Bounty

নাগরিকের মাথার দাম

এ বিষয়ে সমস্ত রাজনৈতিক দল নীরব, বিচার ব্যবস্থার দিক থেকেও কোনও নিষেধ আসেনি। কিন্তু সবাই নীরব থাকলেও অন্যায়টা ন্যায় হয়ে যাবে না।

রঞ্জিত শূর
শেষ আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৪৮

ভারতের ‘মাওবাদী-মুক্ত’ হওয়ার সময়সীমা ছিল ৩১ মার্চ, ২০২৬। ২০২৫ সাল জুড়ে নিত্য দিন কোনও না কোনও মাওবাদী নেতার ‘সংঘর্ষে মৃত্যু’ উঠে এসেছে খবরে। সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে তাঁর ‘মাথার দাম’ ছিল কত টাকা। দু’কোটি টাকা যাঁর মাথার দাম ঘোষণা হয়েছে, তেমন বড়সড় নেতাকেও নিকাশ করার উল্লাস শোনা গিয়েছে মন্ত্রী-আধিকারিকদের গলায়। মার্চ মাস জুড়ে খবর হয়েছে, একের পর এক মাওবাদী নেতা, কর্মী ‘আত্মসমর্পণ’ করছেন। এখন এই আত্মসমর্পণকারীদের পুনর্বাসন হবে কী করে, তার পরিকল্পনা চলছে।

কিন্তু যে প্রশ্নটা ধাক্কা মারে তা হল, ‘মাথার দাম’ মানে কী? একটি সংবিধান-শাসিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শাসকরা কী ভাবে নাগরিকের মাথার জন্য দাম ধার্য করতে পারেন? রবিন হুডের গল্পে পাওয়া যায় এই ঘটনা যে, নটিংহামের শেরিফ রবিন হুডের মাথার দাম ঘোষণা করেছিলেন। রাজদ্রোহী রবিন হুডকে জীবিত বা মৃত ধরে আনতে পারলে পুরস্কার দেওয়া হবে। কিছু রাজতন্ত্র-শাসিত আরব দেশে এখনও ‘ব্লাড মানি’ বা রক্তের দাম চোকানোর রীতি আছে। অর্থাৎ, কাউকে খুন করে টাকার অঙ্কে ক্ষতিপূরণ দিয়ে পার পেয়ে যাওয়া। কিন্তু কোনও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কি সরকার কোনও আইন লঙ্ঘনকারীর মাথার দাম ঘোষণা করতে পারে? এমনকি যদি সে হয় ‘নিষিদ্ধ’ রাজনৈতিক দলের সদস্য, তা হলেও? এমন ঘোষণা তো বস্তুত হত্যার কর্মসূচি ঘোষণা করা। এবং দেশের আম-নাগরিককে সেই কর্মসূচিতে শামিল হতে আহ্বান করা। দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপায় এমন হতে পারে না।

এ বিষয়ে সমস্ত রাজনৈতিক দল নীরব, বিচার ব্যবস্থার দিক থেকেও কোনও নিষেধ আসেনি। কিন্তু সবাই নীরব থাকলেও অন্যায়টা ন্যায় হয়ে যাবে না। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সুস্পষ্ট অবস্থান ‘প্রজাতন্ত্র নিজের সন্তানকে হত্যা করতে পারে না।’ ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর ধারায় সুস্পষ্ট ভাবে বলা আছে আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কারও জীবনের অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। বিচার ছাড়া কাউকে শাস্তি দেওয়া যাবে না। কিন্তু ‘মাথার দাম’ ঘোষণায় বিচার কোথায়? বিনা বিচারে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করার বা শাস্তি দেওয়ার অধিকার তো কোনও নেতা বা আধিকারিকের নেই। তা হলে মাথার দাম ঘোষণা করে, অন্য নাগরিকদের হত্যায় প্ররোচনা দেওয়া, প্রলুব্ধ করা কেন?

কিছু দিন আগে উত্তরপ্রদেশের আদিত্যনাথ যোগী সরকার ‘দুষ্কৃতী’ বলে চিহ্নিত কিছু ব্যক্তিকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে দেওয়ালে দেওয়ালে তাদের ছবি লাগিয়েছিল। এ জন্য সরকারকে তিরস্কার করে সে সব ছবি তুলে ফেলতে বাধ্য করেছে এলাহাবাদ হাই কোর্ট। মাওবাদীদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরও ভয়ঙ্কর। বেসরকারি হিসাবে ২০২৪ থেকে অন্তত ৭৫০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মহিলা। শুধু সশস্ত্র মাওবাদী নয়, মাওবাদী পত্রপত্রিকার প্রকাশক, লেখক, তাত্ত্বিক নেতা, কর্মী, পত্রবাহক, হিসাব রক্ষক— সবাই বধ্য।

ধরে নেওয়া গেল ৩১ মার্চ, ২০২৬-এর মধ্যে সব মাওবাদীকে নিকাশ করা গেছে। তার পর? ওখানেই থামবে সরকার? ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কলমধারী নকশালদের আরও বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত করেছেন। কারণ তাঁদের মস্তিষ্ক আছে। তাঁরা নাকি মানবাধিকারের কথা বলে উন্নয়নের বিরুদ্ধাচরণ করেন। যুবসমাজের মাথা খাচ্ছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, অস্ত্রধারী মাওবাদীদের শেষ করেই শহুরে নকশালদের দিকে নজর দেবেন তাঁরা। ইতিমধ্যেই মহারাষ্ট্রে জন-নিরাপত্তায় নতুন আইন পাশ হয়েছে— মহারাষ্ট্র স্পেশাল পাবলিক সিকিয়োরিটি অ্যাক্ট, ২০২৪। তাতে বলা হয়েছে, সরকারের বিরুদ্ধে কোনও ধরনের প্রতিবাদই সহ্য করা হবে না। সরকার মনে করলে এই আইনে সমস্ত ধরনের প্রতিবাদীকেই জেলে পোরা যাবে। ইউএপিএ আইনকে সংশোধন (২০১৯) করে বলা হয়েছে, কোনও সংগঠনের সদস্য না হলেও ব্যক্তিবিশেষকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলে গ্রেফতার করা যাবে।

সবচেয়ে ভয়াবহ তাত্ত্বিক সূত্রটি জুগিয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। তিনি বলেছেন, এখন সময় হল ‘চতুর্থ প্রজন্ম’-এর যুদ্ধের। নাগরিক সমাজের (সিভিল সোসাইটি) অভ্যন্তরে যুদ্ধই হল চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধ। দেশের নিরাপত্তার জন্য সব থেকে বড় বিপদ দেশের বাইরে থেকে আসবে না, রয়েছে অভ্যন্তরেই। নাগরিক সমাজকে ভুল বুঝিয়ে বিপথে চালিত করা হতে পারে। ২০২২ সালের সুরজখণ্ড চিন্তন শিবিরের এই সিদ্ধান্ত ২০২৪ সালে অজিত ডোভাল ঘোষণা করেছেন প্রকাশ্যে। আইপিএস অফিসারদের পাসিং-আউট প্যারেডের সময় তাঁদের বলেছেন, নাগরিক সমাজকে নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিতে হবে। দেশ জুড়ে আপত্তি উঠেছে, এই তত্ত্ব যে কোনও গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ বলে দাগিয়ে দিতে পারে।

এই সময়ে দাঁড়িয়ে স্মরণ করা চাই বিশ্বের কমিউনিস্ট নিধনের ইতিহাস। চিলি এবং ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট নিধনের পরবর্তী সময়ে একে একে হত্যা করা হয়েছে সব ধরনের প্রতিবাদীকে। ছাত্র নেতা, শ্রমিক নেতা থেকে শুরু করে কোনও প্রতিবাদীকেই বাঁচিয়ে রাখেনি তারা। রাষ্ট্র বা শাসকদের প্রশ্নের মুখে ফেলবে, এমন কোনও শক্তি অবশিষ্ট ছিল না।

প্রশ্ন হল, যাঁরা মাওবাদীদের সমর্থন করেন না, তাঁদের পন্থায় বিশ্বাসী নন, তাঁরাও কি মাওবাদী নিকাশ প্রক্রিয়ার পর নিরাপদ রইলেন? তাঁদের প্রতিবাদও কি সুরক্ষিত থাকবে রাষ্ট্রের রোষ থেকে— সংবিধানের গণ্ডি যা অনায়াসে অতিক্রম করতে পারে? আশঙ্কা হয়, প্রতিবাদ-মুক্ত, প্রতিবাদী-মুক্ত দেশই লক্ষ্য শাসকদের। আমাদের সমবেত নীরবতা তাকেই ত্বরান্বিত করছে।

আরও পড়ুন