জনপরিসরে এক ধরনের পরিবর্তন ক্রমশ চোখে পড়ছে। কোনও বিষয়ে মতভেদ হলেই যুক্তির বদলে ব্যক্তিগত আক্রমণের পথ বেছে নিচ্ছেন অনেকেই। আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই মানুষ পক্ষ বেছে নিচ্ছেন। কোনও বক্তব্যের সত্যতা বা যুক্তি বিচার করার আগে বক্তার রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত বিশ্বাস নিয়ে রায় দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সমাজমাধ্যমে এই প্রবণতা বিশেষ ভাবে দৃশ্যমান হলেও বিষয়টি সেখানে সীমাবদ্ধ নয়। যেন চিন্তাশীলতা, মননশীলতা এবং বৌদ্ধিক চর্চার প্রতিই এক ধরনের অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। এই পরিবর্তনকে শুধু রাজনৈতিক মেরুকরণের ফল বলে ব্যাখ্যা করা যায় কি? সমস্যার শিকড় সম্ভবত আরও গভীরে। সমাজ কী ধরনের মানুষ তৈরি করতে চেয়েছে, চাইছে— এই প্রবণতার ব্যাখ্যা খুঁজতে হবে সেখানে।
গত শতাব্দীতে বহু সমাজবিজ্ঞানী ও শিক্ষাচিন্তক দেখিয়েছেন যে, বুদ্ধিবৃত্তির প্রতি বিরাগ সাধারণত হঠাৎ করে জন্ম নেয় না। এর সঙ্গে সমাজের শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের গভীর সম্পর্ক থাকে। যখন কোনও সমাজে চিন্তার চেয়ে তৎক্ষণাৎ ব্যবহারিক ফল বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন ধীরে ধীরে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সামাজিক মর্যাদাও কমতে শুরু করে।
এক সময় শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য হিসাবে ধরা হত মানুষের মনের বিকাশকে। শিক্ষা মানে শুধু তথ্য অর্জন নয়; শিক্ষা মানে বিচারক্ষমতা তৈরি করা, জটিল প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে শেখা, ভিন্ন মত বোঝার ক্ষমতা অর্জন করা। সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান কিংবা মৌলিক বিজ্ঞান— সব কিছুর মধ্যেই সেই বৃহত্তর উদ্দেশ্য কাজ করত। শিক্ষার লক্ষ্য ছিল মানুষকে শুধু দক্ষ কর্মী নয়, সচেতন নাগরিক হিসাবেও গড়ে তোলা।
গত কয়েক দশকে পাল্টে গিয়েছে এই লক্ষ্যটাই। ক্রমশ শিক্ষাকে বিচার করা হচ্ছে তার অর্থনৈতিক উপযোগিতার ভিত্তিতে। কোনও বিষয় পড়লে চাকরি পাওয়া যাবে কি না, কত দ্রুত পাওয়া যাবে, বেতন কত হবে, বাজারে তার চাহিদা কত— এই প্রশ্নগুলিই কেন্দ্রে চলে এসেছে। ব্যবহারিক দক্ষতার গুরুত্ব অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু, যখন এটাই শিক্ষার একমাত্র মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়, সমস্যা শুরু হয় তখন।
এমন একটি ধারণা তৈরি হয় যে, জ্ঞানের মূল্য নির্ধারিত হবে তার বাজারদর দিয়ে। যে জ্ঞান সরাসরি অর্থনৈতিক লাভ এনে দেয়, সেটি মূল্যবান; যে জ্ঞান তা পারে না, সেটি অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ। এ ভাবেই সাহিত্য, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান কিংবা ইতিহাসের মতো বিষয়গুলি ধীরে ধীরে প্রান্তে সরে গিয়েছে। এই মানসিকতার প্রভাব শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ধীরে ধীরে তা সমাজের বৃহত্তর সংস্কৃতিতেও প্রবেশ করে।
যখন শিক্ষার উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় শুধুমাত্র বাজারে নিজের মূল্য বাড়ানো, তখন মানুষকে আর জটিল প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে শেখানোর প্রয়োজন অনুভূত হয় না। সমালোচনামূলক চিন্তা, নৈতিক বিচার, সামাজিক সংবেদনশীলতা বা ঐতিহাসিক চেতনা— এই বিষয়গুলি গৌণ হয়ে যায়। তার জায়গা নেয় দক্ষতা, প্রতিযোগিতা এবং ব্যক্তিগত সাফল্যের ভাষা। ফলে, আমরা প্রযুক্তিগত ভাবে আরও উন্নত হই, কিন্তু একই সঙ্গে চিন্তার প্রতি ধৈর্য হারাতে থাকি। তথ্যের পরিমাণ বাড়ে, কিন্তু বিশ্লেষণের ক্ষমতা বাড়ে না। মতামতের সংখ্যা বাড়ে, কিন্তু আলোচনার মান উন্নত হয় না। মানুষ ক্রমশ জটিলতার প্রতি অধৈর্য হয়ে ওঠে।
গণতান্ত্রিক সমাজে মতভেদ স্বাভাবিক। বিভিন্ন প্রশ্নের একাধিক ব্যাখ্যা থাকবে, বিভিন্ন অবস্থান থাকবে, বিভিন্ন ধরনের যুক্তি থাকবে। কিন্তু জটিলতা বোঝার অভ্যাস কমে গেলে মানুষ সহজ উত্তর খুঁজতে শুরু করে। তখন ধীরে ধীরে এমন ধারণা জন্মায় যে প্রতিটি প্রশ্নের একটিমাত্র সঠিক উত্তর আছে— যে উত্তর আমি জানি, সেটাই সেই ঠিক উত্তর— এবং, যাঁরা অন্য কথা বলছেন, তাঁরা হয় বিভ্রান্ত, নয়তো অসৎ।
ক্রমে যুক্তির বদলে আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কে বলছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে; কী বলছে, সেটি নয়। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার প্রতি অবিশ্বাসও এই জায়গা থেকেই জন্ম নেয়। কারণ চিন্তার কাজই হল প্রশ্ন তোলা, জটিলতা দেখানো, নিশ্চিত সত্যের দাবিকে পরীক্ষা করা। যে সমাজ দ্রুত, সরল এবং চূড়ান্ত উত্তর খোঁজে, সেখানে এই কাজটি স্বাভাবিক ভাবেই অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।
এই কারণেই আজ আমরা এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে বিশেষজ্ঞ জ্ঞানকে সন্দেহ করা সহজ, কিন্তু জনপ্রিয় মতামতকে প্রশ্ন করা কঠিন। গবেষণা, তথ্য বা যুক্তির বদলে আবেগ এবং পরিচয় অনেক সময় বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠছে। ইতিহাসকে সরলীকৃত করা হচ্ছে, সামাজিক বাস্তবতাকে সাদা-কালোয় ভাগ করা হচ্ছে, এবং জটিল সমস্যার সহজ সমাধান খোঁজা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি পাল্টাতে চাইলে শিক্ষার ধারণাকে নতুন করে ভাবতে হবে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য এমন মানুষ তৈরি করা, যারা নিজেরা চিন্তা করবে, নিজেরা সন্ধান করবে এবং নিজেরা কাজ করবে। সেই কথাটি আজ নতুন করে মনে পড়ে। কারণ চিন্তার অভ্যাস হারিয়ে ফেললে শুধু বুদ্ধিবৃত্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতন্ত্র, এবং সমাজজীবনের মৌলিক ভিত্তিও।