স্বর্ণদীপ হোমরায়ের ‘পশ্চিমবঙ্গের যা চাই’ (১৯-৫) শীর্ষক প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু সংযোজন। শিল্প মানেই কৃষকেরও উন্নতি। জমি অধিগ্রহণ নিয়ে ভয় কাটানো প্রয়োজন। মানুষকে বোঝাতে হবে, শিল্পায়ন কৃষির শত্রু নয়। বৃহৎ কারখানা গড়ে উঠলে রাজ্যের মাথাপিছু আয় বাড়ে, পরিকাঠামোর উন্নতি হয় এবং স্থানীয় বাজারে কৃষিপণ্যের চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। সিঙ্গুরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। কৃষককে শুধু ক্ষতিপূরণের গ্রহীতা হিসেবে নয়, উন্নয়নের অংশীদার হিসাবে ভাবতে হবে। তাঁর পরিবারের জন্য স্বাস্থ্যবিমা, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা থাকলে জমি বিরোধিতাও অনেক কমে আসতে পারে।
বৃহৎ শিল্প না এলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের টিকে থাকা কঠিন। জামশেদপুর তার প্রমাণ। টাটা স্টিলকে কেন্দ্র করে বিস্তীর্ণ এলাকায় অসংখ্য সহযোগী শিল্প গড়ে উঠেছে এবং লক্ষ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস বা দুর্গাপুর স্টিলকে কেন্দ্র করে সেই শিল্প-পরিবেশ পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বৃহৎ শিল্প এলে তার সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবেই বহু সরবরাহকারী সংস্থা, পরিবহণ ও জোগান-ব্যবস্থা এবং ক্ষুদ্র শিল্পের প্রসার ঘটে।
বিনিয়োগকারীদের বক্তব্য ও উদ্বেগ শোনা প্রয়োজন। ডাবল এঞ্জিন সরকারের সুবিধা কাজে লাগিয়ে রাজ্য ও কেন্দ্রের নীতিনির্ধারকদের বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনায় বসা উচিত। এই রাজ্যে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁদের কী ধরনের উদ্বেগ, পরিকাঠামোগত চাহিদা বা প্রশাসনিক নিশ্চয়তা প্রয়োজন, তা উপলব্ধি করে আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ করা জরুরি। বৃহৎ আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডই আস্থা সৃষ্টির অন্যতম চাবিকাঠি। গুগল, মাইক্রোসফট বা অ্যামাজ়ন-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের তথ্যভান্ডার কেন্দ্র বা গবেষণা কেন্দ্র কলকাতায় এলে তার গুরুত্ব শুধু বিদেশি বিনিয়োগে সীমাবদ্ধ থাকবে না, ভারতের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলিও তখন পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগ করতে আরও উৎসাহিত হবে। এক সময় জাহাজশিল্প থেকে প্রকৌশল শিল্প— সবই ছিল এখানে। তা হলে আজ কেন হবে না?
এই অবক্ষয়ের কারণ শুধু শ্রমিক আন্দোলন নয়। দূরদর্শিতাসম্পন্ন নেতৃত্বের অভাব, সময়োপযোগী নীতির ঘাটতি এবং পরিবর্তিত প্রযুক্তি ও বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিল্পকে আধুনিকীকরণে ব্যর্থতাও এই পতনের অন্যতম কারণ। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বহু মেধাবী ছাত্রছাত্রী আজ এই রাজ্য ছেড়ে বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ কিংবা বিদেশে চলে যাচ্ছেন। তাঁদের ফেরার মতো পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
বন্দর, উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার হিসেবে ভৌগোলিক সুবিধা এবং দক্ষ মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে পশ্চিমবঙ্গ আবারও নতুন সম্ভাবনার পথে এগোতে পারে। ছয় দশকের ক্ষয় পাঁচ বছরে পূরণ করা কঠিন, কিন্তু শুরুটা আজই হওয়া প্রয়োজন। কারণ শিল্প ফিরলে শুধু কারখানার চিমনিতে ধোঁয়া উঠবে না; তার সুফল পৌঁছবে কৃষকের ঘরে, তাঁতির তাঁতে এবং শিল্পীর ক্যানভাসেও। পতনের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েই কিন্তু উন্নতির নবজাগরণ সম্ভব হতে পারে।
অলোককুমার মুখোপাধ্যায়, সোদপুর, উত্তর ২৪ পরগনা
আশা আছে
স্বর্ণদ্বীপ হোমরায়ের ‘পশ্চিমবঙ্গের যা চাই’ শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। একদা ‘হুগলি নদীর উভয় তীরে শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠার কারণগুলি আলোচনা করো’ শীর্ষক প্রশ্নের উত্তর লিখতাম। পরে দেখলাম সেই সব শিল্পকারখানার কঙ্কালসার অবস্থা। অধিকাংশই ছিল পাটশিল্প, তবু পাটের পরিবেশবান্ধব বৈশিষ্ট্যকে উপেক্ষা করে ‘বাজার নেই’, ‘উৎপাদন ব্যয় বেশি’, ‘শ্রমিক সমস্যা’— এই সব অজুহাতে একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাকা থামল।
বন্ধ হয়ে গেল মোটরগাড়ি নির্মাণ কারখানা, টায়ার তৈরির বিশ্বখ্যাত সংস্থা এবং আরও বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এদের অধিকাংশই ছিল হুগলি নদীর দুই তীর জুড়ে। আজও কোথাও কোথাও সেই পরিত্যক্ত কারখানার ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়ে, যদিও অনেক জায়গাতেই দোকান, শপিং মল ও বহুতল আবাসন। নির্মাণশিল্পের এই চটকদার বিকাশ একটি গোটা প্রজন্মকে চাকরির আলোর দিশা দেখাতে পারেনি। তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে শিল্প-মানচিত্র তৈরির প্রতিশ্রুতি শোনা গেলেও পেরিয়ে গেল দেড় দশক। শুরু হল ভাতা-র রাজনীতি। পুজো অনুদান থেকে শুরু করে যাচাই-বাছাই ছাড়াই শিল্পী-ভাতা বিতরণ চলল। যাঁরা প্রকৃত শিল্পী নন, তাঁরাও অনুদান পেলেন। এ দিকে গঙ্গা অববাহিকা জুড়ে গড়ে উঠল অসংখ্য ইটভাটা, যেগুলিকে ঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠল ‘মাটি মাফিয়া’। বহু বছরের জমাট রাগ, ক্ষোভ ও হতাশার বহিঃপ্রকাশই সম্ভবত ঘটেছে এ বারের নির্বাচনে।
সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। প্রয়োজন শুধু সততা, নিষ্ঠা এবং লোকদেখানো কর্মসূচির পরিবর্তে সুপরিকল্পিত উদ্যোগ। শিক্ষাব্যবস্থার অপ্রয়োজনীয় চাপ কমিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে আরও সমন্বয় আনা দরকার। গ্রামীণ সম্ভাবনাময় কুটিরশিল্পের উন্নয়নে জোর দিতে হবে। সহজ শর্তে শিল্পোদ্যোগীদের শিল্প স্থাপনে উৎসাহিত করতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে হবে। এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে প্রত্যেক রাজ্যবাসী নিজেকে উন্নয়নের অংশীদার বলে মনে করতে পারেন।
রাজা বাগচী, গুপ্তিপাড়া, হুগলি
নারীশক্তি
অত্যন্ত সময়োচিত আলোচনা ‘পশ্চিমবঙ্গের যা চাই’। সমাজে নারীদের একটি বৃহৎ অংশ এখনও আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করেন। তবে ভাতা-প্রাপ্তা সব নারীকে একই দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়। অনেকেই শুধু গ্রহণের একমুখী নীতিতে বিশ্বাসী নন। কেবল সুবিধা গ্রহণ করে, বিনিময়ে সমাজ ও অর্থনীতিতে কোনও অবদান না রেখে চলতে তাঁরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।
গৃহস্থালির কাজের ফাঁকে প্রতি দিন তিন-চার ঘণ্টা সময় সাশ্রয় করে আয়বর্ধক ও গঠনমূলক কাজে যুক্ত হতে বহু নারীই আগ্রহী। এই বিপুল মানবসম্পদকে উৎপাদন ও পরিষেবা খাতের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। ক্ষুদ্র উদ্যোগ, কুটিরশিল্প, সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন, ডিজিটাল পরিষেবা, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কিংবা স্থানীয় প্রয়োজনভিত্তিক নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁদের অংশগ্রহণের উপযুক্ত পরিকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে সরকারের গুরুত্ব সহকারে ভাবা উচিত।
বিশ্বনাথ পাকড়াশি, শ্রীরামপুর, হুগলি
তরুণের স্বপ্ন
ভারতীয় জনতা পার্টি রাজ্যে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে। এই ফলাফলকে কোনও একক কারণে ব্যাখ্যা করা কঠিন। তবে নির্বাচনী ফলাফলের পিছনে কেন্দ্রীয় সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মসূচির প্রভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। জাতীয় সড়ক নির্মাণ, রেলপথ সম্প্রসারণ, ডিজিটাল পরিষেবার বিস্তার, আবাসন, স্বাস্থ্যবিমা এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পকে নির্বাচনী প্রচারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন বিরোধী শিবিরের দাবি ছিল, এই সব প্রকল্পের অনেকগুলিই রাজ্যে প্রত্যাশিত মাত্রায় বাস্তবায়িত হয়নি।
বহু ভোটারের কাছে এই বার্তা পৌঁছেছিল যে, কেন্দ্র ও রাজ্যে একই রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় থাকলে উন্নয়নমূলক কাজের গতি বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশেষত তরুণ ভোটার, শহরের বাসিন্দা এবং পরিবর্তনকামী মধ্যবিত্তের একাংশ এই যুক্তিকে গুরুত্ব দিয়েছেন বলে মনে হয়।
পার্থপ্রতিম মিত্র, ছোটনীলপুর, বর্ধমান