পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। —ছবি : সংগৃহীত
একের পর এক সঙ্কটে জর্জরিত ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলি। এ বার আবার পাকিস্তান, কেননা সেখানে বালুচিস্তান প্রদেশ আবারও প্রবল হিংসাগ্রস্ত। গত কয়েক দিন ধরে বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) এই অঞ্চল জুড়ে সমন্বিত হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে প্রধান শহর এবং প্রত্যন্ত জেলাগুলিতে আত্মঘাতী বোমা হামলা, বন্দুক হামলা এবং অগ্নিসংযোগ। হামলায় সেনা-সহ হতাহত হয়েছেন সাধারণ মানুষও। প্রত্যুত্তরে, পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী অভিযান চালিয়ে ১৫০ জনেরও বেশি বিএলএ জঙ্গিকে হত্যার কথা ঘোষণা করেছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ স্বীকার করেন, বালুচিস্তানের বৃহৎ আয়তন এবং সেখানকার সন্ত্রাসবাদীদের উন্নত অস্ত্রসম্ভারের কারণে তাদের সঙ্গে পেরে ওঠা পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও বিদ্রোহের সঙ্গে ভারতের নাম যুক্ত করতে ছাড়েনি পাকিস্তানি প্রশাসন। বলা বাহুল্য, বালুচিস্তানের এই অস্থিরতা নতুন নয়। কয়েক দশক ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতা এই অঞ্চলের বিশিষ্টতা, যার মূলে রয়েছে সরকারি নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি ও অনুন্নয়নের বিরুদ্ধে ক্ষোভ। প্রকৃতপক্ষে, এই সমন্বিত আক্রমণগুলি সেই অঞ্চলিক সমস্যাগুলিকে আবার জনসমক্ষে নিয়ে এল।
আয়তনের সূত্রে পাকিস্তানের বৃহত্তম এই প্রদেশটি ইরান ও আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী, আরব সাগরের সন্নিহিত হওয়ায় আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং সংযোগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। পাশাপাশি, প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, তামা, সোনা এবং বিরল মৃত্তিকা খনিজের উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে এই অঞ্চলে। এই সম্মিলনের জেরে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে বালুচিস্তানের। এ দিকে, বিএলএ-র এই আক্রমণকে আমেরিকা এবং চিনের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখছেন অনেকে, যে-হেতু উভয়েরই এখানে বিশেষ স্বার্থ জড়িত। গত বছরের শেষে বালুচিস্তানের প্রত্যন্ত চাগাই জেলার রেকো ডিক-এ সোনা ও তামা-সহ বিরল মৃত্তিকা খনিজের খনির জন্য ১২৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের কথা ঘোষণা করেছে আমেরিকা। এ দিকে চিন-পাকিস্তান ইকনমিক করিডর (সিপিইসি)-এর সূত্রে বালুচিস্তানের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে বেজিংয়ের কাছেও। মলাক্কা প্রণালীকে পাশ কাটিয়ে পশ্চিম এশিয়া থেকে চিনের জ্বালানি আমদানির পথগুলিকে সুরক্ষিত এবং সংক্ষিপ্ত করার জন্য সিপিইসি গড়ে তোলা হচ্ছে। কিন্তু এই অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান অশান্তি দুই রাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই ক্রমশ প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বালুচিস্তানের হিংসাত্মক ঘটনাবলি সঙ্কট ডেকে আনছে। বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তা এখন বড় অন্তরায়। অন্য দিকে, ইসলামাবাদের তরফে এই অস্থিরতায় ভারতকে যুক্ত করার চেষ্টা অব্যাহত, বিশ্বসমক্ষে নিরাপত্তার সমস্যা হিসাবে একে তুলে ধরার লক্ষ্যে। অথচ, গভীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণই যে বালুচিস্তানের এই অস্থিরতার মূলে, তা ক্রমশই স্পষ্ট হয়ে উঠছে বহির্বিশ্বের কাছে। এ সব সমস্যার যথাশীঘ্র সমাধান না হলে, ওয়াশিংটন এবং বেজিং— উভয়ের প্রতি পাকিস্তানের যে সব উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি, তার ভিতটিই নড়ে যাবে।