলা আয়োজিত ওই সভায় উপস্থিত দক্ষিণ ২৪ পরগনার প্রায় ১৪ টি কেন্দ্রের দলীয় প্রার্থীদের সমর্থনে আসা সমর্থকদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, ‘‘আমাদের মেয়েদের, বোনেদের যে ভাবে নির্যাতন করা হয়েছে, মহিলারা তা কোনও ভাবেই সহ্য করবেন না।’’ মোদীর সংযোজন, ‘‘বিপুল সংখ্যায় মা-বোনেরা আমাদের আশীর্বাদ দিতে এসেছেন। আপনাদের উপস্থিতি তৃণমূলের ঘুম ছুটিয়ে দেবে।’’
এর আগে সকালে কৃষ্ণনগরের সভাতেও মহিলাদের জন্য ‘মোদীর গ্যারান্টি’ হিসাবে প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেক ব্লকে মহিলা থানা, পুলিশে আরও মহিলা নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেই সঙ্গে, মহিলাদের নগদ আর্থিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতিও মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি। সংসদে মহিলা বিল সংক্রান্ত বিরোধের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী দুই সভাতেই বলেছেন, “সংসদে আমরা মহিলাদের জন্য ৩৩% সংরক্ষণের প্রস্তাব এনেছিলাম। তৃণমূল তার বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে বাংলার মহিলাদের অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছে। তৃণমূল মহিলাদের উপরে যে অত্যাচার করেছে, তাঁদের সম্মানে যে আঘাত করেছে প্রত্যেকটি ভোটে আপনারা তার হিসাব নিন।”
যে ১৫২টি আসনে এ দিন ভোটগ্রহণ হয়েছে তার সিংহ ভাগে মহিলাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। রাত পর্যন্ত যে হিসাব আসছে, তাতে রেকর্ড সংখ্যক ভোটদানে মহিলাদের সেই উপস্থিতির ইঙ্গিত ছিল সকাল থেকেই। রাজনৈতিক শিবিরের একাংশের ধারণা, সেই কারণেই দ্বিতীয় দফা ভোটের আগে শেষ লগ্নের প্রচারে দক্ষিণবঙ্গের এই দুই জেলা থেকে সেই মহিলাদের উদ্দেশে এই বার্তা দিতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
কৃষ্ণনগর ও কাকদ্বীপের দুই সভাতেই মোদীর প্রচারে এসেছে একেবারে স্থানীয় সমস্যার কথা। পঞ্চায়েত-পুরসভা স্তরের সমস্যার মতো বিষয় টেনে এনে কৃষ্ণনগরে তিনি রাস্তাঘাট, জলঙ্গি নদীর সংস্কারের কথা উল্লেখ করেছেন। আবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার সভায় প্রত্যন্ত এলাকার পঞ্চায়েতের অন্যায় ও অব্যবস্থার কথাও শোনা গিয়েছে তাঁর মুখে। সেই সঙ্গে, কিছুটা ব্যতিক্রমী ভাবেই কাকদ্বীপের এ দিনের সভায় তিনি তৃণমূলের ১৫ বছরের সরকারের সঙ্গে নিজের ১১ বছরের সরকারের তুলনা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘‘বাংলা তিন দশক বামেদের কুশাসন দেখেছে। সে জন্য তাদের সরিয়ে তৃণমূলকে তিন বার ক্ষমতায় এনেছে। ১৫ বছর সুযোগ দিয়েছে।’’ সেই সূত্রেই তিনি বলেছেন, ‘‘এক দিকে বিজেপির ১১ বছর, অন্য দিকে তৃণমূলের ১৫ বছর। আমরা ১২ বছরে দেশের সব গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছি, চার কোটি গরিব মানুষের জন্য ‘প্রধানমন্ত্রী আবাস’, ১২ কোটি শৌচাগার করেছি। তিন কোটি মহিলাকে ‘লাখপতি দিদি’ তৈরি করেছি। ৪০ কোটি আয়ুষ্মান কার্ডে মানুষকে বিনা খরচে চিকিৎসার সুযোগ আর ১০ কোটি কৃষককে পিএম কৃষক সম্মান প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করেছি।’’
হাওড়ায় রোড - শো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর। — নিজস্ব চিত্র।
প্রসঙ্গত, সুন্দরবন লাগোয়া এই কেন্দ্রগুলির দলীয় প্রার্থীদের জন্য প্রচার করেছেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। একাধিক সভায় রাজ্য সরকারের প্রকল্পের উল্টো দিকে অভিষেক কেন্দ্রীয় সরকারের কাজের ‘রিপোর্ট কার্ড’ চেয়েছেন। এ দিন, নিজের সরকারের কাজের বিবরণ দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে নাম না-করে তাঁদের উদ্দেশে পাল্টা বলেছেন, ‘‘তৃণমূল ১৫ বছরে বাংলার মানুষকে কী দিয়েছে? শুধু মিথ্যা প্রতিশ্রুতি আর ধোঁকা দিয়েছে।’’ প্রাকৃতিক দুর্যোগে কেন্দ্রের দেওয়া কোটি কোটি টাকা তৃণমূল আত্মসাৎ করছে বলেও অভিযোগ করেছেন মোদী।