পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তীর ‘সঙ্কটের ঘূর্ণিপাকে’ (২৬-১২) প্রবন্ধটি সময়োপযোগী ও যথাযথ। আজ দু’পক্ষের কাছেই মানবতা বা মানবধর্ম যেন এক অলীক স্বপ্ন। সাম্যবাদী কবি নজরুল এমন মৌলবাদীদের নিয়েই বার বার সংশয় প্রকাশ করেছেন। ‘পথের দিশা’ কবিতায় তাঁর অভিব্যক্তি— “মসজিদ আর মন্দির ঐ শয়তানদের মন্ত্রণাগার,/…জানিস যদি, খবর শোনা বন্ধ খাঁচার ঘেরাটোপে,/ উড়ছে আজও ধর্ম-ধ্বজা টিকির গিঁঠে দাড়ির ঝোপে!”
স্মরণীয়, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার পতনের কারণ ছিল সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের বিষয়কে কেন্দ্র করে ধেয়ে আসা গণঅভ্যুত্থান। সমাজ ও রাজনীতি-সচেতন মানুষ জানেন, এর অন্তরালে ছিল প্রত্যক্ষ মদতদাতা পাকিস্তান এবং পরোক্ষে চিন ও আমেরিকা। এর পর থেকে বাংলাদেশ যে ঘূর্ণাবর্তে নিমজ্জিত হয়েছে, তা থেকে পরিত্রাণের আশায় গঠিত হয় অন্তর্বর্তিকালীন সরকার। সরকারের পৌরোহিত্য গ্রহণ করেন নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস। এই সরকার জনগণের প্রত্যক্ষ রায়ে গঠিত নয়; তার ফলেও হয়তো অঙ্গুলিহেলনে ও জড়ভরত হয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতেই প্রতিহিংসাপরায়ণ মৌলবাদী সংগঠনগুলি রাজনীতির পাশাখেলায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে। শুরু হয় কবি-সাহিত্যিক ও মনীষীদের সৃষ্টিসম্ভারে অগ্নিসংযোগ, নিষিদ্ধকরণ ও ভাঙচুর। সংখ্যালঘুরা ক্রমশ বিপন্ন হয়ে পড়েন। ভারতবিদ্বেষের অজুহাতে ভারতের জাতীয় পতাকার অবমাননাও ঘটে। ভোটের আঙিনায় বিরোধ জট পাকাতে থাকলে ছাত্রনেতা হাদি হত্যার পর হিংসাত্মক কার্যকলাপ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি চলে যায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
ইসলামমুখী স্লোগান শুধু ভারত বিদ্বেষেই থেমে থাকেনি; আক্রমণ হয়েছে ঐতিহ্যবাহী প্রথম আলো ও দ্য ডেলি স্টার পত্রিকার দফতর, ছায়ানট-সহ একাধিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে। তালিবানি কায়দায় স্কুলে স্কুলে সাংস্কৃতিক চর্চাকে ‘ইসলামবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে ধ্বংস করার চেষ্টা চলে। মুক্তিযুদ্ধ-সংক্রান্ত স্থাপত্য ও ভাস্কর্য গুঁড়িয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে পাঠ্যপুস্তক নতুন করে লেখার ফতোয়াও জারি হয়। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দীপু দাসকে নির্মম ভাবে পিটিয়ে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আতঙ্ক আরও গভীর হয়। এর প্রতিবাদে দিল্লি-সহ পশ্চিমবঙ্গের নানা জায়গায় মানুষ পথে নামেন। অন্য দিকে, কট্টরপন্থী হিন্দুরা বাংলাদেশের এই ঘটনাবলিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর চেষ্টাও করছেন।
এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার কথা মাথায় রেখে ভারত সরকার এখন ধীরে চলার পক্ষপাতী। বাংলাদেশে ২০২৬ সালেই নির্বাচন। দেখার বিষয়, নতুন গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের কতটা আশা পূরণ করতে পারবে। যদিও আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ এবং নেত্রী, তথাকথিত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপর ঝুলছে চরম শাস্তির খাঁড়া। গণতন্ত্র ভূলুণ্ঠিত, আইনশৃঙ্খলা বিপর্যস্ত— তবু মানবধর্মে বিশ্বাসীরা আশাবাদী।
আসলে হিংসা দিয়ে হিংসাকে জয় করা যায় না। মৌলবাদী ধর্মে হিন্দু হোক বা মুসলমান, ‘অন্তর থেকে বিদ্বেষ-বিষ’ নাশ করতে না পারলে ‘জাতির নামে বজ্জাতি’ কিন্তু রোখা সম্ভব নয়। এই দুঃসময়ে নির্মল হৃদয়ের অধিকারী ‘যুগান্তরের খড়্গপাণি’ কবি, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা তাই আরও বেশি প্রয়োজন।
সূর্যকান্ত মণ্ডল, কলকাতা-৮৪
বিপদের আবহ
পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তীর লেখা প্রবন্ধ ‘সঙ্কটের ঘূর্ণিপাকে’ বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং হিন্দুদের উপর নির্যাতনের এক বাস্তব বিবরণ তুলে ধরে। মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ‘মুক্তিযোদ্ধা’রা ‘রাজাকার’দের সব চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেশকে স্বাধীন করতে সক্ষম হলেও পাকিস্তানপন্থী মৌলবাদীদের সম্পূর্ণ নির্মূল করা যায়নি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডই তার প্রমাণ।
আরও একটি লক্ষণীয় বিষয়, সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু বাংলাদেশির ভারতবিদ্বেষমূলক নকল ও বিভ্রান্তিকর ভিডিয়ো সাধারণ মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলছে। মৌলবাদী শক্তিগুলি এই মনোভাবকে ভারতবিরোধিতায় অত্যন্ত সুচারু ভাবে ব্যবহার করছে, তা ক্রিকেট হোক বা রাজনীতি, সব ক্ষেত্রেই প্রায় সমান ভাবে প্রযোজ্য।
সময় যত এগোচ্ছে, পরিস্থিতি ততই অবনতির দিকে যাচ্ছে। মৌলবাদীরা যুবসমাজের মনে এমন এক বার্তা গেঁথে দিতে সক্ষম হয়েছে যে ১৯৭১ সালে ভারতের সহযোগিতায় অর্জিত স্বাধীনতা নাকি মিথ্যা। ফলে একটি বিপজ্জনক ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যেখানে ভারতীয় সংস্কৃতির ছোঁয়া আছে, তা সমূলে ধ্বংস করতে হবে।
স্বপন চক্রবর্তী, জগৎবল্লভপুর, হাওড়া
পরিবর্তনের দাবি
অতনু বিশ্বাসের লেখা ‘মানুষের দিন কি শেষ?’ (রবিবাসরীয়, ৭-১২) শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে এই চিঠির অবতারণা। প্রতিনিয়ত উন্নত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নানান রূপ, যার সঙ্গে তাল মেলাতে তরুণরাই হিমশিম খাচ্ছে, বয়স্ক মানুষদের কথা তো বাদই দিলাম। এটি এমন এক প্রযুক্তি, যা নিজে বিশ্লেষণ করতে পারে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম। মানবিক বুদ্ধির তুলনায় প্রায় নিখরচায় যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমার-আপনার বাড়ির নকশা তৈরি করে দিতে পারে, অসুখ হলে ওষুধের পরামর্শ দিতে পারে, তবে মানবজাতি কোন দিকে বেশি আকৃষ্ট হবে? বিষয়টি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক এবং গভীর চিন্তার দাবি রাখে।
মোটরগাড়ি এসে পাল্কিবাহকদের কাজ কেড়ে নিয়েছিল, কম্পিউটার এসে টাইপরাইটারকে বেকার করে দিয়েছিল। তবু সমষ্টিগত ভাবে মানুষ টিকে তো গিয়েছে, নতুন ভাবে সজ্জিত হয়েছে, আর ব্যক্তি মানুষ অভিযোজিত হওয়ার চেষ্টা করেছে। ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো কিছু চাকরি বিলুপ্ত করবে, কিন্তু একই সঙ্গে মানুষের সৃষ্টিশীলতা, সমবেদনা ও মূল্যবোধনির্ভর পেশাগুলির গুরুত্ব আরও বাড়বে।
নীতিনির্ধারণ, শিক্ষা এবং পুনঃপ্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই রূপান্তরকে ইতিবাচক করে তোলাই এখন সময়ের দাবি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগ উন্মুক্ত করবে বহু নতুন সুযোগ। মানুষকে কিন্তু নতুন করে জীবনকে মূল্যায়ন করতে হবে, খুঁজে নিতে হবে সৃষ্টিশীল, অর্থবহ কাজকর্ম, যার ভিত্তি হবে মেধা ও পরিশ্রম।
প্রশ্ন এখন কেবল প্রযুক্তির নয়, তার ব্যবস্থাপনার। সমাজ, সরকার ও ব্যক্তি— এই তিন পক্ষকেই এক সঙ্গে মিলিত ভাবে এই পরিবর্তনের পথে এগোতে হবে।
রবীন রায়, শ্যামনগর, উত্তর ২৪ পরগনা
রাষ্ট্রভাষা নয়
কণাদ সিংহের ‘হিন্দুরাষ্ট্রের হিন্দি শাসন’ (২৪-১২) শীর্ষক প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা। ভারত বহু ভাষাভাষীর দেশ হওয়ায় কোনও ভাষাকেই পৃথক ভাবে রাষ্ট্রভাষা করা হয়নি। ভারতীয় সংবিধানে সব ভাষা, ধর্ম, বর্ণ ও জাতিকে সমান অধিকার ও সম্মান দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে সংবিধান অনুযায়ী ভারত সরকারের নানা দফতরের কাজকর্ম পরিচালনার জন্য হিন্দি (দেবনাগরী লিপিতে) এবং ইংরেজি— এই দু’টি ভাষা ব্যবহৃত হয়। ফলে হিন্দি ভারতের সরকারি ভাষা এবং ইংরেজি একটি সহযোগী বা অতিরিক্ত সরকারি ভাষা।
১৯৪৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর দেবনাগরী লিপিতে লিখিত হিন্দিকে ভারত সরকারের সরকারি ভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। যদিও দেশের বিভিন্ন রাজ্যে একাধিক আঞ্চলিক ভাষা প্রচলিত ও স্বীকৃত। গণপ্রজাতন্ত্রী ভারতে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে ২২টি ভাষাকে তালিকাভুক্ত ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অতএব স্পষ্ট ভাবে বলা যায়, হিন্দি ভারতের রাষ্ট্র বা জাতীয় ভাষা নয়, এটি কেবল কেন্দ্রীয় সরকারের নানা দফতরের কাজের একটি ভাষা।
সুবীর ভৌমিক, কলকাতা-৫৫