ভারতীয় ফুটবলের বর্তমান অচলাবস্থা দূর করতে নয়াদিল্লিতে গত ৭ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রীর উপস্থিতিতে ক্লাবগুলির যে বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল, তার শেষে সাংবাদিক সম্মেলনে কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী মনসুখ মাণ্ডবিয়ার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ‘দুই প্রধানের নামই করতে পারলেন না, বিতর্কে ক্রীড়ামন্ত্রী’ (৮-১) শীর্ষক সংবাদটি রাজ্যের ফুটবলপ্রেমীদের নিঃসন্দেহে লজ্জা দেবে। মন্ত্রীর পদমর্যাদার প্রতি সম্মান রেখেই বলা যায়, খেলাধুলো ও তার ইতিহাস সম্বন্ধে সামান্যতম জ্ঞান থাকলে তিনি মোহনবাগানকে ‘মোহনবেগান’ ও ইস্টবেঙ্গলকে ‘ইস্টবেগন’ বলে উল্লেখ করতেন না। যদিও তিনি ঘরোয়া ভাবে বলেছেন, তাঁর পদবিও অনেকে ভুল উচ্চারণ করেন, যা প্রকাশিত হয়েছে, ‘বাড়াবাড়ি: মনসুখ’ (৯-১) শীর্ষক সংবাদে। তিনি আরও বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে অযথা বাড়াবাড়ি হয়েছে। এর অর্থ, সাধারণ মানুষ যদি এক জন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পদবি ভুল উচ্চারণ করেন, তবে শতাব্দীপ্রাচীন দুই দলের নাম ভুল উচ্চারণ করার মধ্যে মন্ত্রীর কোনও ভুল নেই। এটাই স্বাভাবিক যে, ক্রীড়াপ্রেমীরা কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর এই ধরনের ভুল উচ্চারণ ও সেই নিয়ে ক্রীড়ামন্ত্রীর সাফাইয়ের প্রতিবাদে সরব হবেন।
তবে দুঃখজনক যে, সংশ্লিষ্ট এই দুই দলের কর্মকর্তাদের মুখে এই নিয়ে কোনও প্রতিক্রিয়াই এখনও অবধি চোখে পড়েনি। খেলাধুলার জগতে, বিশেষত শীর্ষক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ছড়ি ঘোরানো আবহমানকাল ধরেই চলে আসছে আমাদের দেশে। এর আগে যদিও সেই ব্যক্তিত্বরা সামান্য হলেও খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত থাকতেন, বর্তমানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তার অভাব স্পষ্ট। সাম্প্রতিক মেসি-কাণ্ডে এই রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রীর ভূমিকা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে খেলাধুলা-সহ বিনোদনের জগতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কোন পর্যায়ে চলে যেতে পারে।
আবার ক্রীড়াজগতের সঙ্গে যুক্ত কোনও প্রাক্তন খেলোয়াড় নির্দিষ্ট কোনও খেলার পরিচালন সমিতির পদে যুক্ত হলেও, যদি তাঁর রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থাকে এবং যোগ্যতাও মান অনুযায়ী না-হয়, তখন সেই খেলার পরিণতি কোন দিকে যেতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ দুই প্রধান ও জাতীয় দলে খেলা ফেডারেশন সভাপতি কল্যাণ চৌবের প্রশাসনিক আমলে ভারতীয় ফুটবলের ধারাবাহিক ক্রমাবনতি। তাই, কলকাতার দুই প্রধানের নামের এই বিকৃত উচ্চারণ এক অর্থে বাংলা এবং বাংলার ফুটবলেরই অপমানের শামিল, যা নিয়ে সরব হওয়া উচিত দলমত নির্বিশেষে বাংলার সকলেরই।
অশোক দাশ, রিষড়া, হুগলি
দুর্দিন চলবে
‘ফুটবলকে বাঁচান, আর্তি সুনীলদের’ (৩-১) শীর্ষক সংবাদ প্রসঙ্গে কিছু কথা। দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ফুটবল প্রতিযোগিতা ‘ইন্ডিয়ান সুপার লিগ’ (আইএসএল) বর্তমানে চরম সঙ্কটের মুখে। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী ক্লাবগুলিকে এত কাল প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দিয়ে আসা বাণিজ্যিক সংস্থাগুলি সরে যাওয়ার ফলে প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে আইএসএল-এর। সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনও দিশাহারা, কী ভাবে বাঁচানো যায় আইএসএল-কে। দেশের ফুটবলের এই জরাজীর্ণ মৃতপ্রায় চেহারা দেখে সুনীল ছেত্রী-সহ দেশের নামী ফুটবলাররাও ত্রস্ত ও আতঙ্কিত।
একই দিনে, আর একটি খবর, ‘নজিরবিহীন নির্বাসন গ্যাবনের’। ‘আফ্রিকা কাপ অব নেশনস’-এ গ্যাবনের জাতীয় ফুটবল দল পর পর তিন বার হেরে যাওয়ার কারণে দেশের সরকার অনির্দিষ্ট কালের জন্যই জাতীয় ফুটবল দলকে নির্বাসিত করল। পাশাপাশি কোচিং স্টাফ, অধিনায়ক, এমনকি এক জন ডিফেন্ডারকেও বরখাস্ত করা হয়েছে। দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশে ফুটবল খেলা হচ্ছে দেড় শতকেরও বেশি সময় ধরে। অথচ, তার চরম দৈন্যদশা দেখেও নির্বিকার থেকেছে এ দেশের সরকার। কারণ খোঁজা তো দূর, এত বছরে এই জনপ্রিয় খেলাটির ন্যূনতম পরিকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে কি না সন্দেহ। সত্যি বলতে, ভারতে সাম্প্রতিক কালে ক্রিকেটের যতখানি তরতরিয়ে উন্নতি হয়েছে, তার ছিটেফোঁটাও ফুটবলে পাওয়া গেলে, হয়তো এই খেলাটির চেহারাটাই অন্য রকম হত।
এক-একটা ফুটবল বিশ্বকাপ যায়, আর এই ১৪০ কোটি দেশের মানুষ অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে থাকেন, কবে আমাদের ভারতও ওই বিশ্ব মঞ্চে খেলার সুযোগ পাবে। কিন্তু তার জন্য সরকারের তরফে যে আগ্রহ, উদ্যোগ প্রয়োজন, তা আছে কি? ফলে সুনীলরা খেলাটিকে বাঁচানোর জন্য গলা ফাটালেও, ফুটবলের দুর্দিন এত সহজে ঘুচবে বলে মনে হয় না।
তাপস সাহা, শেওড়াফুলি, হুগলি
হতাশাজনক
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ক্রিকেট থেকে সরিয়ে দিল আইসিসি। কারণ, বাংলাদেশ ভারতে খেলার ঝুঁকি নিতে চায়নি। ওরা ভারতে হওয়া ম্যাচগুলো অন্যত্র খেলতে চেয়েছিল। তাদের এই দাবি কি খুব অযৌক্তিক? বিশেষত, বর্তমান ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের সূত্রে? উগ্র হিন্দুত্ববাদী তো আছেই। তার সঙ্গে ইদানীং দেখা যাচ্ছে সাধারণ ভারতীয় বিশেষত পশ্চিমবঙ্গবাসীও বাংলাদেশ-বিরোধী হয়ে উঠেছেন। অর্থাৎ, এ দেশে খেলা চালানো ঝুঁকিসাপেক্ষ ব্যাপার। ভারত নিজেও তো নিরাপত্তার কারণে পাকিস্তানে গিয়ে খেলতে অস্বীকার করে। ভারতের সঙ্গে আইসিসি-র সম্পর্ক ভাল মূলত ভারতের ভারী কোষাগারের কারণে। ছোট ও আর্থিক ভাবে দুর্বল বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ ক্রিকেট থেকে সরিয়ে দেওয়া তাই মেনে নেওয়া যায় না।
স্বপন কুমার ঘোষ, কলকাতা-৩৪
হারের লজ্জা
ঘরের মাঠে সম্প্রতি ভারতীয় ক্রিকেট দলের ক্রমাগত হার মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। এর পিছনে পক্ষপাতিত্ব, ত্রুটিপূর্ণ দল নির্বাচন, কোচ-খেলোয়াড়দের মনোমালিন্য ও টিম ম্যানেজমেন্টের দূরদর্শিতার অভাব ছিল। রবি শাস্ত্রী ও রাহুল দ্রাবিড়ের কোচিংয়ে ভারত যে সাফল্যের চূড়ায় আরোহণ করেছিল, তা এখন অতীত। গৌতম গম্ভীরের ক্রিকেট কোচিংয়ে ভারত শ্রীলঙ্কা, নিউ জ়িল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার কাছে ঘরের মাঠে ওয়ান ডে সিরিজ় হেরেছে, নিউ জ়িল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের কাছে টেস্টে হোয়াইটওয়াশ হয়েছে। বর্ডার-গাওস্কর ট্রফি প্রতিযোগিতায় হেরেছে। এ বার যে সাদা বলে ভারত অপ্রতিরোধ্য ছিল, ঘরের মাঠে নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই সাদা বলে এক দিনের সিরিজ়ও হারল। গৌতম গম্ভীরের কোচিংয়ে ভারতীয় সাজঘর হঠাৎ করে বদলে গেল। সব ধরনের ফরম্যাটে কিংবদন্তি দুই খেলোয়াড়— রোহিত শর্মা ও বিরাট কোহলিকে টেস্ট ক্রিকেট থেকে সরিয়ে অবসর নিতে বাধ্য করা হল। টি২০ বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক রোহিত শর্মার কাছ থেকে অধিনায়কত্ব কেড়ে নেওয়া হল। ডাগ আউটে বসে থাকা একাধিক প্রতিভাবান ক্রিকেটার যেমন যশস্বী জায়সওয়াল, ঈশান কিষান, রিঙ্কু সিংহ, আকাশদীপদের যথাযথ ব্যবহার করা হল না। অথচ, হর্ষিত রানার মতো খেলোয়াড় সব ধরনের ক্রিকেটে লাগাতার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন।
ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডকে অবিলম্বে গৌতম গম্ভীর ও টিম নির্বাচকদের নিয়ে ভাবতে হবে। আর চাই ড্রেসিংরুমের আবহাওয়ার বদল, সঠিক দল নির্বাচন ও উন্নত মানের বোলিং, ব্যাটিং ও ফিল্ডিং। প্রত্যেক ক্রিকেটারকে দক্ষতার শীর্ষে পৌঁছতে হবে। জয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক মানের খেলা বলতে ভারতের শুধু আছে ক্রিকেট। এক সময় ভারত হকিতে শীর্ষ স্থানে থাকলেও এখন তা অতীত। ১৪০ কোটি ভারতবাসীর স্বপ্ন, আবেগ ও উন্মাদনার কথা মাথায় রেখে এ ব্যাপারে আরও বেশি তৎপর ও যত্নশীল হতে হবে।
হারানচন্দ্র মণ্ডল, ব্যারাকপুর, উত্তর ২৪ পরগনা