‘পুরোধা’ (কলকাতার কড়চা, ২১-২) বিষয়ে কিছু কথা। তুলনামূলক-ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান চর্চায় সুকুমার সেনের ভাষার ইতিবৃত্ত ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে বাংলায় লেখা প্রামাণ্য পুস্তক। বাংলা ভাষার উদ্ভব, বিকাশ ও বিশ্লেষণের উপর এতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি প্রাচীন ও মধ্যকালীন আর্যভাষায় লিখিত ভারতীয় সাহিত্যের একটি প্রামাণ্য ইতিহাসও রচনা করেন। তিনি ছিলেন প্রাজ্ঞ ভাষাতাত্ত্বিক, ইতিহাসকার, আবার ভারতবিদ্যার সাধকও।
তাঁর আর এক অন্যতম কীর্তি বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস (পাঁচ খণ্ড) রচনা। সযত্নে পরীক্ষিত পুঁথিপাঠের ভিত্তিতে রচিত এই গ্রন্থ সাহিত্যের এক যুক্তিনির্ভর ইতিহাস। তথ্যের বিপুলতায় সমৃদ্ধ এই আকরগ্রন্থ প্রকৃতপক্ষে বাংলা-ভাষাভাষী মানুষের সামগ্রিক ইতিহাস। যা পড়ে রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত প্রীত হয়ে বলেছিলেন, “বাংলা সাহিত্যের সমগ্র পরিচয়ের এমন পরিপূর্ণ চিত্র ইতিপূর্বে আমি পড়িনি। গ্রন্থকার তাঁর বিবৃতির সঙ্গে সঙ্গে আলোচিত পুস্তকগুলি থেকে যে দীর্ঘ অংশ সকল উদ্ধৃত করে দিয়েছেন, তাতে করে তাঁর গ্রন্থ এক সঙ্গে ইতিহাসে এবং সঙ্কলনে সম্পূর্ণরূপ ধরেছে... এই গ্রন্থে সাহিত্যের ইতিহাস বাংলা দেশের রাষ্ট্রিক ও সামাজিক ইতিহাসের পটভূমিকায় রচিত হওয়াতে রচনার মূল্যবৃদ্ধি করেছে।”
পরিকল্পনা ও রচনারীতির দিক দিয়েও সুকুমার সেনের এই গ্রন্থ আলাদা ছিল। এখানে প্রতিটি যুগের সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য ও তার অন্তর্নিহিত ভাবের সঙ্গে তিনি পাঠকবর্গের পরিচয় করিয়েছেন। এ ছাড়া চর্যাগীতি-সহ একাধিক বিষয়ের আলোচনাকালে তিনি মৌলিক চিন্তার পরিচয় দিয়েছেন। বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের অনন্যতা সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেছেন, “সমসাময়িক বাঙ্গালা সাহিত্যের মানদণ্ডে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ মহাকাব্য।”
তাঁর চৈতন্যচর্চাও ছিল বিশদ, গভীর এবং যথেষ্ট ঋদ্ধ। তিনিই প্রথম পুঁথিনির্ভর তথ্য-প্রমাণ সহযোগে উত্তরবঙ্গের মনসামঙ্গলের কবি জগজ্জীবন ঘোষালের কাব্য নিয়ে আলোচনা করেন। কৃষ্ণরাম দাসের মঙ্গলকাব্য নিয়েও তিনি প্রথম সবিস্তারে আলোচনা করেন। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত রূপরামের ধর্ম্মমঙ্গল কাব্যের ভূমিকায় তিনি জানিয়েছেন, “ধর্মঠাকুর বৈদিক সূর্য দেবতা। ইনি শ্বেত-অশ্বারোহী (ধবল-খচর) সিপাহী বেশধারী (ঈরাণীয়) সূর্যও বটেন।” আবার ময়মনসিংহ পূর্ববঙ্গ-গীতিকার পালাগুলির প্রামাণিকতা বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করে বলেন, পালাগুলি সর্বাংশে অকৃত্রিম নয়। সুকুমার সেনের আ হিস্ট্রি অব ব্রজবুলি লিটারেচার একটি অসাধারণ কাজ। ব্রজবুলি ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে এমন দিগ্দর্শী আলোচনা তাঁর আগে কেউ করেননি। অষ্টাদশ শতাব্দীতে প্রায় পঁচাত্তর জন বৈষ্ণব পদকর্তার পরিচয় উদ্ধার করেছেন। সুকুমার সেন ছিলেন রামকথার বহুত্ববাদে বিশ্বাসী। লিখেছিলেন রামকথার প্রাক্-ইতিহাস নামে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রচনা। তাঁর গবেষণাকর্ম বঙ্গসংস্কৃতির সীমা ছাড়িয়ে বহু দূর বিস্তৃত ছিল।
বিশিষ্ট ভাবে বাঙালি ও ভারতীয় এই মনীষীর ধ্যানজ্ঞান ছিল নিজের দেশ, সংস্কৃতি ও মানুষকে কেন্দ্র করে। আজ যখন আমাদের সংস্কৃতি ও সাহিত্যসাধনার অগ্রগতি নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে, তখন সদ্য অতিক্রান্ত ১২৫তম জন্মবর্ষে সুকুমার সেনকে আরও বেশি মনে রাখা প্রয়োজন।
সুদেব মাল, তিসা, হুগলি
তথ্যের স্রোতে
সোহম ভট্টাচার্যের ‘কী শিখবে, কেন শিখবে’ (১৯-৩) প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। আজকের উত্তর-সত্য যুগে কৃত্রিম মেধা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এই কৃত্রিম মেধাকে কাজে লাগিয়ে তথ্যপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতি ও প্রসারের ফলে মুঠোফোনের মাধ্যমে যে তথ্যভান্ডার মানুষের সামনে উপস্থিত হচ্ছে, তার কোনটি ঠিক আর কোনটি বেঠিক— তা নির্ধারণ করা মানুষের পক্ষে কঠিন হয়ে উঠছে।
অ্যালগরিদমের সাহায্যে সমাজমাধ্যমে মানুষের পছন্দকে চিহ্নিত করে সেটাকেই বার বার তার সামনে উপস্থিত করা হচ্ছে, যাতে প্রমাণ করা যায়— তার পছন্দটাই সত্য, বাকি সব মিথ্যা। অসত্য ও অর্ধসত্য তথ্যভান্ডার মানুষের চিন্তাচেতনার উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে।
আবার বিশ্ব জুড়ে ‘হীরক রাজা’রা কৃত্রিম মেধাকে মস্তিষ্কপ্রক্ষালনের (মগজ ধোলাই) যন্ত্র হিসাবে ব্যবহার করছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে। মানুষের মস্তিষ্কে তার নিজস্ব নান্দনিক ও রাজনৈতিক চেতনাকে মুছে দিয়ে নিজেদের তৈরি মতাদর্শ ও আখ্যানকে প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে মানবসমাজের প্রচলিত চেহারাটাকেই পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এটাকেই বলা হচ্ছে ডিজিটাল সমাজব্যবস্থা, এবং এই সমাজব্যবস্থার প্রায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পৃথিবীর বৃহত্তম কর্পোরেট পুঁজিপতিদের হাতে। এঁরা এতটাই শক্তিশালী যে, পৃথিবীর যে কোনও দেশের সরকারকেও নিজেদের ইচ্ছামতো প্রভাবিত করতে সক্ষম। ফলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অস্তিত্বই আজ চ্যালেঞ্জের মুখে।
স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে— সত্যিই কি এই ডিজিটাল সমাজব্যবস্থা মানবসমাজকে বিকশিত করছে, না কি তাকে ক্রমশ বিপন্ন করে তুলছে?
শেষাদ্রি বন্দ্যোপাধ্যায়, ভদ্রেশ্বর, হুগলি
সমন্বয় জরুরি
সোহম ভট্টাচার্য লিখিত ‘কী শিখবে, কেন শিখবে’ সম্পর্কে কিছু কথা। কৃত্রিম মেধার বিকাশ ও প্রয়োগেও দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন অপরিহার্য। কোনও পরিকল্পনা অনেকটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর যদি পুঁজির জোগানে ঢিলেমি দেখা দেয়, তা হলে বিভিন্ন স্তরে যে বিপুল ক্ষতি হয়, তা প্রায় অপূরণীয়।
আবার পুঁজির জোগান নিশ্চিত থাকলেও রাজনৈতিক ওঠাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে মূল কাজের অগ্রগতিতে প্রভাব পড়বে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সংশ্লিষ্ট বিভাগটির সঙ্গে ওই ক্ষেত্রের আর কোন কোন স্তরের মানুষ যুক্ত, প্রয়োজনে তাঁদের নিয়ে সমন্বিত আলোচনার পরিবেশ রয়েছে কি না— তা-ও বিবেচ্য।
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে এ ধরনের উদ্যোগ তখনই মসৃণ ভাবে সফল হতে পারে, যখন পরিকল্পনা, পুঁজি ও দক্ষ মানবসম্পদের মধ্যে সুসমন্বয় বজায় থাকে।
শান্তি প্রামাণিক, হাওড়া
চাকা ঘুরবে?
‘দাক্ষিণ্যের রাজনীতি’ (১৭-৩) শীর্ষক স্বাতী ভট্টাচার্যের প্রবন্ধটির সঙ্গে সহমত। একশো দিনের কাজ প্রকল্পটি ২০০৬ সালে তৎকালীন কেন্দ্রের ইউপিএ-১ সরকার চালু করেছিল। কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক, পশ্চিমবঙ্গে তখন এই প্রকল্প তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। এমএসপি-তে ধান ক্রয় বাম আমলেও চালু ছিল, তবে তা চলছিল ধীর গতিতে।
তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর এই দু’টি প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও কেন্দ্রের বঞ্চনার বিরুদ্ধে তীব্র প্রচারে অনেকটাই তা ঢাকা পড়ে গিয়েছে। দান, খয়রাতি ও প্রচার— এগুলিই এখন তৃণমূল সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রধান হাতিয়ার।
যে ভাবে চাষি, মজুর, নারী-পুরুষ, যুবক-যুবতী— অর্থাৎ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নানা ভাতা চালু হয়েছে, তাতে রাজ্যের পরিকাঠামো, পরিষেবা, বেকারত্ব ও সামগ্রিক উন্নয়ন প্রশ্নের মুখে পড়ছে। নেতাদের একাংশের কাছে এখন ভোটে জেতা ও ক্ষমতায় টিকে থাকাই মুখ্য, এবং রাজনীতি ক্রমশ পেশা হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে।
ভোটের স্বার্থে জনজাতি গোষ্ঠী, দলিত, খেতমজুর, দিন আনি দিন খাই শ্রমিক, নারীদের সামান্য ভাতার ‘সুরক্ষা’ দিলেই কি সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? ভোট আসছে। রাজনৈতিক দলের নেতারা প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু সত্যিই কি খেতমজুর, চাষি, শ্রমিক, দলিত, পরিযায়ী শ্রমিক এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘুরবে?
স্বপন আদিত্য কুমার বিশ্বাস, অশোকনগর, উত্তর ২৪ পরগনা