গোলের পর ইকুয়েডরের প্লাতার উল্লাস। ছবি: রয়টার্স।
জার্মানি ১ (সানে)
ইকুয়েডর ২ (আঙ্গুলো, প্লাতা)
এ বারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অঘটন দেখা গেল বৃহস্পতিবার রাতে। এগিয়ে গিয়েও ইকুয়েডরের কাছে হেরে গেল জার্মানি। প্রথম দু’টি ম্যাচ জিতে আগেই নকআউট নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল জার্মানির। তাই এ যাত্রায় রক্ষা পেল তারা। নিউ জার্সির আকাশে শোনা গেল ইকুয়েডরের উল্লাস। তারাও উঠে গেল নকআউটে। ১-২ গোলে হারল জার্মানিকে। লেরয় সানে এগিয়ে দিয়েছিলেন জার্মানি। ইকুয়েডরের হয়ে গোল নিলসন আঙ্গুলো এবং গনজ়ালো প্লাতার। অন্য ম্যাচে, কুরাসাওকে ২-০ হারিয়ে নকআউট নিশ্চিত করল আইভরি কোস্টও।
১২ বছর পর বিশ্বকাপের নকআউটে উঠেছে জার্মানি। কিন্তু ছোট দলের কাছে হারের অভ্যাস এ বারও বজায় থাকল তাদের। ২০১৮-য় দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল জার্মানরা। ২০২২-এ হেরেছিল জাপানের কাছে। এ বার এশিয়া নয়, জার্মানদের হারতে হল লাতিন আমেরিকার একটি দেশের কাছে, যারা ফুটবলবিশ্বের খুব একটা বড় নাম নয়।
নিউ ইয়র্কের পাশাপাশি ইকুয়েডরের বহু মানুষ থাকেন নিউ জার্সিতে। ফলে বৃহস্পতিবার রাতে মেটলাইফ স্টেডিয়াম কার্যত সর্ষের খেত হয়ে উঠেছিল। দিকে দিকে হলুদ জার্সির ছড়াছড়ি। স্টেডিয়াম দখলের লড়াইয়ে আগেই পিছিয়ে পড়েছিলেন জার্মানরা। দিনের শেষে মাঠের লড়াইয়েও তাঁরা পিছিয়ে গেলেন। রেফারি টোরি পেন্সো শেষ বাঁশি বাজাতেই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে দু’রকম দৃশ্য দেখা গেল। কেউ কেউ সঙ্গী সঙ্গীনীর কাঁধে মাথা দিয়ে বা গায়ে পতাকা জড়িয়ে কাঁদতে শুরু করে দিলেন। আর এক দল সোল্লাসে নাচতে শুরু করে দিলেন। আশেপাশে কে আছে, কী হচ্ছে, সে সবের পরোয়াই করলেন না তাঁরা।
ইকুয়েডরের কোচ সেবাস্তিয়ান বেকাসিসি প্রথমে আনন্দে লাফাতে লাফাতে মাঠের ভেতরে ঢুকে খেলোয়াড়দের জড়িয়ে ধরতে থাকলেন। তার পরেই এক লাফে গ্যালারিতে উঠে জড়িয়ে ধরলেন পরিবারের সদস্যদের। এ দিনের জয়ে বড় অবদান তো তাঁরও। গোটা ম্যাচে সাইডলাইনের ধারে চেঁচিয়ে, হাততালি দিয়ে, দৌড়োদৌড়ি করে গোটা দলকে উদ্বুদ্ধ করে গেলেন। রেফারির সিদ্ধান্ত দলের বিরুদ্ধে যাওয়ায় কার্ডের পরোয়া না করে তর্ক করলেন। দিনের শেষে তাঁর মস্তিষ্কই জয় এনে দিল ইকুয়েডরকে। জার্মানির মতো বড় দলের সামনে গুটিয়ে থাকা নয়, বরং গোটা ম্যাচে দাপট দেখিয়ে জিতল ইকুয়েডর।
ম্যাচের দ্বিতীয় মিনিটেই এগিয়ে যায় জার্মানি। তবে যে ভাবে গোলটি হল তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিতেই পারে। ডেভিড রাউমের থ্রো থেকে বল পেয়েছিলেন আলেকসান্ডার পাভলোভিচ। তিনি পা অনেকটাই উঠিয়ে বলটি রিসিভ করেন। হেড করতে গিয়ে ইকুয়েডরের এক ফুটবলারের মাথায় লাগে পাভলোভিচের পা। এর পর পাভলোভিচের পাস থেকে চলতি বলে শট নিয়ে গোল করেন লেরয় সানে।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে রেফারি এবং ভার-এর সিদ্ধান্ত নিয়ে। বুধবার রাতে সামান্য ফাউল করার জন্য বাতিল করে দেওয়া হয়েছিল ভিনিসিয়াসের গোল। তা হলে সানের গোল দেওয়া হল কোন যুক্তিতে? পা উপরে তুলে প্রতিপক্ষকে আঘাত করার ক্ষেত্রে হলুদ তো বটেই, লাল কার্ডও দেওয়া হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনওটিই হল না। রেফারি যুক্তি দিলেন, যে হেতু বলটি আগে পাভলোভিচের পায়ে লেগেছে তাই সেটি ফাউল নয়।
ও ভাবে গোল হজমই হয়তো ইকুয়েডরের জেদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। এর পর কয়েক মিনিট তারা আক্রমণের ঝড় বইয়ে দেয় জার্মানির বক্সে। এবং ন্যায্য ভাবেই গোলও শোধ করে দেয়। দূরপাল্লার শটে গোল করেন আঙ্গুলো। কুরাসাওয়ের বিরুদ্ধে দাপটে খেলেও তারা গোল করতে পারেনি বিপক্ষ গোলকিপার এলয় রুমের জন্য। কিন্তু মানুয়েল নুয়েরকে পরাস্ত করতে অসুবিধা হয়নি।
এর পর বাকি ম্যাচে যা হল, তা জার্মানির বড় ভক্তেরাও হয়তো বিশ্বাস করতে পারবেন না। গোল করে ইকুয়েডরের আত্মবিশ্বাস এক লাফে বেড়ে তিন গুণ হয়ে গিয়েছিল। জার্মানির ততটাই কমে গিয়েছিল। গোটা মাঠে তখন ইকুয়েডরের দাপট। বল ঘোরাফেরা করছিল তাদেরই পায়ে। চাপের মুখে জার্মানির গোটা দলই কার্যত নীচে নেমে এসেছিল। সাত-আট জন মিলে রক্ষণ করছিলেন। আক্রমণে উঠেও সুবিধা করতে পারছিল না জার্মানি। কিছু ক্ষণ পরেই ইকুয়েডরের কোনও না কোনও ফুটবলার এসে বল কেড়ে নিচ্ছিলেন। পাশাপাশি, সানে, উইর্ৎজ়, কাই হাভার্ৎজ়ের জন্য ছিল জ়োনাল মার্কিং। অর্থাৎ বল পেলেই ঘেরাও হয়ে যাচ্ছিলেন ইকুয়েডরের কাছে।
জার্মানি আপ্রাণ চেষ্টা করেছে ব্যক্তিগত নৈপুণ্য দিয়ে ম্যাচটি বার করার। কিন্তু সফল হয়নি তারা। গোল করার জন্য এতটুকু ফাঁক দিচ্ছিল না ইকুয়েডরের রক্ষণ। জার্মানি দূরপাল্লার শট নেওয়ার চেষ্টা করেও সফল হয়নি। কোনও বলই লক্ষ্যে থাকেনি। উল্টো দিকে, ইকুয়েডরের অস্ত্র ছিল গতি। বল পেলে যে ভাবে তারা সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল, তার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেনি জার্মানি। শেষ গোলটিও আসে বুদ্ধি করে। কর্নার থেকে হেড ভেসে আসছিল নুয়েরের দিকে। জার্মান গোলকিপার বল ধরার আগেই পায়ের টোকায় জালে জড়িয়ে দেন গনজ়ালো প্লাতা।
এর মাঝেই পেনাল্টি দেওয়া হয়েছিল ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে। সেটিও ছোট ভুলের কারণে। বক্সের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছিল হাভার্ৎজ়কে। যদিও রিপ্লে দেখে সিদ্ধান্ত বদলান রেফারি পেন্সো। ওই ফাউলের আগে ইকুয়েডরের পেদ্রো ভিতেকে ফাউল করেছিলেন সানে। সে কারণে ফ্রিকিক পায় ইকুয়েডর।
আইভরি কোস্ট ২ (পেপে ২)
কুরাসাও ০
দুই অর্ধে গোল করে আইভরি কোস্টকে প্রথম বার বিশ্বকাপের নকআউটে তুলে দিলেন নিকোলাস পেপে। গ্রুপে জার্মানির সঙ্গে সমান, ৬ পয়েন্ট হল আইভরি কোস্টের। তারা দ্বিতীয় স্থানে থেকে নকআউটে গেল। কুরাসাও অষ্টম দেশ হিসাবে ছিটকে গেল বিশ্বকাপ থেকে।