TMC Split

তাসের ঘর

২০২৬-এর অতি গুরুত্বপূর্ণ দু’টি বিধানসভা নির্বাচনের পরে ‘ইন্ডিয়া’ শিবিরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুই শরিক— পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস, এবং তামিলনাড়ুতে ডিএমকে— দু’ভাবে ছিটকে যাচ্ছে ইন্ডিয়া জোট থেকে।

শেষ আপডেট: ১০ জুন ২০২৬ ০৭:৪৯

বিধানসভায় ভাঙনের পর লোকসভাতে তৃণমূল কংগ্রেসে আড়াআড়ি ফাটল ধরা শুধু প্রত্যাশিত নয়, কার্যত অনিবার্য ছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠকে যোগ দিতে দিল্লিতে উপস্থিত, ঠিক সেই দিনই তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী’ সাংসদদের এনডিএ জোটে শামিল হওয়ার ঘোষণায় স্পষ্ট হয়ে গেল যে, ঘটনাটিকে শুধু দলের মধ্যে শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসাবে দেখা যাবে না। গত কয়েক বছরে দেশের অন্যান্য রাজ্যে বিজেপি যে মডেল অনুসারে কাজ করেছে, পশ্চিমবঙ্গেও তার প্রয়োগ ঘটল। মহারাষ্ট্রেই দু’টি বড় বিজেপি-বিরোধী দলে— শিবসেনা ও এনসিপি— ফাটল ধরেছে গত কয়েক বছরে। এবং, উভয় ক্ষেত্রেই যাঁরা দল ভেঙে বেরিয়েছেন, তাঁরা বিজেপির সঙ্গী হয়েছেন। দিল্লিতে আম আদমি পার্টির পরাজয়ের পর ফাটল ধরেছে সে দলেও— সাত সাংসদ যোগ দিয়েছেন বিজেপিতে। বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেসেও ভাঙন ধরেছে বার বার, এবং তাতেও ব্যতিক্রমহীন ভাবে লাভবান হয়েছে বিজেপি। এই প্রক্রিয়া শুধু রাজ্য স্তরেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৬-এর অতি গুরুত্বপূর্ণ দু’টি বিধানসভা নির্বাচনের পরে ‘ইন্ডিয়া’ শিবিরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুই শরিক— পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস, এবং তামিলনাড়ুতে ডিএমকে— দু’ভাবে ছিটকে যাচ্ছে ইন্ডিয়া জোট থেকে। তামিলনাড়ুতে কংগ্রেস টিভিকে-কে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ক্ষুব্ধ ডিএমকে ইন্ডিয়া জোট ছেড়েছে; আর তৃণমূল সাংসদদের একটি বড় অংশ সরাসরি বিজেপিকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন। যদিও সেই সংখ্যাটি কত, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে প্রশ্নাতীত যে, জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপি-বিরোধী পরিসরের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গিয়েছে।

এই ঝড়ের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে চলেছে জাতীয় স্তরে। এপ্রিলে সংসদে মহিলা সংরক্ষণ ও আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিলটি পাশ করাতে ব্যর্থ হয়েছিল এনডিএ— কারণ, সংসদের উভয় কক্ষে সম্মিলিত ভাবে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট না পেলে এ-হেন সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করানো যায় না। সে সময় লোকসভায় এনডিএ-র পক্ষে ভোট পড়েছিল ২৯৮টি, আর দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ছিল ৩৬২টি ভোট। তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদ এবং ডিএমকে-র সম্ভাব্য সমর্থন যোগ করলে এনডিএ-র পক্ষে লোকসভায় ভোটের সংখ্যা ৩৩০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাতেও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হবে না বটে, কিন্তু বাকি সমর্থন জোগাড় করা সহজতর হবে। ‘অপারেশন লোটাস’ এখানেই থামবে না, তা অনুমান করা চলে। বিশেষত, ওয়াইএসআর কংগ্রেস, উদ্ধব ঠাকরে-পন্থী শিবসেনা, শরদ পওয়ার-পন্থী এনসিপি-র মতো যে দলগুলির স্বল্পসংখ্যক সাংসদ রয়েছে, সম্ভবত সেগুলির দিকে নজর থাকবে। কংগ্রেসের অভ্যন্তরেও আরও ভাঙনের সম্ভাবনা থাকছে। তবে, সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী পর্যায়ে জাতীয় রাজনীতির হাওয়া যে ভাবে বইল, তাতে স্পষ্ট যে, সংবিধান সংশোধনের পথে বৃহত্তম বাধাটি অতিক্রম করতে বিজেপি ইতিমধ্যেই বহুলাংশে সফল।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছিল বিজেপি। তার পর মাত্র দু’বছরের মধ্যে বিরোধী পরিসরে এমন অভ্যুত্থান ঘটানোর জন্য এক অবিশ্বাস্য স্তরের রাজনৈতিক কৌশল প্রয়োজন হয়। বিজেপি তাতে সফল। তবে সেই সাফল্য ভারতীয় গণতন্ত্রের পক্ষে সুসংবাদ বহন করে না। নির্বাচনী গণতন্ত্রে হার-জিত থাকেই, এমনকি কোনও দলের সম্পূর্ণ মুছে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু, বিরোধী পরিসর ক্রমশ মুছে ফেলার এই কৌশল সমস্যাজনক। এর পিছনে যেমন বিরোধী দলের জনপ্রতিনিধিদের রাজনৈতিক সুবিধাবাদ রয়েছে, আদর্শগত দেউলিয়াপনা রয়েছে, তেমনই রয়েছে রাষ্ট্রশক্তির সুকৌশলী ব্যবহার। কারণ যা-ই হোক না কেন, ভারত ক্রমশ একদলীয় ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, এটাই এখন আশঙ্কা।

আরও পড়ুন