নারীবাদের সঙ্গে কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে সম্বন্ধ রয়েছে, তা খানিকটা ব্যাখ্যা করা যায় প্রখ্যাত সমালোচক হ্যারন্ড ব্লুম কথিত ‘সৃজনশীলের ইডিপাল কমপ্লেক্স’-এর মাধ্যমে। ব্লুমের বইটির নাম ছিল অ্যাংজ়াইটি অব ইনফ্লুয়েন্স। পূর্বজদের দ্বারা বেশি প্রাণিত হয়ে যাচ্ছেন না তো? এই আশঙ্কায় সুযোগ্য লেখকেরা প্রায়ই জর্জরিত হন। সুযোগ্য কুন্তলাও নিঃসন্দেহে। তাঁর ক্ষেত্রে উদ্বেগটি একটু অন্য রকমও বটে। কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে একটা আকর্ষণ-বিকর্ষণের খেলা চলছে—পূর্বজাদের লিখনশৈলীর ততটা নয়, যতটা পূর্বজাদের নারীবাদী দর্শনের। তাঁর নয়টি গল্পের প্রতিটিই যে মেয়েদের গল্প, তা ভূমিকায় আত্মসমালোচনার ঢঙে বলে রেখেছেন লেখিকা।
ভাষার মুনশিয়ানা তাঁর সহজাত। উত্তীর্ণ লেখককে খুব সহজে কোনও ছকে ফেলা যায় না। কুন্তলারও ভাষা বদলায় গল্প থেকে গল্পে, চরিত্রের মনন ও গল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী। কখনও ভাষা রূপকথার মতো মেদুর। কখনও আবার ইচ্ছাকৃত ভাবে বাংরেজিময় ও উচ্চকিত (যেমন, ‘খোলার ট্রাই করলাম’)। শৈলীও একবগ্গা নয়, নানা সুরে রচা এক মিশ্র ঠাট যেন। প্রথম দু’টি গল্প— ‘রানি ও কেরানি’ এবং ‘যোগমায়া হালদার’ আসে জাদুবাস্তবের সম্ভাবনা নিয়ে। আর দু’টিতেই আসে দুই পাখির রূপক, দুই ভিন্ন প্রয়োজনে। কিন্তু পাঠক যদি ভাবেন, ‘প্যাটার্নটা’ ধরা গেছে, তবে তা ভুল। পরের গল্প ‘সনকা সেন’-এ জাদু উবে গিয়ে পড়ে রয় বাস্তব। সেখানে বাক্যের গাঁটে গাঁটে উইট আর আয়রনি-র শয়তানি। নানা রকম পৌরুষও আমরা দেখি। এক দিকে ‘একটি মফঃস্বলী তদন্ত’-র চ্যাটচেটে পৌরুষ, যাকে সহজে হিংস্র বলে চেনা যায়। অন্য দিকে ‘মিতা ও মাসিমা’, ‘কিসলোস্কি’ কিংবা ‘মিরর, মিরর’ পড়লে বোঝা যায়, লেখক খুবই অবগত প্রগতিশীল পুরুষের সমানতার ভড়ংয়ে ঢাকা পিতৃতান্ত্রিকতা সম্বন্ধে। সে-সবের প্রতিও ব্যঙ্গ তাঁর শাণিত। তবে তার চেয়েও শাণিত তাঁর বিদ্রূপ, শ্রেণিচেতনাহীন নারী আন্দোলন সম্পর্কে (‘লিটিল হার্ট’)।
একা মেয়ে, বেঁকা মেয়েকুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়
২৭৭.০০
গুরুচণ্ডা৯
তবে কি সোজাসাপটা তরোয়াল ঝনঝনানোই লক্ষ্য ও মোক্ষ? না। বঙ্কিমত্ব এ বইয়ের নামকরণের অলঙ্কার। এই যে বাঁকা হাসি, সারকাজ়ম— এও এক রকম ডিফেন্স মেকানিজ়ম বই তো নয়। চরিত্রদের অসহায়তার প্রতিরোধ। এ-বইয়ের চরিত্ররা সকলেই একা নারী। নানা রকমের একাকিত্ব। কেউ বিবাহে অনিচ্ছুক, বা বিবাহবিচ্ছিন্ন, বা বিয়ে-না-হওয়া-মেয়ে বলে পরিবারহীন। পরিবার থাকা সত্ত্বেও কাউকে গ্রাস করে বিষণ্ণ মানসিক একাকিত্ব। আছে স্বরহীনের বৌদ্ধিক একাকিত্ব। আরও আছে প্রৌঢ়ত্বের বা বার্ধক্যের একাকিত্ব। এবং যৌন একাকিত্ব। একাকী নারীরা প্রায়শই লোকচক্ষে ‘উন্মাদিনী’, যা এক পরিচিত নারীবাদী ট্রোপ। তারা বাস্তবেই উত্তরণের পথ খুঁজে পেলে ভাল— পাটরানির তখন কেরানি হতে আপত্তি নেই (‘রানি ও কেরানি’)। বসুন্ধরাও তখন পরের উপন্যাসটি ছকে ফেলে বা ধূসর চুল ঠিক করে স্যমন্তকের জন্য দরজা খুলে দেয় (‘মিরর, মিরর’)। কিন্তু ডানা ছড়ানোর বিকল্প জমিন যখন তারা বাস্তবে খুঁজে না পায়, তখন তারা জাদুবাস্তবের (কখনও কখনও অতিলৌকিকের) আশ্রয় নেয়। তখনই যোগমায়া আর দস্তুরিখানা স্ট্রিট চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায় খুশিমনে (‘যোগমায়া হালদার’)। সুড়ঙ্গের ও-পারের অতল ঘরের সম্রাজ্ঞী হয় মহুয়া (‘কিসলোস্কি’)। বা আস্ত এক মেয়ে একটা জারুলগাছ হয়ে যায় (‘অটবী ও জারুল’)।
এই বইটি ছোটগল্পেরই বই কি না, তা নিয়ে তাত্ত্বিক সংশয় থাকতে পারে। বইটিকে ‘গল্পের বই’ বলে অভিহিত করা হয়েছে হয়তো ইচ্ছাকৃত ভাবেই। আধুনিক ছোটগল্পের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য উপেক্ষা করেছে শেষ দু’টি গল্প (‘কিসলোস্কি’ এবং ‘অটবী ও জারুল’)। এরা কেবল আকারে বড় নয় (এক-একটি প্রায় ত্রিশ-চল্লিশ পাতা); সেখানে আছে চরিত্রের ঘনঘটা, ঘটনার অতিরেক ও কয়েক প্রজন্মের যাত্রা। তা দুর্বলতা নির্দেশ করে না, বরং এদের মধ্যে নিহিত উপন্যাস বা নিদেনপক্ষে উপন্যাসিকার উপাদান। তা মেয়ে লেখকের ছড়িয়ে গল্প বলার নিজস্ব ঢং-ও হতে পারে, যাকে সম্ভবত লুসি ইরিগেরে বা এলেন সিক্সু-রা (নারীবাদী লেখক ও সাহিত্য সমালোচক) দু’হাত তুলে সমর্থনই করতেন।
কিন্তু যা বোঝা যায় না, মেয়ে চরিত্রদের নিয়ে গল্প ফাঁদার প্রবণতাকে লেখক কেন ‘কমফর্ট জোন আঁকড়ে থাকার চারিত্রিক দুর্বলতা’ বলে অভিহিত করে নিজেকে দোষেন ‘ভূমিকা’ অংশে? যুগ-যুগান্তর ধরে পুরুষ লেখক পুরুষের মনন ও মনস্তত্ত্ব নিয়ে লেখার আগে কোনও ‘অ্যাপোলজিয়া’ লেখেননি, মহান সাহিত্য সৃষ্টি হওয়াও আটকায়নি। আবার টোনি মরিসন বলেছিলেন, তিনি কৃষ্ণাঙ্গ নারীর ইতিহাস-নির্বাপিত গল্পই বলবেন ও বেশ করবেন। অ্যাঞ্জেলা কার্টার, মার্গারেট অ্যাটউড বা নবনীতা দেব সেন— কেউই ‘লেবেল’মণ্ডিত হয়ে যাওয়ার ভয় পাননি ‘অন্য’দের গল্প লিখতে গিয়ে। এবং মহান সাহিত্য সৃষ্টি হওয়া তাতেও আটকায়নি। কুন্তলার অভিজ্ঞতারাও নারীদৃষ্টিভঙ্গির ছাদে মেলা ছিল বহুকাল। শুকিয়ে, জারিয়ে, তারা গল্প হয়েছে— এ ভারী আনন্দ ও উদ্যাপনের বিষয়। বাংলা সারস্বত সমাজেই কি এমন কোনও দুর্বলতা আছে, যার জন্য এমন দুর্দম বইয়ের ভূমিকায় লেখককে ‘আমি ক্ষমাপ্রার্থী’ লিখতে হয়?