বিরোধী রাজনীতির পরিসরে যে প্রশ্নগুলি করা হল না
West Bengal Politics

জনবাদী রাজনীতির সন্ধিক্ষণ

কেন আজ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত অথবা পরিযায়ী শ্রমিকবর্গভুক্ত মানুষজনকে নাগরিকত্ব হরণের আঘাত সহ্য করতে হচ্ছে? কেন এক-এক অঞ্চলে এই নিয়ে আমাদের বাংলা অশান্ত হচ্ছে?

রণবীর সমাদ্দার
শেষ আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৪:১৫
অধিকার: ভাতা বৃদ্ধি-সহ বিভিন্ন দাবিতে সারা বাংলা অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের বিক্ষোভ। ৫ নভেম্বর ২০২৫, বালুরঘাট।

অধিকার: ভাতা বৃদ্ধি-সহ বিভিন্ন দাবিতে সারা বাংলা অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের বিক্ষোভ। ৫ নভেম্বর ২০২৫, বালুরঘাট। ছবি: অমিত মোহান্ত।

বাংলায় জনবাদী রাজনীতির বিকাশের ক্ষেত্রে বর্তমান সময় এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষণ। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজকে অস্ত্র করে ভারত সরকার যে নাগরিক তালিকা তৈরি করতে চাইছে, তার বিরুদ্ধে জনপ্রতিরোধ যে কোনও সময়ে গড়ে উঠতই। দেশের কালচক্রের অমোঘ নিয়মে বাংলাতেই আবার সেই প্রতিরোধ শুরু হয়েছে। এত দিন রাজনৈতিক অধিকার ও অর্থনৈতিক অধিকার অথবা রাজনৈতিক সমানাধিকার ও অর্থনৈতিক অধিকারকে দু’টি স্বতন্ত্র বিষয় ভাবা হত। কিন্তু শাসনের বিবর্তনে রাজনৈতিক অধিকার ও পরিচিতি হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক সত্তার চাবিকাঠি। অসমে সাধারণ মানুষের ব্যাপক হারে রাজনৈতিক অধিকার হরণ, অসংখ্য মানুষকে বন্দি শিবিরে চালান, নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু— দেশবাসী এ-সব জানে। নাগরিকত্বের বিষয় আজ সাধারণ বুদ্ধির অন্তর্গত। ভোট না-দিতে পারলে মানুষ খাবার পাবে কি না সেটাই এখন বৃহত্তম প্রশ্ন।

তবু, বিশেষত বামপন্থী দলগুলি ও কংগ্রেস এ নিয়ে যথাযথ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হল কেন? রাষ্ট্রযন্ত্রের উপরে চূড়ান্ত নির্ভরতা, জনগণের ক্ষোভ ও মনোভাব বোঝার অক্ষমতা এবং দলীয় সঙ্কীর্ণতা এই চিরাচরিত দলগুলিকে অকর্মণ্য করে দিয়েছে। টেলিভিশনের পর্দায় সবাই দেখেছেন, বামপন্থী যুবনেতারা ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের আড়ালে যে যথেচ্ছাচার চলছে, তার বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদকেও সমর্থনে দ্বিধাবোধ করে গণ-বিক্ষোভকে সমর্থনে অস্বীকার করছেন। তার চেয়েও বড় কথা, নাগরিক অধিকার হরণের প্রক্রিয়া এক-এক রাজ্যে এক-এক ভাবে চলছে, সেটাও তাঁরা বুঝতে পারেন না।

কেন আজ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত অথবা পরিযায়ী শ্রমিকবর্গভুক্ত মানুষজনকে নাগরিকত্ব হরণের আঘাত সহ্য করতে হচ্ছে? কেন এক-এক অঞ্চলে এই নিয়ে আমাদের বাংলা অশান্ত হচ্ছে? কেন আজ এই সামগ্রিক রাজনৈতিক অধিকার সঙ্কোচন ও হরণ সর্বাত্মক জনপ্রতিরোধের সম্মুখীন হচ্ছে? কোনও রাজনৈতিক দল যখন এই প্রশ্নগুলিও করতে পারে না, তখন তাদের অসহায়তা স্পষ্ট হয়।

পশ্চিমবঙ্গ এক সীমান্তবর্তী, প্রান্তিক রাজ্য। লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক প্রতি বছর রাজ্যের বাইরে যান কাজের খোঁজে। অনেক চেষ্টা করেও এ রাজ্যকে হিন্দুয়ানির বন্যায় ভাসিয়ে দেওয়া যায়নি। যত আর্থনীতিক মন্থরতা এসেছে, তত রাজনৈতিক স্বাভিমান বেড়েছে। যেন দরিদ্র মানুষ বলতে চেয়েছেন: আমাদেরও পরিচিতি, ভাষা, অভিমান ও অধিকারবোধ আছে। এবং এই প্রতিরোধ আসছে অসঙ্ঘবদ্ধ জনসাধারণের দিক থেকে। পরিযায়ী শ্রমিক অসংগঠিত। কৃষক জনসাধারণ অসংগঠিত। অধিকাংশ শহুরে শ্রমজীবী জনসাধারণও তথাকথিত অর্থে সংগঠিত নয়। রাষ্ট্রের কল্যাণকামী কর্মসূচির উপরে এই বিপুল অসংগঠিত জনসাধারণ নির্ভরশীল। এই কর্মসূচির উপরে জনগণের অধিকারবোধ আছে। ভোটার তালিকা সংশোধন এই অধিকারবোধে আঘাত হেনেছে। জনবাদীদের বাদ দিলে এই বিপদের দিনে আর কোন রাজনৈতিক শক্তি সহায়ক রূপে হাজির হল? কেউ নয়।

কাজেই, জনসাধারণের অধিকারবোধের দিক থেকে জনবাদী রাজনীতির উপস্থিতি তাৎপর্যপূর্ণ। এই সংগ্রামে সাফল্য অথবা ব্যর্থতার উপরে নির্ভর করবে, বাংলা অসমের পথে যাবে, না স্বকীয়তা বজায় রাখতে পারবে? জনবাদী রাজনীতির বিবর্তনের ক্ষেত্রেও এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। অসংগঠিত জনসাধারণের চিন্তা, সাধারণ বুদ্ধি, এবং দাবি ও আকাঙ্ক্ষার চরিত্র অসংগঠিত জনমণ্ডলীর প্রতিনিধিরা বুঝতে পারেন। বোনাস, বাঁধা মাইনে, মজুরি বৃদ্ধি, মহার্ঘ ভাতা আদায়, ধর্মঘট— এ সব ঘিরে শ্রমিক কর্মচারী আন্দোলনে তার যে রাজনৈতিক শক্তিসমূহ অভ্যস্ত, তারা অসংগঠিত ও প্রান্তবর্তী জনগণের সমস্যা ও আকাঙ্ক্ষা বুঝতে নিদারুণ ব্যর্থ। অনিশ্চিতকে সম্বল করে যারা বাঁচে, তাদের থেকে সঙ্ঘবদ্ধ রাজনৈতিক শক্তির পার্থক্য বহু যোজন। সমাজে যে দূরত্ব অথবা ফাঁক, এর ফলে সৃষ্টি হয়, তাকে পূর্ণ করতে জাতি ধর্ম ইত্যাদি অবলম্বন করে এক নতুন ধরনের সংগঠিত শক্তির আবির্ভাব ঘটে। এই ধরনের শক্তি গোটা সমাজকে ঠেলে নিয়ে যায় ঘৃণা, ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা, দলিত ও সংখ্যালঘু নিপীড়ন, ও কর্পোরেট পুঁজিবর্গের লাগামহীন শাসনের দিকে।

জনবাদীদের উত্থান দক্ষিণপন্থীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে না। সঙ্ঘবদ্ধ বামপন্থীদের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা দক্ষিণপন্থী রাজনীতির সুবিধা করে দেয়। এই দক্ষিণপন্থী রাজনীতির পদাতিক বাহিনী হয়ে দাঁড়ায় অসংগঠিত অংশ থেকে আসা মানুষজন। এমনকি পরিযায়ী শ্রমিকও। এই রকম এক দ্বন্দ্বসঙ্কুল পরিস্থিতির ক্রমাগত মোকাবিলা জনবাদীরা কত দূর করতে পারবেন? অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও অনিশ্চিতিকে সম্বল করে সংগ্রাম চরিত্রগত ভাবে কৌশলকেন্দ্রিক। তার রণনীতি থাকে না, সমাজ পুনর্নির্মাণের কর্মসূচি থাকে না, প্রতিরোধ প্রশস্ত করার বিবেচনা ও দূরদৃষ্টি থাকে না। এ যেন এক অশান্ত সমুদ্রে ছোট নৌকার ভরসায় ভেসে থাকা।

তবু তা ডুবে যাওয়ার চেয়ে ভাল। কিন্তু রাজনীতিতে ক্রমাগত রক্ষণাত্মক অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসার পথ কী? রাজনীতির মধ্যেই এর উত্তর আমাদের খোঁজা শুরু করতে হবে। যদিও এ-প্রশ্ন সঙ্গত, জনবাদী রাজনীতির ভিতর থেকে কত দূর এর উত্তর পাওয়া যাবে? নির্বাচনী পরীক্ষায় এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও হয়তো জনবাদীরা উতরে যাবেন। কিন্তু মৌলিক প্রশ্ন থেকে যাবে, জনবাদী রাজনীতির দিগন্ত প্রশস্ত হবে কোন পথে? সেই বিচারে নির্বাচনে জেতা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমগুরুত্বপূর্ণ হল, আগুনে পুড়ে যাতে কোনও শ্রমিকের মৃত্যু না হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ করা। মেদিনীপুর অথবা অন্য অঞ্চল থেকে শহরে কাজ করতে এসে তাঁরা যেন সামাজিক সুরক্ষা ও শ্রমিক সুরক্ষার নিশ্চিতি পান, তা দেখা, যাতে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা সরকারকে ভয় পান, শ্রম-অধিকার ও শ্রমিক সুরক্ষার ব্যবস্থা মানতে বাধ্য হন। কৃষক তাঁর পণ্যের ন্যায্যমূল্য না-পেলে সরকারি অফিসারদের যেন জবাবদিহি করতে হয়, তা-ও দেখা। কল্যাণকামী প্রশাসনের রুদ্ররূপ না দেখতে পেলে প্রজারা সে প্রশাসনকে শ্রদ্ধা করে না, সম্ভ্রম জানায় না। তখন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির অনেকটাই দুর্নীতি, শৈথিল্য ও নিম্নমানের প্রশাসনের ফাঁক দিয়ে গলে পড়ে যেতে পারে। জনবাদী প্রশাসনের অন্তর্বস্তু জনতাকে নিয়ে। অসঙ্ঘবদ্ধ জনতাই এই প্রশাসনের শক্তি। অসঙ্ঘবদ্ধ শ্রমিক, যাঁর এক বিপুলাংশ বাড়িতে কর্মরত মা-বোনেরা, এই সরকারের সৈন্যবাহিনী।

এক সময় বাংলার অর্থনীতি ছিল ভূস্বামী প্রথা-কেন্দ্রিক। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বেশ কিছু বড় শিল্প, খনিজ শিল্প, বাণিজ্য। পরে এই অর্থনীতি ক্রমশ মধ্যবিত্ত-কেন্দ্রিক অর্থনীতি হয়ে দাঁড়ায়। চাকরি তার প্রথম ও শেষ কথা। আজ পশ্চিমবঙ্গ এক নিবিড় শ্রমনির্ভর অর্থনীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি হিসাবে পশ্চিমবঙ্গে বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের অনেক নীচে। এ রাজ্য থেকে বহু শ্রমিক যান দেশের অন্যত্র কর্মসংস্থানের অন্বেষণে, দেশের বাইরেও যান অনেক। তেমনই অন্য প্রদেশ থেকে ও অন্য দেশ থেকে শ্রমিক আসেন এ রাজ্যে। এই সব কাজের বেশির ভাগই শ্রমনিবিড়, যার বড় অংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে নিয়োজিত। এ ছাড়া রয়েছে বালি তোলা থেকে রাস্তা তৈরি, পরিবহণ, গৃহপরিচারিকা থেকে সেবাকর্মীর কাজ। এর উপরে রয়েছে কৃষক সমাজের অন্তর্গত বিপুল সংখ্যক নারী।

জনবাদী সরকারের সমর্থনভিত্তি এঁরা। অথচ কিছু স্ব-উৎপাদন প্রকল্পে উৎসাহপ্রদান, সামাজিক ও আর্থিক সাহায্য ভাতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে কিছু প্রসার ছাড়া আমরা অসংগঠিত শ্রমিক নরনারীদের জীবনে কোনও বিশেষ উন্নতি লক্ষ করছি? পশ্চিমবঙ্গের অসংগঠিত অর্থনৈতিক কাঠামোর উন্নয়ন কি দেখা যাচ্ছে? আন্তঃরাজ্য অভিবাসী শ্রমিক সম্পর্কিত আইনকে কি যথেষ্ট শক্তিশালী বলা যায়? সর্বভারতীয় গড়ের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে শ্রমজীবী মানুষের অনুপাত বেশ খানিকটা বেশি। এই শ্রমনির্ভর অর্থনীতিতে সরকারি উদ্যোগে অসংগঠিত শ্রমজীবী মানুষের সুরক্ষাপ্রদান, তাঁদের আয়বৃদ্ধিতে সহায়তাদান, তাঁদের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রসার ও বসবাসের সংস্থান ভিন্ন এক জনবাদী সরকারের আর কোনও লক্ষ্য হতে পারে কি?

এর জন্য নানা উপায়ে সম্পদ সৃষ্টি করতে হবে। সরকারের আয় বাড়াতে হবে। অসংগঠিত জনসাধারণের রক্ষার্থে সমাজের নিয়মকানুন কার্যকর করা দরকার। বন্দর থেকে কারখানা হয়ে গ্রাম পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থার সংস্কার চাই। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে সহায়তা দান চাই। বিকল্প নকশা এক দিনে তৈরি হবে না, কিন্তু তবু অসংগঠিত শ্রমকে ঘিরে উন্নয়নের চালচিত্র তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।

নির্বাচনে জয়ী হওয়ার থেকে এই কাজ কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। যে রাজনৈতিক সংগ্রাম জনবাদীরা নির্বাচনে আসার আগে চালিয়েছেন, তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া দরকার এই পথে। জনবাদী রাজনীতি সেই তাৎপর্যপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আরও পড়ুন