নগদ হস্তান্তর প্রকল্প আর উন্নয়ন নীতির প্রশ্ন
Government Scheme

নাম পাল্টাচ্ছে, চরিত্রও?

লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পটি নিছক একটি নগদ সহায়তা প্রকল্প ছিল না। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর ধীরে ধীরে তা রাজ্যের সবচেয়ে বিস্তৃত সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলির একটিতে পরিণত হয়।

শুভাশিস দে
শেষ আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬ ০৭:৫৪
সূচনা: চলছে অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম পূরণের কাজ। ২ জুন, দুর্গাপুর। বিকাশ মশান

সূচনা: চলছে অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম পূরণের কাজ। ২ জুন, দুর্গাপুর। বিকাশ মশান

পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে তৃণমূলের অন্যতম জনপ্রিয় প্রকল্প ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর পরিবর্তে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ চালু করা। মাসে ১৫০০ টাকার পরিবর্তে ৩০০০ টাকা। সংখ্যাটি দ্বিগুণ, প্রতিশ্রুতিটিও আকর্ষণীয়। কিন্তু রাজনৈতিক স্লোগান এবং আর্থিক প্রতিশ্রুতির আড়ালে কিছু প্রশ্ন রয়েছে, যেগুলি না তুললে আগামী দিনের পশ্চিমবঙ্গকে বোঝা অসম্ভব।

লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পটি নিছক একটি নগদ সহায়তা প্রকল্প ছিল না। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর ধীরে ধীরে তা রাজ্যের সবচেয়ে বিস্তৃত সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলির একটিতে পরিণত হয়। ২০২৫-২৬ নাগাদ প্রায় ২ কোটি ৪২ লক্ষ মহিলার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি অর্থ পৌঁছত এই প্রকল্পের মাধ্যমে। প্রথমে সাধারণ শ্রেণির মহিলারা পেতেন ৫০০ টাকা এবং তফসিলি জাতি ও জনজাতিভুক্ত মহিলারা ১০০০ টাকা। পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ১০০০ এবং ১২০০ টাকায়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে আরও ৫০০ টাকা যোগ করা হয়। ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ পর্যন্ত প্রকল্পটির ব্যয় গড়ে প্রতি বছর প্রায় ৪৭% হারে বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে শুধু এই প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ছিল প্রায় ২৬,৭০০ কোটি টাকা। পাঁচ বছরে মোট ব্যয় ৭০,০০০ কোটি টাকারও বেশি।

কিন্তু লক্ষ্মীর ভান্ডারের প্রকৃত শক্তি শুধু তার ব্যয়ের পরিমাণে ছিল না। তার শক্তি ছিল সরলতায়। একটি সংক্ষিপ্ত আবেদনপত্র, সীমিত কাগজপত্র এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার তুলনামূলক সরলতা প্রকল্পটিকে এমন মহিলাদের কাছেও পৌঁছে দিয়েছিল, যাঁরা সাধারণত সরকারি প্রকল্পের জটিলতার কারণে বাদ পড়ে যান। প্রত্যন্ত গ্রামের স্বল্পশিক্ষিত মহিলা থেকে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক— সবার কাছে প্রকল্পটি পৌঁছেছিল।

এই প্রেক্ষাপটে অন্নপূর্ণা যোজনার আবেদনপত্রটির কথা বিবেচনা করলে স্পষ্ট, টাকা দ্বিগুণ হলেও আবেদন প্রক্রিয়া বহু গুণ জটিল হয়েছে। ১১ পৃষ্ঠার ইংরেজি এবং ১৩ পৃষ্ঠার বাংলা ফর্মে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের আধার নম্বর, ভোটার পরিচয়পত্রের তথ্য, ব্যাঙ্কের বিবরণ, জমিজমার নথি, যানবাহনের তথ্য, স্বাস্থ্যবিমার বিবরণ এবং আরও নানা তথ্য চাওয়া হয়েছে। যে মহিলাদের জন্য প্রকল্পটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাঁদের অনেকের পক্ষেই এই ফর্ম পূরণ করা সহজ হবে না। ফলে দালালচক্রের সক্রিয় হওয়া, আবেদন প্রক্রিয়ায় নির্ভরশীলতা তৈরি হওয়া এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীদের একাংশের বাদ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

যোজনার আবেদনপত্রে পরিবারের সদস্যদের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ-সংক্রান্ত আবেদনের অবস্থা জানতে চাওয়া হয়েছে। জিএসটি নিবন্ধনের তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে। এসআইআর প্রক্রিয়ায় নাম বাদ পড়া বা ট্রাইবুনাল-সংক্রান্ত তথ্যও চাওয়া হয়েছে। একটি আয়-সহায়তা প্রকল্পে এই ধরনের তথ্যের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষত যখন সুপ্রিম কোর্ট একাধিক ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব এবং ভোটার তালিকা-সংক্রান্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সীমা সম্পর্কে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। ফলে এই প্রশ্নগুলিকে শুধুমাত্র প্রশাসনিক তথ্য সংগ্রহ হিসাবে দেখা কঠিন।

এর পর আসে অর্থনীতির প্রশ্ন। লক্ষ্মীর ভান্ডার ইতিমধ্যেই ২০২৫-২৬ সালে রাজ্যের রাজস্ব প্রাপ্তির প্রায় ১০% ব্যবহার করছিল। বার্ষিক ব্যয় ছিল ২৬,৭০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। অন্নপূর্ণা যোজনার ক্ষেত্রে যদি ১.৫ থেকে ২ কোটি পরিবার অন্তর্ভুক্ত হয় এবং প্রত্যেককে মাসে ৩,০০০ টাকা দেওয়া হয়, তা হলে বার্ষিক ব্যয় ৫৪,০০০ থেকে ৭২,০০০ কোটি টাকার মধ্যে পৌঁছতে পারে। এই অঙ্ক রাজ্যের মোট ব্যয়ের ১৬ থেকে ২১ শতাংশ। এ দিকে বেতন, পেনশন এবং সুদ পরিশোধের মতো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ব্যয় ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষেই রাজ্যের রাজস্ব প্রাপ্তির ৫৬% গ্রাস করছিল। তার সঙ্গে যদি অন্নপূর্ণা যোজনার সম্ভাব্য ব্যয় যুক্ত হয়, তা হলে রাজস্বের বিপুল অংশ পূর্বনির্ধারিত খাতে আবদ্ধ হয়ে যাবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, সেচ, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং পরিকাঠামো বিনিয়োগের জন্য উপলব্ধ আর্থিক পরিসর সঙ্কুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

এই জায়গায় এসে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আসে। এক সরকার ১৫০০ টাকা দেয়, পরবর্তী সরকার ৩০০০ টাকা দেয়। তার পর কী? সামাজিক সুরক্ষা কি ক্রমাগত নগদ প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে? না কি, তার কোনও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য থাকবে? বিশ্ব জুড়ে কল্যাণনীতির অভিজ্ঞতা বলছে, নগদ সহায়তা কার্যকর হতে পারে। কিন্তু তার নকশা গুরুত্বপূর্ণ। মেক্সিকোর ‘প্রোগ্রেসা’ বা ব্রাজ়িলের ‘বোলসা ফামিলিয়া’ স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সঙ্গে সংযুক্ত শর্তযুক্ত সহায়তার মাধ্যমে প্রজন্মান্তরের পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছে। আবার আর্জেন্টিনা বা শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, রাজস্ব সক্ষমতার সীমা উপেক্ষা করে জনতুষ্টিমূলক ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক হতে পারে।

সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে সাধারণত একটি কৃত্রিম বিতর্ক তৈরি করা হয়— সর্বজনীন না লক্ষ্যভিত্তিক? বাস্তবে এই দুইয়ের কোনওটিই একক সমাধান নয়। সম্পূর্ণ লক্ষ্যভিত্তিক প্রকল্পে বহু যোগ্য মানুষ বাদ পড়ে যান, প্রশাসনিক ব্যয় বেড়ে যায় এবং আবেদনকারীদের উপরে এক ধরনের সামাজিক কলঙ্কও চাপতে পারে। আবার সীমাহীন সর্বজনীন নগদ হস্তান্তর রাজকোষের উপরে অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এর বিকল্প হিসাবে বহু অর্থনীতিবিদ বহু দিন ধরেই একটি স্তরভিত্তিক কল্যাণ কাঠামোর কথা বলে আসছেন। যাঁরা কোনও ভাবেই কাজ করতে সক্ষম নন— বয়স্ক, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থ, প্রতিবন্ধী অথবা পূর্ণকালীন পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি— তাঁদের জন্য নিঃশর্ত সহায়তা। যাঁরা কাজ করছেন কিন্তু আয় পর্যাপ্ত নয়, তাঁদের জন্য আয়-পরিপূরক সহায়তা। আর যাঁরা সাময়িক ভাবে কর্মহীন, তাঁদের জন্য সীমিত সময়ের কর্মসংস্থান-সংযুক্ত সহায়তা। এই কাঠামোয় সামাজিক সুরক্ষা এবং কাজের প্রণোদনা পরস্পরের বিরোধী হয়ে দাঁড়ায় না। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি অন্যত্র। রাষ্ট্র কি শুধু টাকা বিতরণ করবে, না কি এমন অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করবে যেখানে মানুষের সেই টাকার উপরে নির্ভরতা ক্রমশ কমে আসে? প্রকৃত কল্যাণনীতির পরীক্ষা সেখানেই।

পশ্চিমবঙ্গে গৃহস্থালির কাজে নিযুক্ত মহিলাদের কথাই ধরা যাক। লক্ষ লক্ষ মহিলা এই ক্ষেত্রে কাজ করেন। অথচ তাঁদের অধিকাংশের কোনও আনুষ্ঠানিক পরিচয় নেই, নির্ধারিত মজুরি নেই, সামাজিক সুরক্ষা নেই। যদি সরকার এই পেশাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়, নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করে, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করে এবং সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনে, তা হলে তাঁদের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়বে এবং রাষ্ট্রীয় নগদ সহায়তার উপরে নির্ভরতাও কমবে। একই কথা প্রযোজ্য অসংগঠিত ক্ষেত্রের বহু শ্রমিকের ক্ষেত্রেই। নগদ হস্তান্তর তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু স্থায়ী পরিবর্তন আসে শ্রমবাজারের সংস্কার, দক্ষতা বৃদ্ধি, শিক্ষায় বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে।

অন্নপূর্ণা যোজনার তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়ার একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। কোনও বড় আয়-সহায়তা প্রকল্প চালুর আগে উপভোক্তাদের সম্পর্কে বিস্তৃত তথ্য সংগ্রহ ভবিষ্যৎ মূল্যায়নের জন্য সহায়ক হতে পারে। কিন্তু সেই মূল্যায়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অনুপস্থিত— আবেদনকারী পরিবার আগে লক্ষ্মীর ভান্ডারের সুবিধাভোগী ছিল কি না। যে-হেতু অন্নপূর্ণা যোজনা সরাসরি পূর্ববর্তী প্রকল্পের জায়গায় এসেছে, এই তথ্য থাকলে দু’টি প্রকল্পের তুলনামূলক প্রভাব— আয়, ব্যয় আচরণ এবং পারিবারিক উন্নতি— নির্ণয় করা অনেক সহজ হত। প্রকল্পের মূল্যায়নযোগ্যতা বাড়ানোর এই সুযোগটি হাতের কাছে ছিল, কিন্তু কাজে লাগানো হয়নি।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি টাকার অঙ্কের নয়। প্রশ্ন হল, কল্যাণনীতি কোন দিকে এগোবে। এমন দিকে যেখানে নাগরিক ক্রমশ নগদ সহায়তার উপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন? না কি এমন দিকে যেখানে সামাজিক সুরক্ষা থাকবে, কিন্তু তার পাশে মানুষের আয়, দক্ষতা, স্বনির্ভরতার ভিত্তিও শক্তিশালী হবে? প্রতিযোগিতামূলক দান-রাজনীতি ভোট জিততে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু মানুষের জীবন বদলায় শিক্ষা, কাজ, দক্ষতা ও মর্যাদাপূর্ণ আয়ের সুযোগ। এটা ভুলে গেলে যে-কোনও কল্যাণনীতি শেষ পর্যন্ত নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যেই আটকে পড়বে।

অর্থনীতি বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারউইক

আরও পড়ুন