এই ভূভাগে দ্বিচক্রযান আর কোনও শৌখিনতা, আধুনিকতা বা যৌবনের গৌরবোজ্জ্বল ও জৌলুসময় অভিজ্ঞান নয়, তা এখন অন্ধকার সাম্রাজ্যের ধ্বজাবাহক, চলমান মৃত্যুদূতে পরিণত। তাই জেমস লং সরণির মতো ব্যস্ত রাস্তায় গভীর রাতে বাইকের গতি নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে দুই ডাক্তারি ছাত্রের ডাম্পারের চাকায় পিষ্ট হয়ে মৃত্যু শুধুই একটি ব্যতিক্রমী মর্মান্তিক দুর্ঘটনা নয়, চলতি বছরে প্রায় দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠতে চলা অকালমৃত মুখের সারির অংশ। পর দিনই একই এলাকায় ফের মৃত্যুর গ্রাসে বাইক-আরোহী। শুধু জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতেই শহর ও সংলগ্ন এলাকায় উপর্যুপরি বাইক-দুর্ঘটনায় দশের কাছাকাছি প্রাণহানি হয়েছে। বাগজোলায় খালপাড়ে বেপরোয়া গতির বলি এক তরুণ, মন্দিরবাজারে বিয়েবাড়ি থেকে ফেরার পথে মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই বাইক চালকের মৃত্যু। ক্ষতি তো কেবল একটি জীবনের নয়, প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে তছনছ হয়ে যায় তাঁর পরিবারও, ফলে পরিসংখ্যানে এই ক্ষয়কে মাপা সম্ভব নয়।
বেহাল রাস্তা, শীতকালে মধ্যরাতের ফাঁকা রাস্তা বা ভোরের কুয়াশা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায় সন্দেহ নেই, কিন্তু এই সকল মৃত্যুর মূল হোতা বেপরোয়া বাইক ও গাড়িচালনা। এবং আরও ভয়াবহ বিষয় হল তা ঘটে প্রকাশ্যে, অবাধে, পুলিশের চোখের সামনে। সিগন্যাল ভাঙা, অন্য লেনে ঢুকে পড়া, অতিরিক্ত গতি, এক বাইকে তিন-চার জনকে বসানো, হেলমেটে বিতৃষ্ণা, রাজপথকে রেসের ট্র্যাক গণ্য করা অব্যাহত; অন্য গাড়ি, বাস, অটো বা পথচারীর নিরাপত্তা নিয়ে তো কোনও ভাবনাই নেই। প্রশ্ন ওঠে, এত সাহস হয় কী ভাবে? তার মূলে কি পুলিশবাহিনীর চোখ বন্ধ রাখার নীতি, উৎকোচ-আনুকূল্যে বা আলস্যদোষে তাদের পরিচিতি হয়ে ওঠা ‘ছাড়-সংস্কৃতি’র দাক্ষিণ্যকে কি অস্বীকার করা যায়? পুলিশ থাকা সত্ত্বেও যখন আইন না-মানার এই দাপট, তবে তাদের উপস্থিতির অর্থটাই বা কী? কলকাতার রাজপথে বাইকবাহিনীর দৌরাত্ম্যের যে নিয়ন্ত্রণহীন দৃশ্য প্রতি দিন দেখা যায়, তা কোনও সভ্য শহরের পরিচয় বহন করে না। বরং, এখন পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে যে আরও মৃত্যুর খবর স্বাভাবিক এবং সময়ের অপেক্ষা বলেই আশঙ্কা হয়।
ট্র্যাফিক ব্যবস্থার দীর্ঘ দিনের নিষ্ক্রিয়তা এই প্রচণ্ড দুঃসাহসকে উৎসাহ দিয়েছে। গতি নিয়ন্ত্রক বলে কার্যত কিছুই নেই, রাতে বা বিশেষ দিনে নেশাগ্রস্ত গাড়িচালনা রুখতে প্রয়োজনীয় নিশ্ছিদ্রতা নেই, বিপজ্জনক চালনা রুখতে দৃশ্যমান অভিযানও নেই, নিয়ম ভাঙলে শাস্তির নিশ্চয়তা নেই। আইন অনুযায়ী হেলমেট না-পরলে জরিমানা ও লাইসেন্স বাতিলের নিয়ম থাকলেও তার প্রয়োগ নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। মাঝেমধ্যে পথ নিরাপত্তা সপ্তাহ, ‘সেফ ড্রাইভ সেভ লাইফ’ ইত্যাদির কাগুজে প্রচার, তার পর আবার সব নিয়ম ভাঙার আগের ‘স্বাভাবিক’ পথে ফিরে যায়। এই আতঙ্কের অমানিশার অবসানের জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক কঠোরতা। সিসিটিভি-নির্ভর স্বয়ংক্রিয় জরিমানা। রাতের শহরে বাড়তি পুলিশি উপস্থিতি এবং গতি নিয়ন্ত্রণে আচমকা টহল। হেলমেট ব্যবহারে আপসহীনতা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রয়োগ। কলকাতার রাস্তা থেকে আইনের ভয় উবে গিয়েছে। এই ভীতিকে ফিরিয়ে না-আনলে বাইকের মরণখেলা চলবে এ ভাবেই।