West Bengal Government

সম্পাদক সমীপেষু: প্রতিশ্রুতি পূরণ

সাধারণ মানুষের আশা, যে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে, সরকার পরিচালনাতেও যেন তেমনই স্বচ্ছতা ও ন্যায় বজায় থাকে।

শেষ আপডেট: ২৭ জুন ২০২৬ ০৭:১৬

তূর্য বাইনের প্রবন্ধ ‘সুশাসন ও সংবেদনশীলতা’ (২-৬) সম্বন্ধে দু’-চার কথা। অনস্বীকার্য যে, অপরিসীম দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত তৃণমূল সরকারকে নির্বাচনে পরাস্ত করে যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এল, তার কাছে পশ্চিমবঙ্গের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা অপরিসীম। সাধারণ মানুষের আশা, যে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে, সরকার পরিচালনাতেও যেন তেমনই স্বচ্ছতা ও ন্যায় বজায় থাকে। লক্ষণীয়, ভারতের অন্য যে সব রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আছে, যেমন মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা ইত্যাদি, সেখানে কিন্তু মাঝে মাঝেই অভাবনীয় দুর্নীতির খবর প্রকাশ পায়। তাই সাধু সাবধান।

ঠিক যে, জনকল্যাণমূলক প্রকল্প সব সময়ই সর্বসাধারণের জন্য না হয়ে প্রয়োজনভিত্তিক হওয়াই বাঞ্ছনীয়। তবে এ ক্ষেত্রে ধর্ম, বর্ণ, জাতপাতভিত্তিক না হয়ে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচিত হওয়া উচিত। সমাজের যে শ্রেণির মহিলারা আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী, তাঁদের সরকারি অনুদান প্রকল্পে যুক্ত করা যেমন যুক্তিসঙ্গত নয়, তেমনই জনজাতি সম্প্রদায়ের প্রান্তিক মহিলাদের বঞ্চিত করাও হবে মানবতার পরিপন্থী। তবে এটাও ঠিক, জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে শর্ত আরোপের বিষয়ে বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে জনগণকে অবহিত করলে সেটা অধিক ন্যায়সঙ্গত হত। তা হলে অনেকেরই এখন আশাভঙ্গ হত না।

প্রকৃতপক্ষে বিরোধী দলে থেকে যেটা বলা সহজ, সরকারে এসে সেটা করে দেখানো সব ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। ভোটে জেতার জন্য অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে যদি ঢালাও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তা হলে সরকারে এসে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা ভয়ানক কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তবে নিঃসন্দেহে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার প্রতিশ্রুতি পূরণের পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিয়েছে। সাম্প্রতিক বাজেটেও তেমনটাই দেখা গিয়েছে।

আরও একটা কথা মনে রাখা আবশ্যক। প্রশাসনকে চলতে হয় আইন মেনে। প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে আইনের পথে না চললে ভবিষ্যতে তা বুমেরাং হয়ে ফিরে আসতে বাধ্য। যেমন— বেআইনি নির্মাণ নিশ্চয়ই ভাঙতে হবে কিন্তু সেটা করতে হবে সঠিক নোটিস এবং উপযুক্ত সময় দিয়ে। কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলকে লক্ষ্য করে নয়, অবৈধ নির্মাণ ভাঙতে হবে সব জায়গায়। প্রযুক্তিবিদ হওয়ার দরকার নেই, খালি চোখে দেখলেই বোঝা যায় কলকাতার বড়বাজার অঞ্চলে কত অবৈধ নির্মাণ আছে। কিন্তু সেখানে ধনী ব্যক্তিদের বাস বলে সেখানে হাত দেওয়া যাবে না— এমনটা হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। বরং, দরিদ্র মানুষ ক্ষমতাশালী প্রশাসনের কাছে ন্যায়ের পাশাপাশি একটু মানবিকতাও আশা করে।

সুরজিৎ কুন্ডু, উত্তরপাড়া, হুগলি

পালাবদল

তূর্য বাইনের লেখা ‘সুশাসন ও সংবেদনশীলতা’ প্রবন্ধ প্রসঙ্গে আমার কিছু কথা। দীর্ঘ পনেরো বছর তৃণমূল সরকারের অপশাসনে মানুষ যখন কোণঠাসা, মুক্তির স্বাদ পেতে যখন তাঁরা মরিয়া, তখন পালাবদলের সরকার এল বিজেপির হাত ধরে এই বাংলায়। তাই এই সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশার পারদও ঊর্ধ্বমুখী। ইতিমধ্যেই এই সরকার জনকল্যাণমুখী ও স্বচ্ছ প্রশাসন কায়েম করতে যে সব পদক্ষেপ করেছে, তা বাস্তবসম্মত। ধর্মের ভিত্তিতে বিভিন্ন ধর্মীয় সহায়তা ভাতা দেওয়া বন্ধ করা অবশ্যই প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। এতে রাজ্যের কোষাগারের উপর অহেতুক চাপ সামান্য হলেও কমবে। নতুন সরকার প্রতিশ্রুতিমতো লক্ষ্মীর ভান্ডারের পরিবর্তে অন্নপূর্ণা যোজনা চালু করেছে, যার অর্থের পরিমাণ লক্ষ্মীর ভান্ডারের দ্বিগুণ। তবে এই অন্নপূর্ণা যোজনা বেশ কিছু শর্তসাপেক্ষ হওয়ার কারণে এর তালিকা থেকে অনেকেই বাদ পড়তে পারেন।

মেয়েদের বিনামূল্যে সরকারি বাসে ভ্রমণ চালু করার ঘোষণাটি শুনতে ভাল লাগলেও ধুঁকতে থাকা রাজ্য পরিবহণ সংস্থার মাথায় এ ভাবে চাপ সৃষ্টি করা উচিত কি না, তর্কযোগ্য। রাজ্যের ভেঙে পড়া সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা কোথায় তলিয়ে যাচ্ছে। বাজেটে সে বিষয়ে বরাদ্দ বৃদ্ধি নজর কেড়েছে। তবে শুধুমাত্র বরাদ্দ বৃদ্ধি নয়, নতুন সরকারকে বেহাল শিক্ষাকে খাদের ধার থেকে উদ্ধারের সমস্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে হবে। স্কুলছুট ছেলেমেয়েদের ফেরানোর ব্যবস্থা করা হোক আবার। বুলডোজ়ার চালিয়ে রেলের প্ল্যাটফর্ম হকারমুক্ত করার চেষ্টা আমাদের একাংশের কাছে দৃষ্টিনন্দন মনে হলেও, যাঁদের এখান থেকে উৎখাত করা হল তাঁদের নিয়ে আগামী দিনে সরকারের ভাবনা কী? তাঁরাও তো এই রাজ্যেরই মানুষ।

দিলীপকুমার সেনগুপ্ত, বিরাটি, উত্তর ২৪ পরগনা

ভারসাম্য চাই

তূর্য বাইনের ‘সুশাসন ও সংবেদনশীলতা’ প্রবন্ধটি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১ সালের ভোটের আগে মহিলাদের ভোট পেতে তৃণমূল সরকার লক্ষ্মীর ভান্ডার শুরু করেছিল। প্রকল্পটি যেমন প্রশংসার দাবি রাখে, তেমনই কিছু ক্ষেত্রে সমালোচনারও। গরিবদের হাতে টাকা তুলে দেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু আর্থিক ভাবে সচ্ছল, স্বাবলম্বী মেয়েদের সেই তালিকায় রাখার প্রয়োজন ছিল কি? এখন দেখা যাচ্ছে, তার মধ্যেও নাকি বহু ভেজাল। অন্নপূর্ণা যোজনার ক্ষেত্রে তাই শর্তাবলি জুড়েছে। শর্ত রাখাই উচিত। তবে তার জন্য বারো পাতার ফর্ম ফিলআপও স্বাভাবিক নয়। সরলীকরণ প্রয়োজন। নতুন মুখ্যমন্ত্রী দলের সঙ্কল্পপত্র অনুযায়ী অনেক কাজেই হাত দিয়েছেন। মুয়াজ্জিন ভাতা, পুরোহিত ভাতা বিলোপ করেছেন, এটা ভাল পদক্ষেপ। পুজোর অনুদানেও রাশ টানা উচিত। কিন্তু সবার আগে তাঁদের লক্ষ্য রাখতে হবে আগের মতো দুর্নীতির ঘুঘুর বাসা যেন তৈরি না হয়। আর তাড়াহুড়ো করে গরিব হকারদের উচ্ছেদ, বুলডোজ়ার না চালানোই ভাল। সুশাসনের সঙ্গে সংবেদনশীলতাও তো দরকার।

অরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা-৮৪

বিশ্বাসের মূল্য

‘সুশাসন ও সংবেদনশীলতা’ প্রবন্ধ প্রসঙ্গে বলি, কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের রাজত্বকালে নোটবন্দি থেকে শুরু করে করোনাকালে মানুষের ভোগান্তির কথা ভুক্তভোগীরা নিশ্চয়ই ভুলে যাননি। বিভিন্ন সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষায় একাধিক বার প্রশ্ন ফাঁস-সহ বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তি বা সাম্প্রতিক সিবিএসই-র মূল্যায়নে গলদ এবং পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাস বিকৃতির নানা অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে আছে। দেশে ধর্মনিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে বিজেপির অবস্থান ও সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণ দেশে, এমনকি বিদেশেও আজ প্রশ্নের মুখে। অবশ্য পরিকাঠামো ক্ষেত্রে উন্নতি চোখে পড়ার মতো, স্বীকার করতেই হবে।

তৃণমূলের আমলে রাজ্যে আইনের শাসন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, প্রতি পদে বিঘ্নিত হয়েছে মানুষের স্বাধিকার এবং কেন্দ্রের সঙ্গে বিবাদে মানুষ বঞ্চিত হয়েছেন বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা থেকে। বর্তমানে বিজেপি সরকারের অন্নপূর্ণা যোজনায় অনুদানের পরিমাণ দ্বিগুণ করা হলেও প্রাপকদের শুধুমাত্র আর্থিক মাপকাঠির মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে আবেদনকারিণীর পারিবারিক সমস্ত নথি চাওয়া মোটেও অভিপ্রেত নয়। আবার মহিলাদের সরকারি বাসে নিখরচায় ভ্রমণের ক্ষেত্রে কোনও বিধিনিষেধের বেড়াজাল না থাকায় রাজ্যের কোষাগার এবং বেসরকারি বাসের ব্যবসা— দুই-ই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা। বিবেচনাধীনদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে দ্রুত উদ্যোগী হওয়া উচিত রাজ্য সরকারের। হকার ও বিভিন্ন বেআইনি নির্মাণ বা বসতির ক্ষেত্রে কোনও বিকল্প ব্যবস্থা না করেই বুলডোজ়ার রাজ সরকারের সহমর্মিতার পরিচায়ক নয়। গুরুত্ব দিতে হবে সাধারণ মানুষের মতামতকে, যা তৃণমূল জমানায় অন্তর্হিত হওয়ার কারণে মানুষের ক্ষোভও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছিল।

অশোক দাশ, রিষড়া, হুগলি

আরও পড়ুন