Indore

বিপদ‘ঘণ্টা’

সবার আগে দরকার পুর-কর্তৃপক্ষ ও জনপ্রতিনিধিদের নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থনা, ভুল স্বীকার করে নাগরিকদের সামনে ও পাশে নতমস্তকে দাঁড়ানো। পরিবর্তে ইন্দোর ও সারা ভারত দেখল, এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় মন্ত্রী ও বিধায়ক কৈলাস বিজয়বর্গীয় ক্ষিপ্ত হয়ে বলছেন, “আমার ঘণ্টা হয়েছে!”

শেষ আপডেট: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:২৬

যে  শহর টানা আট বছর দেশের সবচেয়ে পরিষ্কার শহরের খেতাব পেয়েছে, প্রতি বছর রিপোর্ট কার্ডে এত নম্বর পেয়েছে যে অন্য শহরের পুর-কর্তারা আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তাঁদের শহরকেও পথ দেখাতে, সেই ইন্দোরে দূষিত জল পান করে তেরো জনের মৃত্যু ও দু’শোর বেশি মানুষের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা স্তম্ভিত করে: এমন তো হওয়ার কথা নয়! পয়ঃপ্রণালীর বর্জ্য এসে মিশছে পানীয় জলে, যে কোনও পুর-কর্তৃপক্ষের কাছেই তা চরম দুঃস্বপ্ন। এখন, ছ’মাসের শিশু-সহ অনেকগুলি নাগরিক-মৃত্যু ও বিস্তর হইচইয়ের পরে বেরিয়ে পড়ছে নানা অসঙ্গতি: গত বছর অক্টোবরেই এক নাগরিক স্থানীয় নলকূপের জলে সমস্যা লক্ষ করে মেয়রকে জানিয়েছিলেন, নভেম্বরে আর এক জনও, এবং ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে বহু বাসিন্দা অভিযোগ করেন জলে তীব্র দুর্গন্ধের। তার পর কী হয়েছে তা তো চোখের সামনে, এবং পুরো ঘটনাতেই এটুকু স্পষ্ট যে, ইন্দোরের সংশ্লিষ্ট পুর-কর্তৃপক্ষ নাগরিক অভিযোগকে আমলও দেননি, সময়ে পদক্ষেপও করেননি। সাফাইকাজ থেকে নিকাশি, বাড়ি বাড়ি বর্জ্য সংগ্রহ থেকে তা পরিবহণ ও নিষ্কাশনের মাপকাঠিতে নজরকাড়া নম্বর পেয়ে যে শহর দেশের ‘ফার্স্ট বয়’, সেখানেই যখন এত অব্যবস্থা, তখন দেশের অন্য শহরগুলির কথা ভেবে আতঙ্ক জাগে।

পুর-কর্তৃপক্ষের গাফিলতির মূল্য যেখানে চোকাতে হল নাগরিকের মৃত্যু ও চরম দুর্ভোগে, সেখানে কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিত? অবিলম্বে পরিস্থিতির মোকাবিলায় পদক্ষেপ করা, মৃত ও অসুস্থদের ক্ষতিপূরণ তো নিশ্চয়ই— কিন্তু সবার আগে দরকার পুর-কর্তৃপক্ষ ও জনপ্রতিনিধিদের নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থনা, ভুল স্বীকার করে নাগরিকদের সামনে ও পাশে নতমস্তকে দাঁড়ানো। পরিবর্তে ইন্দোর ও সারা ভারত দেখল, এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় মন্ত্রী ও বিধায়ক কৈলাস বিজয়বর্গীয় ক্ষিপ্ত হয়ে বলছেন, “আমার ঘণ্টা হয়েছে!” অসুস্থেরা কেন চিকিৎসার টাকা পাচ্ছেন না, পরিষ্কার পানীয় জলের ব্যবস্থা কেন হচ্ছে না— এ-হেন প্রতিটি প্রশ্নের মুখে এক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির শরীরী ও মুখের ভাষাই প্রমাণ, নাগরিকের সুযোগ-সুবিধা ও পরিষেবার দিকে নজর দেওয়া দূরস্থান, নাগরিকের মৃত্যুতেও তাঁর কিছু আসে যায় না।

এই উদাহরণ নতুন নয়। বিজেপি জমানায় এ-হেন অভদ্র দুর্বিনয়ের শত দৃষ্টান্ত দেওয়া যাবে, যেখানে প্রতিটি ক্ষেত্রে নাগরিকের প্রতি জনপ্রতিনিধিদের দায়বদ্ধতার অভাবও ছাপিয়ে গেছে নাগরিকের প্রতি তাঁদের বিরক্তি, বিদ্বেষ, ঘৃণা। এই নেতারা ভাল করেই জানেন যে ক্ষমতাতন্ত্রের প্রভাবে এঁরা চরম ভুল করেও পার পেয়ে যাবেন; পদত্যাগ তো দূরস্থান, এমনকি সামান্য দুঃখপ্রকাশ করেও কাজ নেই— ক্ষয়ক্ষতি দুর্ভোগ মৃত্যু যা হবে তা সাধারণ মানুষের। তাই বিরোধীদের বারংবার প্রতিবাদকেও আমল দেওয়া হবে না; যে প্রধানমন্ত্রী অন্য সময় জল জীবন মিশন নিয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ, তিনি পর্যন্ত এ কাণ্ডে নীরব হয়ে থাকবেন। নেতারা ভাল জানেন— নাগরিকের প্রতি কোনও দায় নেই, চরম অকর্মণ্যতা ঘটলেও শাস্তির ছায়ামাত্র নেই: এমন ব্যবস্থায় ক’দিন চেঁচামেচিই সার, সব ‘স্বাভাবিক’ হওয়া সময়ের অপেক্ষা কেবল। অবিরাম স্বেচ্ছাচারের দেশে নাগরিকের বিপদঘণ্টা বেজেই চলেছে।

আরও পড়ুন