কুন্তক চট্টোপাধ্যায়ের ‘দুর্নীতির সর্বগ্রাসী বাস্তুতন্ত্র’ (২০-৩) সময়োচিত প্রবন্ধ। দুর্নীতির পরিকাঠামো এই রাজ্যে আজ খুব মজবুত ভাবে প্রতিষ্ঠিত। তার বিষবাষ্পে সাধারণ নাগরিকের জীবন বিপর্যস্ত। দুর্নীতির দাপটে ভেসে গিয়েছে রাজ্যের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও সরকারি নিয়োগ। এখানেই শেষ নয়, পরিবেশের উপরেও এসেছে কুঠারাঘাত। প্রবন্ধে উল্লিখিত, বন দফতরের এক শীর্ষকর্তার স্বীকারোক্তি— বনের মূল্যবান কাঠ চুরি ও পাচারের অভিযোগে যাঁদের ধরা হয়েছিল, তাঁরাই বর্তমান শাসক দলের নেতা-বিধায়ক হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন ছোট, বড় নদীর কোথা থেকে বালি তোলা হবে, সেটা ঠিক করার দায়িত্ব প্রশাসনের। কিন্তু বর্তমানে সে কাজ চলে গিয়েছে বালি মাফিয়া চক্রের হাতে। এই মাফিয়া চক্র ইচ্ছেমতো বালি তোলে এবং সেই বালি চলে যায় বিভিন্ন নির্মাণস্থলে। প্রাপ্য রাজস্বের এক পয়সাও সরকারি কোষাগারে ঢোকে না। লভ্যাংশের একটা নির্দিষ্ট অঙ্ক পৌঁছে যায় নির্দিষ্ট জায়গায়। অন্য দিকে, যথেচ্ছ বালি তোলার ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়। নদীতে অল্প বৃষ্টিতেই বন্যার সৃষ্টি, বা ক্রমশ শুকিয়ে আসা নদীখাতের সঙ্গে এই দুর্নীতির সংযোগটি ঘনিষ্ঠ।
আসলে দুর্নীতির কারবারিরা যখন নৈতিকতার মুখোশ পড়ে ফেলে, তখন দুর্নীতির এই সীমাহীন চক্র রোখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। দুর্নীতি তখন এক রকম প্রাতিষ্ঠানিক সিলমোহর পেয়ে যায়। মাটির তলা থেকে কয়লা তুলে তা পাচার করে দেওয়ার ঘটনা নিয়ে আলোচনা সমালোচনায় মুখর হয়েছে গণমাধ্যম, বিতর্কের ঝড় উঠেছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনও রাঘব বোয়ালের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হল না কেন? সুন্দরবনের আমপান, আয়লা, ইয়াস প্রভৃতি নামের প্রবল শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব এলাকার সাধারণ মানুষের প্রতি বছরের সঙ্গী। বেলাগাম ভাবে ম্যানগ্রোভ অরণ্য ধ্বংস করে শাসক দলের আশ্রয়ে, প্রশ্রয়ে লালিত হয় দুর্নীতি চক্রের মাথারা। অরণ্য ধ্বংস হয়ে আজ সেখানে গড়ে উঠেছে চিংড়ি চাষের জলাশয়। অভিযোগ উঠেছে, সন্দেশখালিতে চাষের জমি গরিব মানুষদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে সেখানে জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে সমুদ্রের নোনা জল। যাতে চিংড়ি চাষ করে মুনাফা লোটা যায়। পূর্ব কলকাতার বিশাল জলাভূমি, যেটা ছিল আমাদের কলকাতার কিডনি, তাকে বিভিন্ন বেআইনি নির্মাণের মাধ্যমে প্রায় শেষ করে দেওয়া হয়েছে। নাজিরাবাদ অগ্নিকাণ্ড তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
দিলীপ কুমার সেনগুপ্ত, বিরাটি, উত্তর ২৪ পরগনা
দৃশ্যদূষণ
কুন্তক চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘দুর্নীতির সর্বগ্রাসী বাস্তুতন্ত্র’ প্রবন্ধে এই রাজ্যের কাঠ, বালি, জলাভূমি, কয়লা ইত্যাদি প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস ও সেই সংক্রান্ত দুর্নীতি নিয়ে সবিস্তার আলোচনা করেছেন। এগুলো পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের পক্ষে কতটা বিপজ্জনক, তা জানা সত্ত্বেও প্রশাসন নির্বিকার। এর বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা করা হয় না নানা কারণে, তাও প্রবন্ধকার লেখায় ব্যক্ত করেছেন সবিস্তারে। ধরে নেওয়া যায়, এ ভাবেই চলছে এবং চলবে। কিন্তু প্রবন্ধে দৃশ্যদূষণের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হলে ভাল হত। বিশেষত, ভোটের সময় এ রাজ্যে টন টন প্লাস্টিক নির্মিত ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড, পতাকা, দেওয়াল লিখন ইত্যাদি গোটা রাজ্যে ভয়াবহ দৃশ্যদূষণ সৃষ্টি করে। ভোট মিটে যাওয়ার পরও কুৎসিত ভাবে বহু দিন তা রয়ে যায়। অন্য রাজ্যের ভোটে কিন্তু এতটা দেখা যায় না। ভোটের সময় সব রাজনৈতিক দলের নানান গালভরা প্রতিশ্রুতি, ইস্তাহার প্রকাশ। কেউ কিন্তু পরিবেশের উন্নতির জন্য একটি কথাও বলেন না।
অরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা-৮৪
পরিবেশের ক্ষতি
আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গে ফেস্টুন, ব্যানার, কাট আউট লাগিয়ে প্রচার চলছে। ফলে যথেচ্ছ পরিমাণ প্লাস্টিকের ব্যবহার হচ্ছে। ভোট মিটে গেলে এগুলি সরানোর উদ্যোগ প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলির থাকে না। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ব্যানার ও পোস্টারগুলি ঝড় বৃষ্টিতে খুলে পড়ে এবং নিকাশি নালা অবরুদ্ধ করে। ভোটকর্মীদের জন্য থাকে প্লাস্টিক পাউচে পানীয় জলের ব্যবস্থা। ভোট মিটে যাওয়ার পর খালি পাউচগুলি যত্র তত্র পড়ে থাকে। বিভিন্ন জনসভাতে লাউডস্পিকারের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শব্দদূষণের মাত্রাও প্রবল বৃদ্ধি করে। আগামী দিনে কী ভাবে পরিবেশের ক্ষতি না করে ভোট করা যায়, তা নিয়ে চিন্তা করা উচিত।
সৌগত কাঞ্জিলাল, রামপুর, বাঁকুড়া
বাঁচুক পুকুর
আমি টালিগঞ্জ বিধানসভা এবং কলকাতা পুরসভার ১১২ নম্বর ওয়র্ডের দীর্ঘ চব্বিশ বছরের বাসিন্দা। এই পাড়ার মধ্যে একটি পুকুর আছে। পুকুরটি সারা বছর জলপূর্ণ থাকে। এই জলে ছায়া ফেলে জায়গাটিকে শীতল করে রাখে পাড়ে অবস্থিত গাছের সারি। বর্ষাকালে পুকুর যখন জলে টইটম্বুর হয়ে ওঠে, তখন নিকটস্থ গৃহস্থ বাড়ির পোষা হাঁসদের জলে ছুটে বেড়ানো ভারী মনোরম দৃশ্য তৈরি করে। শীতকালে এটি হয়ে ওঠে পরিযায়ী পাখিদের নিশ্চিন্ত আশ্রয়। তা ছাড়া পাড়ায় একটিই পুকুর থাকার কারণে এবং পুকুরটির অবস্থানগত সুবিধার জন্য অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে এখান থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল সরবরাহের সুবিধা আছে। কিন্তু কিছু মানুষের হঠকারিতার ফলে পুকুরটি হয়ে উঠছে আবর্জনা ফেলার স্থান। পাড়ে জমছে বর্জ্য পদার্থ, প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগ আর গৃহস্থের ভাঙাচোরা আসবাবপত্রের বিশাল পাহাড়। এতে শুধুমাত্র পুকুরের দৃশ্যদূষণই ঘটছে না, পরিবেশকে তা করে তুলছে বিষাক্ত এবং একে ঘিরে থাকা মানুষ ও জীবকুলের বসবাসের অনুপযুক্ত। বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যের তীব্র অভাবও পরিলক্ষিত হয়েছে।
অবনীন্দ্র মোহন রায়, কলকাতা-৯৬
সাশ্রয়ী
কঙ্কণা দাসের ‘মেয়েদের অবাধ বাসযাত্রা’ (৯-৪) শীর্ষক প্রবন্ধটি আগ্রহ নিয়ে পড়লাম। বিষয়টি আজকের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে নিবিড় ভাবে যুক্ত, এবং সেই কারণে এর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। ভারতের একাধিক রাজ্যে ইতিমধ্যেই মহিলাদের জন্য ভাড়াবিহীন বাসযাত্রার ব্যবস্থা চালু হয়েছে। তামিলনাড়ুতে ২০২১ সাল থেকে এবং কর্নাটকে ২০২৩ সালে ‘শক্তি’ প্রকল্পের মাধ্যমে এই সুবিধা চালু হওয়ার পর দেখা গিয়েছে, বিপুল সংখ্যক মহিলা প্রতি দিন এই পরিষেবার সুযোগ নিচ্ছেন। এর ফলে কর্মজীবী ও নিম্ন আয়ের মহিলাদের দৈনন্দিন যাতায়াতের ব্যয়ে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় হচ্ছে, যা অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়তা হিসেবে কাজ করছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শহর ও শহরতলিতে মহিলাদের একটি বড় অংশই গণপরিবহণের উপর নির্ভরশীল। ফলে বাসভাড়া মকুবের ফলে শুধু ব্যক্তিগত সাশ্রয়ই নয়, কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য পরিষেবায় তাঁদের অংশগ্রহণও বৃদ্ধি পায়। অনেক ক্ষেত্রেই দূরের কাজ বা পড়াশোনার সুযোগ গ্রহণ করা সহজ হয়ে ওঠে, যা নারীদের স্বনির্ভরতার পথে একটি বড় পদক্ষেপ। এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গেও যদি মহিলাদের জন্য ভাড়ামুক্ত বাসযাত্রার মতো উদ্যোগ করা হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হবে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মহিলাদের জন্য এটি দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি এনে দিতে পারে এবং তাঁদের চলাচলের স্বাধীনতাকে আরও সুদৃঢ় করবে।
তবে এর পাশাপাশি পরিষেবার পরিকাঠামো উন্নয়ন, পর্যাপ্ত বাসসংখ্যা নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল যাতায়াতের পরিবেশ বজায় রাখাও সমান ভাবে জরুরি। একটি সুপরিকল্পিত উদ্যোগই পারে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে।
কাজল মুখোপাধ্যায়, কলকাতা-৮