Lionel Messi

সম্পাদক সমীপেষু: ভবিষ্যৎ অন্ধকারে

ভারতীয় ফুটবল ধুঁকছে, আর পরিচিত মুখেরা মেসির সঙ্গে ছবি তুলে সমাজমাধ্যমে দিচ্ছেন— এ অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।

শেষ আপডেট: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:১২

ঋকসুন্দর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আবেগ আছে, ফুটবল নেই’ (২৩-১২) শীর্ষক প্রবন্ধটি যথাযথ। লিয়োনেল মেসি কলকাতায় এলেন বটে, কিন্তু এখানে কোনও ফুটবলের ফুল ফুটল না। যদি তাঁকে একটা ভারতীয় ম্যাচের মধ্যে বা কোনও ক্লাব ফাইনালের সময়ে আনা যেত, তার প্রভাব হত সুদূরপ্রসারী। অথচ তাঁকে আনা হল এমন অনুষ্ঠানে, যেখানে তিনি বেমানান। ভারতীয় ফুটবল ধুঁকছে, আর পরিচিত মুখেরা মেসির সঙ্গে ছবি তুলে সমাজমাধ্যমে দিচ্ছেন— এ অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। যেমন ভাবে মেসিকে দেখতে না পেয়ে প্রতিবাদ করেছে জনতা, পারবে কি তারা ‘ভারতীয় ফুটবলের দুর্দশা নিয়ে’ একই ভাবে প্রতিবাদ করতে?

ভারতীয় পুরুষ ফুটবল দল ফিফা বিশ্ব ক্রমতালিকায় ১৪২ নম্বরে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন রয়েছে ২৮ নম্বরে, সন্ত্রাসে দীর্ণ নাইজিরিয়া রয়েছে ৩৮ নম্বরে, আফ্রিকার অন্যতম দরিদ্র দেশ মালি রয়েছে ৫৩ নম্বরে, ড্রাগ ও হিংসায় আচ্ছন্ন হাইতি আছে ৮৪ নম্বরে। ভারতের শুধু ভরসা— বাংলাদেশ ও পাকিস্তান ভারতের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। বরং ভারতীয় মহিলা ফুটবল দলের অবস্থা অনেক ভাল, তারা রয়েছে ৬৭ নম্বরে। রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, বায়ার্ন মিউনিখ, নিউকাস্‌ল, লেস্টার সিটি, অ্যাস্টন ভিলা-র মতো ক্লাব যেখানে বিপুল রাজস্ব অর্জন করে, সেখানে ভারত তথা কলকাতার তিন প্রধান ক্লাব স্পনসর সমস্যায় জেরবার। ভারতের অপর ফুটবল-প্রধান অঞ্চল গোয়ায় এক কালের জাতীয় লিগ কাঁপানো একাধিক ক্লাব বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

মেসি-সফরে বিভিন্ন স্তরে আজব প্রতিক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি করে যে কথাটা মনে হল, তা হল— আগামী এক দশকে অন্তত, ভারতের ফুটবলের ভবিষ্যৎ হয়তো সেই চার বছর অন্তর বিশ্বকাপ এলে ব্রাজ়িল-আর্জেন্টিনার পতাকায় সেজে ওঠাতেই থেকে গেল। বিশ্বকাপের ম্যাচ শুরুর আগে জাতীয় সঙ্গীত শুনে গর্বিত হতে পারার আমাদের সেই স্বপ্ন অদূর ভবিষ্যতে সফল হবে বলে মনে হয় না।

প্রদীপকুমার সেনগুপ্ত, ব্যান্ডেল, হুগলি

পরিকল্পনা চাই

‘আবেগ আছে, ফুটবল নেই’ শীর্ষক প্রবন্ধে ঋকসুন্দর বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি ভারতে মেসিকে আনার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় ফুটবলের যে ছন্নছাড়া অবস্থার কথা তুলে ধরেছেন, সেটা অনেকাংশেই ঠিক। তবে কোনও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থার এই ধরনের সফরের উদ্যোগী হওয়ার মূলে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থই প্রধান, এবং সেটা মানুষের আবেগকে সামনে রেখেই। সাধারণ মানুষ চান বলেই এই ধরনের বিশ্বমানের সর্বোচ্চ খেলোয়াড়কে শুধুমাত্র চাক্ষুষ করার শর্তেই এত টিকিট বিক্রি হয়; কালোবাজারিতে সেই টিকিটের দাম চলে যায় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। আমরা যতই এই বিষয়ের সমালোচনা করি না কেন, এমন কোনও আইন আছে বলে জানা নেই, যাতে এই ধরনের উদ্যোগ একেবারেই বন্ধ করা যায়। সুতরাং রাজ্য তথা দেশের ক্রীড়া মন্ত্রককেই এই সমস্ত উদ্যোগ অনুমোদনের সময় নজর রাখতে হবে— নির্ধারিত অনুষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত অর্থের একাংশ যেন ব্যয় করা হয় ভারতীয় ফুটবল প্রসারের স্বার্থে।

অথচ সেই দিকে নজরের বদলে অনুষ্ঠানে এমন অনিয়ন্ত্রিত ঘটনা ঘটে গেল, যাতে বঞ্চিত হলেন এই অনুষ্ঠান দেখার জন্য টিকিট কাটা সাধারণ দর্শক; সৃষ্টি হল অবাঞ্ছিত বিতর্কের। অপর দিকে, ভারতীয় ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনকে মনে রাখতে হবে, বিশ্বে ভারতীয় ফুটবলের স্থান ক্রমাগত নামতে নামতে এসে দাঁড়িয়েছে ১৪২ নম্বরে এবং এশীয় পর্যায়ে ২৭ নম্বরে, যা ফুটবলপ্রেমীদের কাছে যন্ত্রণার। ভারতীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ লিগ আজ জটিলতায়, যা নিয়ে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা অসন্তুষ্ট। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আদালত অবধি মামলাও গড়িয়েছে। পরোক্ষ ভাবে হস্তক্ষেপে উদ্যোগী হয়েছে কেন্দ্রীয় ক্রীড়া মন্ত্রক। যদিও এর প্রত্যক্ষ দায় কোনও ভাবেই প্রশাসন এড়িয়ে যেতে পারে না, তবুও খেলার মধ্যে এই ধরনের রাজনীতির অনুপ্রবেশেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভারতীয় ফুটবল।

তৃণমূল স্তর থেকে খেলোয়াড় তুলে আনার জন্য ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের তত্ত্বাবধানে যে ধরনের অ্যাকাডেমির প্রয়োজন ছিল সমগ্র দেশে, সেটা এখনও অবধি গড়ে তুলতে অপারগ ভারতীয় ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা। নিয়মের জাঁতাকলে ক্লাবগুলোর বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দল আছে আইএসএল ও আই লিগে, কিন্তু বেশির ভাগ ক্লাবেরই কোনও অ্যাকাডেমি নেই; কোনও ক্রমে খেলোয়াড় জোগাড় করে গড়ে ওঠে তাদের এই বয়সভিত্তিক দলগুলো। গা-ছাড়া মনোভাব বা এই ক্ষেত্রে বিনিয়োগের অনীহা মোটেও কাম্য নয় ফুটবলের সামগ্রিক মানোন্নয়নের স্বার্থে। দু’-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া বিদেশি খেলোয়াড় বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও দেখা যায় যে, যে বিদেশিদের ফুটবলজীবন প্রায় শেষ প্রান্তে এবং ভারতীয় ফুটবলারদের সমমানের বা কখনও কখনও তাঁদের চেয়েও দুর্বল, সেই খেলোয়াড়দের এখানে নিয়ে আসা হয় বেশি পরিমাণ অর্থ খরচ করে। বঞ্চিত হন দেশের খেলোয়াড়েরা, যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক।

তাই যত দিন না ফুটবল-সহ সমগ্র ক্রীড়াক্ষেত্রেই কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গৃহীত হবে, তত দিন আমাদের ফুটবল এই ভাবেই পিছিয়ে যেতে থাকবে— যতই আমরা আবেগ দেখিয়ে চিৎকার করি না কেন।

অশোক দাশ, রিষড়া, হুগলি

মেঘাচ্ছন্ন

‘বাগানে দুই মরসুম নির্বাসনের কাঁটা’ (১৮-১২) প্রতিবেদনটি পড়ে খুব আশাহত হলাম। মেসিকে নিয়ে কলকাতায় যা হয়ে গেল, তার পরেও দেখা যাচ্ছে ফুটবলকে নিয়ে সঙ্কট সমান তালেই চলছে। দুই মরসুমের জন্য মোহনবাগান ক্লাব নির্বাসিত হয়েছে এবং জানা যাচ্ছে জরিমানা হিসাবে ক্লাবকে দিতে হবে ভারতীয় অর্থমূল্যে প্রায় ৯১ লক্ষ টাকা। এ বছরে ইরানে নানান অজুহাত দেখিয়ে এশিয়ান ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপে খেলতে না যাওয়ায় এই শাস্তি। যে ভাবে বিদেশি খেলোয়াড়দের দ্বারা পুষ্ট ক্লাবটি ইরানে খেলতে না যাওয়ার কারণ হিসাবে সেখানকার রাজনৈতিক জটিলতা ও অশান্ত পরিবেশকে তুলে ধরেছে, তা যথাযথ মনে হয়নি এএফসি-র; ফলে মোহনবাগানের উপর নেমে এসেছে শাস্তির খাঁড়া। শতাব্দীপ্রাচীন মোহনবাগানের এই হাল, তায় স্পনসর ও চরম আর্থিক সঙ্কটে জেরবার হয়ে এক প্রকার বন্ধের উপক্রম আইএসএল ও আই লিগ— আক্ষরিক অর্থেই সঙ্কটের ঘন কালো মেঘ এসে ঢেকে ফেলেছে ভারতীয় ফুটবলকে, এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় চাই অবিলম্বে। বিজাতীয় সঙ্কটের গড্ডলিকা প্রবাহে সমানে ভাসতে থাকলে ভারতীয় ফুটবলের জন্য আরও দুর্দিন অপেক্ষমাণ।

দেশ ক্রিকেট ও হকির মতো দু’টি দলগত খেলায় উচ্চ বিশ্বমানে খেলতে পারলেও, তা যখন ফুটবলে অধরাই থেকে যাচ্ছে, তখন ফুটবলের বিশেষ যত্নের জন্য অবিলম্বে যুদ্ধকালীন উদ্যোগ প্রয়োজন।

তাপস সাহা, শেওড়াফুলি, হুগলি

আশাপ্রদীপ

লিয়োনেল মেসি বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই কলকাতা আবার প্রমাণ করল তাদের ফুটবল কিন্তু এখনও জৌলুস হারিয়ে ফেলেনি। মহিলাদের সাফ ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম সংস্করণে চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশের নাম উজ্জ্বল করল ইস্টবেঙ্গলের মহিলা দল। স্বপ্নের সওয়ারি সুলঞ্জনা, সিল্কি দেবী, রেস্টি, জ্যোতি ও ফাজ়িলারা।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিগত ২১ বছরের খরা কাটিয়ে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের এই ট্রফি স্বপ্ন পূরণের প্রতীক। মহিলা ফুটবলের এই যাত্রা সমাজের পরিবর্তনকেও প্রতিফলিত করে— যেখানে মহিলারা সর্বোচ্চ স্তরের চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছেন।

অমিয় বিশ্বাস, গোবরডাঙা, উত্তর ২৪ পরগনা

আরও পড়ুন