Central Government

নিয়ন্ত্রণের কৌশল

সরকার অবশ্য জাতীয় নিরাপত্তাকেই সংশোধনী প্রস্তাবের কারণ হিসেবে দেখিয়েছে। অবৈধ উপায়ে আসা অনুদান জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে ব্যবহৃত হচ্ছে, এমনই দাবি করেছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরণ রিজিজু।

শেষ আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:৫৫

সংসদের বাজেট অধিবেশনে বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইন (এফসিআরএ) সংশোধনী বিল (২০২৬) পাশ করানোর চেষ্টা থেকে পিছিয়ে এল কেন্দ্র। প্রধান কারণ অবশ্যই কেরলের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ক্ষতির আশঙ্কা। সে রাজ্যে খ্রিস্টানদের ধর্মীয় এবং সামাজিক সংগঠনগুলি এই আইনকে ‘সংখ্যালঘু-বিরোধী’ বলে অভিহিত করেছে। ভারতে ক্যাথলিক চার্চের শীর্ষ সংগঠন ‘ক্যাথলিক বিশপস কনফারেন্স অব ইন্ডিয়া’ এই সংশোধনীকে সংখ্যালঘুদের প্রতিষ্ঠানে ‘অযৌক্তিক হস্তক্ষেপ’ বলে মন্তব্য করেছে। বিশেষ ক্ষোভ দেখা দিয়েছে সংশোধনীতে প্রযুক্ত একটি ধারাকে নিয়ে, যার বলে কোনও সংগঠনের বিদেশি অনুদান পাওয়ার লাইসেন্স বাতিল হলে সেটির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারবে সরকার। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির ক্ষোভ, এই সংশোধনী কেন্দ্রকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিয়েছে, ফলে এটি যুক্তরাষ্ট্র-নীতির পরিপন্থী। এই আপত্তিগুলি অপ্রত্যাশিত নয়। বিদেশি অনুদান সম্পর্কিত আইনটি যে ভাবে প্রয়োগ করেছে নরেন্দ্র মোদী সরকার, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই ক্ষোভের ঝড় উঠেছে। আইনজীবী এবং সমাজকর্মীরা অভিযোগ করেছেন যে, এই আইনকে অসরকারি সংগঠনগুলির (এনজিও) বিরুদ্ধে অস্ত্রের মতো ব্যবহার করছে সরকার— কেন্দ্রের সমালোচনা করলেই বাতিল হচ্ছে আন্তর্জাতিক অনুদান পাওয়ার লাইসেন্স।

সরকার অবশ্য জাতীয় নিরাপত্তাকেই সংশোধনী প্রস্তাবের কারণ হিসেবে দেখিয়েছে। অবৈধ উপায়ে আসা অনুদান জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে ব্যবহৃত হচ্ছে, এমনই দাবি করেছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরণ রিজিজু। কিন্তু আইনের প্রয়োগে অস্বচ্ছতা কেন, সে প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছে সরকার। সিপিএম-এর রাজ্যসভার সাংসদ জন ব্রিট্টাসের অভিযোগ, কতগুলি অসরকারি সংস্থার এফসিআরএ লাইসেন্স খারিজ হয়েছে, কেন খারিজ হয়েছে, এফসিআরএ লাইসেন্স বাতিল হওয়ার রাজ্যওয়ারি নকশাটি কেমন— এ সব প্রশ্ন তিনি করেছিলেন সংসদে। কেন্দ্র উত্তর দেয়নি, যে-হেতু এ হল ‘গোপন’ তথ্য। আইনজ্ঞদের মতে, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার নামে কেন্দ্র বিপন্ন করছে বাক্‌স্বাধীনতাকে। এই অভিযোগ অমূলক নয়, কারণ দেখা যাচ্ছে যে মানবাধিকার, নারী-অধিকার, সংখ্যালঘুদের অধিকার, পরিবেশের সুরক্ষা— এই ক্ষেত্রগুলিতে কর্মরত অসরকারি সংস্থাগুলিই বিশেষ ভাবে এফসিআরএ লাইসেন্স হারিয়েছে। অনুদান বন্ধ করে সংস্থাগুলিকে নিষ্ক্রিয়, নীরব করতে চায় কেন্দ্র, নিয়ন্ত্রণ করতে চায় নাগরিক সমাজকে, এই আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এই আইনের ইতিহাসেই প্রোথিত রয়েছে গণতন্ত্র-বিরোধিতা। ইন্দিরা গান্ধীর সরকার ইমার্জেন্সির সময়কালে (১৯৭৬) আইনটি পাশ করেছিল। তবে মোদী সরকারের শাসনকালে এই আইনের প্রয়োগে অনুদান বাতিলের হার প্রত্যাশার সব মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছে। এফসিআরএ সংশোধনীর (২০২০) পরে কয়েক হাজার কোটি টাকার বিদেশি অনুদান হারিয়েছে ভারত। ২০২৬ সালের মার্চ মাস অবধি প্রায় বাইশ হাজার অসরকারি সংস্থা তাদের এফসিআরএ লাইসেন্স হারিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এগুলির প্রত্যেকটিই কি অবৈধ ভাবে মুদ্রা পাচার অথবা সন্ত্রাসের মদত দেওয়ার কাজে জড়িত? ‘জাতীয় নিরাপত্তা’-র জুজু দেখিয়ে সরকার নীরব। ফলে ক্রমে কেন্দ্র এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে একটি সংঘাত-বিন্দু হয়ে উঠেছে এফসিআরএ। সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলির অর্থের উৎস বন্ধ করা অবশ্যই একটি জরুরি কাজ। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, সে কাজ করার মতো যথেষ্ট আইনি ক্ষমতা কি সরকারের হাতে নেই? গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে সন্ত্রাস-নিয়ন্ত্রণের আইনের ধারা অকাতরে সরকার প্রয়োগ করেছে সমালোচনায় রাশ টানতে। এই নয়া সংশোধনী আপাতত প্রত্যাহার করাই উচিত। এটির যৌক্তিকতা সম্পর্কে নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞ মহলে যথেষ্ট আলোচনা না করে সংসদে তাকে পেশ করা চলে না।

আরও পড়ুন