উন্নয়ন: দমদম জংশন স্টেশনে হকার উচ্ছেদ অভিযানের পর পড়ে রয়েছে ধ্বংসাবশেষ। ৩১ মে। ছবি: বিশ্বনাথ বণিক।
নির্বাচনের ফলাফল অনেক সময় শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় না; অর্থনৈতিক পরিবর্তনেরও পূর্বাভাস বহন করে। ভোটের আগে দলগুলি দুর্নীতি, শাসনব্যবস্থা, পরিচয়-রাজনীতি কিংবা উন্নয়ন ইত্যাদি নিয়ে বিবিধ প্রতিশ্রুতি দেয়— বহু ভোটার সেই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে ভোট দেন। কিন্তু সেই ভোটের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অভিঘাত নিয়ে ভাবার সুযোগ বা আগ্রহ সব সময় তৈরি হয় না। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের আলোচনায়ও এই প্রশ্নটি তুলনামূলক ভাবে অনুপস্থিত। মানুষ রাজনৈতিক সমীকরণ বোঝে, শাসকবিরোধী মনোভাবও বোঝে, কিন্তু যে অর্থনৈতিক কাঠামোর উপরে তাদের দৈনন্দিন জীবন দাঁড়িয়ে আছে, সে কাঠামো বদলে গেলে কী হতে পারে— সেটা বোঝে কি?
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আঞ্চলিক দলগুলির প্রতি এক ধরনের ক্লান্তি ও অনাস্থা দেশের বহু প্রান্তেই দৃশ্যমান। পশ্চিমবঙ্গও তার ব্যতিক্রম নয়। স্থানীয় স্তরের দুর্নীতি, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমেছে দীর্ঘ দিন। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে রাজনৈতিক সংগঠনের প্রচেষ্টাও বহু মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। কিন্তু এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মূল্য কী, সে কথা ভেবে দেখা প্রয়োজন।
বাংলার অর্থনীতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল— এখানে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক ক্ষমতার মানুষ একই পরিসরে সহাবস্থান করেন। অর্থনৈতিক বৃদ্ধি হয়তো খুব দ্রুত নয়, কিন্তু বৈষম্যও দেশের বহু রাজ্যের তুলনায় কম। এই পরিস্থিতি নিছক দুর্ঘটনা নয়। এর পিছনে রয়েছে দীর্ঘ দিনের একটি অর্থনৈতিক বাস্তব, যার কেন্দ্রে রয়েছে অসংগঠিত ক্ষেত্র। এই ক্ষেত্রের মধ্যে যেমন সরকারি নথিভুক্ত ক্ষুদ্র উৎপাদক বা ব্যবসায়ী আছেন, তেমনই আছেন হকার, ছোট পরিষেবা-প্রদানকারী, পারিবারিক উদ্যোগ এবং এমন বহু মানুষ, যাঁদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে পশ্চিমি তত্ত্বের চোখে ‘অস্বাভাবিক’ মনে হতে পারে। কিন্তু ভারতীয় বাস্তবে তাঁরা অর্থনীতির প্রান্তিক চরিত্র নন; বরং কেন্দ্রীয় চরিত্র।
রাস্তার হকারের লাইসেন্স থাকতে পারে। ছোট দোকানদারের ট্রেড লাইসেন্স থাকতে পারে। তাঁরা অনেক সময় সরকারি বা আধা-সরকারি নিয়মের মধ্যে থেকেই কাজ করেন। আবার এমনও সত্য যে, সরকারি সম্পত্তি বা জনপরিসরের ব্যবহার নিয়ে বহু আইনি প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু এই দ্বন্দ্ব নতুন নয়। উন্নয়নশীল অর্থনীতির ইতিহাসে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং জীবিকার প্রয়োজনের সংঘাত বার বার ফিরে এসেছে। এখন যে উচ্ছেদপর্ব চলছে, তা-ও এই সংঘাতেরই প্রতিফলন।
সমস্যা হল, অসংগঠিত ক্ষেত্রকে অনেক সময় এমন ভাবে দেখা হয়, যেন এটি অর্থনীতির একটি অস্থায়ী ত্রুটি, যা উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে নিজে থেকেই অদৃশ্য হয়ে যাবে। বাস্তব অভিজ্ঞতা কিন্তু অন্য কথা বলে। গত পনেরো বছরে অসংগঠিত ক্ষেত্র সঙ্কুচিত করার জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নানা পদক্ষেপ করা হয়েছে। নোট বাতিল তার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ। কিন্তু তার পরেও অসংগঠিত ক্ষেত্র অদৃশ্য হয়নি। বরং বহু ক্ষেত্রে তার পরিধি বেড়েছে।
এর কারণ বোঝা কঠিন নয়। রাস্তার দোকানদার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা ছোট উৎপাদকের স্থায়ী বিনিয়োগ, প্রশাসনিক খরচ এবং নিয়ন্ত্রক ব্যয় বড় ব্যবসার তুলনায় অনেক কম। ফলে তাঁরা তুলনামূলক কম দামে পণ্য বা পরিষেবা দিতে পারেন। গরিব এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে সেটাই বড় আকর্ষণ। জীবনের প্রায় সব প্রয়োজনীয় জিনিস যদি বড় দোকানের তুলনায় কম দামে পাওয়া যায়, তা হলে ক্রেতা সেই বাজারেই যাবেন। বাংলার গরিব মানুষ যেমন এই ব্যবস্থার উপরে নির্ভরশীল, তেমনই বিহার, ওড়িশা, উত্তরপ্রদেশ কিংবা রাজস্থান থেকে আসা বহু পরিযায়ী শ্রমিকও এই অর্থনীতির অংশ। এই সহাবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হল অসংগঠিত ক্ষেত্রের বিস্তার। বড় ব্যবসা এঁদের পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারে না। কিন্তু প্রতিযোগিতা যে রয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই।
বড় মূলধন-নির্ভর ব্যবসায়িক গোষ্ঠী যদি কোনও রাজনৈতিক শক্তির গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক হয়, তা হলে তাদের স্বার্থ থেকে অসংগঠিত ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ বা সঙ্কুচিত করার দাবি উঠতেই পারে। কারণ, অসংগঠিত ক্ষেত্রের বিস্তার বড় ব্যবসার বাজার সম্প্রসারণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নোট বাতিলের সময় এই সংঘাতের একটি ঝলক দেখা গিয়েছিল। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো বাংলাতেও অসংগঠিত ক্ষেত্র সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছিল।
তবে অসংগঠিত অর্থনীতির টিকে থাকার পিছনে শুধু বাজারের যুক্তি কাজ করেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক সুরক্ষা এবং অসংগঠিত ক্ষমতার কাঠামো। বহু ক্ষেত্রে স্থানীয় ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী, রাজনৈতিক কর্মী বা দুষ্কৃতী গোষ্ঠীর কাছে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য অর্থ দিতে হয়েছে। এটা নৈতিক ভাবে সমর্থনযোগ্য নয়, কিন্তু জীবিকার বিকল্প না থাকলে মানুষ প্রায়শই এই ব্যবস্থাকেই গ্রহণ করে। ব্যবসা বন্ধ করার থেকে তোলা দিয়ে ব্যবসা চালানো তার কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য।
পশ্চিমবঙ্গে এই ব্যবস্থার একটি বিশেষ রূপও গড়ে উঠেছিল। এক দিকে অসংগঠিত ক্ষেত্র থেকে বিভিন্ন উপায়ে অর্থ বেরিয়ে যেত, অন্য দিকে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের মাধ্যমে তার একটি অংশ আবার ফিরে আসত। লক্ষ্মীর ভান্ডার, কন্যাশ্রী বা অন্যান্য সহায়তা প্রকল্পের প্রধান সুবিধাভোগীদের বড় অংশই অসংগঠিত ক্ষেত্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে যুক্ত। ফলে এক ধরনের চক্রাকার অর্থনীতি তৈরি হয়েছিল। এই ব্যবস্থার নানা ত্রুটি ছিল, কিন্তু তার একটি সামাজিক ভিত্তিও ছিল।
সেই কারণেই এই কাঠামো ভাঙতে গেলে শুধু পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। তার চেয়ে বেশি প্রাপ্তির বিশ্বাসযোগ্য সম্ভাবনা দেখাতে হয়। ভোটের ফলাফল বলছে, সেই প্রতিশ্রুতি অনেক মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। কিন্তু জীবিকা এবং বাসস্থানের নিরাপত্তা যে প্রথমেই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা হয়নি।
আরও একটি সমস্যা রয়েছে। অন্য রাজ্যের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে এ রাজ্যের বেশির ভাগ মানুষ ওয়াকিবহাল নন। ফলে রাজনৈতিক প্রত্যাশা এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়। শিল্পবান্ধব সরকার এলেই শিল্প আসবে— এ কথা যদি সত্যও হয়, তবু শিল্প এলেও সেখানে চাকরি কারা পাবে, সে প্রশ্ন আলাদা। আজকের শ্রমবাজার আর সেই পুরনো শ্রমবাজার নয়, যেখানে স্থানীয় মানুষ স্বয়ংক্রিয় ভাবে স্থানীয় চাকরির প্রধান দাবিদার হতেন। যাঁদের দক্ষতা বেশি, তথ্য বেশি, চলাচলের ক্ষমতা বেশি, তাঁরা দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে কাজের সন্ধানে চলে যেতে পারেন। ফলে নতুন বিনিয়োগ মানেই স্থানীয় কর্মসংস্থান— বাস্তবে সব সময় এমনটা ঘটে না।
অন্য দিকে, রাজ্যের অভ্যন্তরেও এমন বহু অর্থনৈতিক ক্ষেত্র রয়েছে, যেগুলির দিকে নজর পড়া প্রয়োজন। ট্রেড লাইসেন্সধারী বহু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রে কর-ব্যবস্থা, বিলিং পদ্ধতি এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর নানা অসঙ্গতি রয়েছে। বড় ব্যবসা যেখানে সমস্ত নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য, সেখানে অনেক ছোট ব্যবসা কার্যত অন্য এক ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করে। এর ফলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়, কিন্তু সেই ব্যবসাগুলি কম দামে পণ্য বিক্রি করতে পারে। ক্রেতারাও সেই সুবিধা পান। এই অবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা সম্ভব কি না, সে প্রশ্ন অবশ্যই আছে। কিন্তু যদি লক্ষ্য হয় অসংগঠিত ক্ষেত্র থেকে সংগঠিত ক্ষেত্রে মানুষকে স্থানান্তর করা, তা হলে প্রথম কাজ হবে আইনকে সবার জন্য সমান ভাবে প্রয়োগ করা। শুধু ছোট ব্যবসায়ীর উপরে নয়, বড় ব্যবসার উপরেও। সুশাসন নিশ্চিত করতে চাইলে শুধু গরিবের অনিয়ম নয়, প্রভাবশালীর অনিয়মও সমান গুরুত্বে দেখতে হবে।
মানুষ পরিবর্তনের মূল্য ও লাভের হিসাব নিজের অভিজ্ঞতা দিয়েই করে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের উচ্ছ্বাসের বাইরে দাঁড়িয়ে তাই প্রশ্নটি থেকেই যায়— যে অর্থনৈতিক কাঠামোকে ভেঙে নতুন কাঠামো গড়ার কথা বলা হচ্ছে, তার মূল্য কে দেবে, আর তার লাভই বা শেষ পর্যন্ত কার ঘরে পৌঁছবে?
অর্থনীতি বিভাগ, সেন্টার ফর স্টাডিজ় ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস, কলকাতা