জহর সরকারের ‘উদার সংস্কৃতি অটুট থাকুক’ (১১-৫) শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি কথা।
দীর্ঘ দিন ধরে শিল্পহীনতা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা বাংলার অগ্রগতিকে বাধা দিয়েছে। তাই নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা, একটি দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক পরিবেশ এবং এমন একটি শিল্পনীতি, যা শুধু বৃহৎ পুঁজিকেই নয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগকেও সমান গুরুত্ব দেবে। একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং নবীন উদ্যোগের ক্ষেত্রেও নতুন দিশা দেখাতে হবে।
বর্তমানের নব্য উদারবাদী অর্থনীতি যদিও ‘উন্নয়ন’ বলতে মূলত মোট দেশজ উৎপাদনের বৃদ্ধিকেই প্রাধান্য দেয়, কিন্তু ভারতের মতো দেশে শুধু সেই বৃদ্ধিই উন্নয়নের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। কারণ এই বিপুল জনসংখ্যার দেশে প্রধান সমস্যা দারিদ্র। তা দূর করতে হলে সর্বস্তরের মানুষের হাতে কাজ পৌঁছে দিতে হবে। জনবহুল এই দেশে প্রত্যেকের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত কঠিন। তাই নতুন সরকারকে মনে রাখতে হবে, বিপুল কর্মসংস্থান ছাড়া রাজনৈতিক পরিবর্তনের অর্থ কিন্তু অনেকটাই ফিকে হয়ে যাবে।
ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর একটি রাজনৈতিক দলের ভূমিকা বদলে যাওয়া উচিত। তখন শুধুমাত্র দলীয় স্বার্থ নয়, সমগ্র রাজ্যের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়। বিরোধীদের মর্যাদা দেওয়া এবং ভিন্নমতকে সম্মান করাই গণতন্ত্রের ভিত্তি। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে উন্নয়নের সব পরিকল্পনাই প্রশ্নের মুখে পড়বে। তবে উন্নয়নের এই আলোচনার পাশাপাশি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে— সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা। বহুত্ববাদী চরিত্রের এই রাজ্যে ধর্মীয় মেরুকরণ বাড়লে তা সামাজিক স্থিতিশীলতার পক্ষে ক্ষতিকর হবে। তাই উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক সংহতিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গের মানুষ অতীতে বহু বার পরিবর্তনের আশায় হতাশ হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হল, তারা নিজেদের প্রতিশ্রুতি কতটা রক্ষা করতে পারে। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, স্বচ্ছতা এবং সামাজিক ন্যায়— এই চারটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়েই তাদের রাজ্য পরিচালনা করতে হবে। একটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সুশাসন, ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ চায়। যে সরকার এই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, তাকেই মানুষ সরিয়ে দিয়েছে— পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস বার বার সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।
রবীন রায়শ্যামনগর, উত্তর ২৪ পরগনা
পরিবর্তনের পর
জহর সরকারের ‘উদার সংস্কৃতি অটুট থাকুক’ শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি কথা।
বিজেপি রাজ্যে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এই ফল তাদের কাছে কতটা প্রত্যাশিত ছিল কিংবা বিরোধীদের কাছে কতটা অপ্রত্যাশিত, সেই জটিল রাজনৈতিক অঙ্ক কষার দায়িত্ব থাকুক বিশ্লেষকদের উপর। সাধারণ মানুষ হিসাবে বরং এই বঙ্গের রাজনীতিকে আমরা কী ভাবে দেখছি এবং এই পটপরিবর্তন আমাদের কাছে কী ধরনের সম্ভাবনা ও প্রত্যাশা তৈরি করছে, সেই বিষয়েই এখন কিছু কথা বলা প্রয়োজন।
এ বারের নির্বাচনে ধর্মীয় মেরুকরণ যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বহু মানুষের নাম বাতিল হয়ে যাওয়ার অভিযোগ। বহু মানুষ কার্যত ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকেই বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে তাঁরা এই নির্বাচনে দর্শকের ভূমিকাতেই সীমাবদ্ধ থেকেছেন।
তবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের সামাজিক চরিত্র মূলত অসাম্প্রদায়িক। এখানে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ পরস্পরের উৎসবে দীর্ঘ দিন ধরেই অংশগ্রহণ করে আসছেন। হিন্দু মন্দির নির্মাণে মুসলমান শ্রমিক যেমন কখনও অস্পৃশ্য বলে বিবেচিত হননি, তেমনই মসজিদের বিদ্যুতের কাজের ক্ষেত্রেও কারও জাত বা ধর্মকে প্রাধান্য দেওয়া হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতেও সরস্বতী পুজোকে কখনও সাম্প্রদায়িকতার বেড়াজালে আবদ্ধ করা হয়নি।
তবুও এ বারের নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই সমাজে জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক বিভেদের প্রকাশ ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। আরও উদ্বেগের বিষয়, শুভবোধসম্পন্ন মানুষের অনেকেই সেই বিভাজন রুখতে সক্রিয় ভাবে এগিয়ে আসছেন না।
তবে নির্বাচনের আগে থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে পূর্বতন শাসকদের প্রতি ক্ষোভ তৈরি হচ্ছিল। বহু নেতা-নেত্রীর আকস্মিক বিত্তবৃদ্ধি ও ক্ষমতার আস্ফালন সাধারণ মানুষের বিরক্তির কারণ হয়ে উঠেছিল। বাজারে, রাস্তায়, সাধারণ মানুষের কথাবার্তাতেই সেই ক্ষোভের আভাস মিলছিল।
পশ্চিমবঙ্গের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে, যেখানে সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন সব ধর্মের মানুষ। বাঙালি এখনও সেই চিরায়ত ঐতিহ্য পুরোপুরি ভুলে যায়নি বলেই বিশ্বাস করা যায়। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, এখানকার সংস্কৃতি ও পরিবেশের মধ্যেই তাঁর বেড়ে ওঠা। তাই সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে তিনি নিরপেক্ষতা বজায় রেখে পরিস্থিতি সামাল দেবেন— এমন আশাই সাধারণ মানুষ করতে পারে। কারণ আবার যদি আমরা জাতপাত ও ধর্মের বিভাজনে নিজেদের মধ্যে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ি, তা হলে পিছনের দিকে হাঁটার এই অভ্যাস শেষ পর্যন্ত সমগ্র বাঙালি সমাজকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
রাজা বাগচী, গুপ্তিপাড়া, হুগলি
শাসকের দায়
জহর সরকারের ‘উদার সংস্কৃতি অটুট থাকুক’ শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি কথা। বিজেপির বঙ্গজয়কে নিঃশর্ত ভালবাসার জয় বলে এই মুহূর্তে আত্মহারা হওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত, সে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। ২০১১ সালে তৃণমূলের প্রথম বাংলা জয় যেমন হয়েছিল, অনেকটা তেমনই বিজেপির এই জয়। বাম ফ্রন্টের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসতে সময় লেগেছিল ৩৪ বছর। কিন্তু এই ক্ষেত্রে মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে তত সময় লাগেনি।
মানুষের এই রায় কার্যকর ভাবে প্রতিফলিত হত না, যদি নির্বাচন কমিশন প্রায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করত। পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি থেকে আর জি কর কাণ্ড— একের পর এক ঘটনা পূর্বতন প্রশাসনকে কালিমালিপ্ত করেছে। এই সব ঘটনার তদন্ত যেন মাঝপথে না হারায়, সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সরকার পরিবর্তন হলেও রাজনৈতিক হিংসা, খুন কিংবা মিথ্যা মামলার নিরপেক্ষ বিচার অনেক সময়ই সম্পূর্ণ হয় না। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা, এই ঘটনাগুলির যথাযথ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ধর্মীয় বিভাজনের আবহ থাকলেও রাজ্যের সব মানুষ যেন সমান নিরাপত্তা ও মর্যাদা পান। গণতন্ত্রের প্রকৃত সাফল্য সেখানেই।
প্রদীপকুমার সেনগুপ্ত, ব্যান্ডেল, হুগলি
দৃষ্টিকটু
শুধু নির্বাচনের আগে নয়, বছরের পর বছর ধরে গ্রাম থেকে শহরের বিভিন্ন রাস্তার মোড় ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রাজনৈতিক নেতাদের হাসিমুখের আত্মপ্রচারের বিশাল হোর্ডিং, কাট-আউট ও পোস্টার দেখে মানুষ ক্লান্ত। তার বদলে জলের অপচয় রোধ, গাছ লাগানো, জঞ্জাল অপসারণ, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ-সহ বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক প্রচার অনেক বেশি জরুরি। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সত্যজিৎ রায় এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-সহ বাংলার মনীষীদের ছবি ও বাণীর কাট-আউটও অনেক বেশি ইতিবাচক ও শিক্ষণীয় হবে।
রাধারমণ গঙ্গোপাধ্যায়, বজবজ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা