বাবার সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার পথে ট্যাঙ্কারের ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছিল পাঁচ বছরের একরত্তি। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছিল, সেখানে কোনও ফুটপাত বা রাস্তা পারাপারের উপযুক্ত ব্যবস্থা ছিল না। অভিজ্ঞতা বলে, জনবহুল শহরগুলির রাস্তায় নাগরিকরা প্রায় প্রতিনিয়তই পথ-নিরাপত্তার অভাবের চরম মূল্য দিয়ে থাকেন। কিন্তু উপরোক্ত ঘটনাটি পৃথক ভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন এই কারণে যে, সংশ্লিষ্ট মামলার পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। জানিয়েছে, পথচারীদের জন্য নির্দিষ্ট ফুটপাত দিয়ে নিরাপদে হাঁটা নাগরিকের মৌলিক অধিকার। বিচারপতি পি এস নরসিংহ এবং বিচারপতি এ এস চান্দুরকরের বেঞ্চ মোটরচালিত যান চলাচলের চেয়েও এই অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছে। কেন এই অগ্রাধিকার, তার ব্যাখ্যাও উঠে এসেছে আদালতের বক্তব্যে— দীর্ঘ দিন ধরেই দেশের শহর-মফস্সলগুলি মূলত মোটরযানকে প্রাধান্য দিয়েই তৈরি হয়েছে। এক দিকে নিরাপদ ফুটপাতের অভাব, অন্য দিকে ক্রমবর্ধমান যানবাহনের সংখ্যাকে শীর্ষ আদালত বর্ণনা করেছে ‘সভ্যতার সমস্যা’ হিসাবে, যেখানে পথচারীরা চরম অবহেলিত। এই অসামঞ্জস্য দূর করতেই এই রায়।
প্রসঙ্গত, গত বছরও সর্বোচ্চ আদালত নাগরিকের বাধাহীন ভাবে ফুটপাত ব্যবহারের অধিকারকে সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত জীবনের মৌলিক অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে উল্লেখ করেছিল। বলেছিল, ফুটপাতকে প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষদেরও সহজে ব্যবহারের উপযোগী হতে হবে এবং জবরদখল মুক্ত রাখতে হবে। তার পরেও চিত্র পাল্টায়নি। খাস কলকাতায় রাস্তার পাশে ফুটপাতের উপস্থিতি নেহাতই খাতায়-কলমে। অসমান, খন্দযুক্ত, ক্ষেত্রবিশেষে আলোহীন সে ফুটপাত সুস্থ, সক্ষম পথচারীকেও ‘নিরাপদ’ যাতায়াতের আশ্বাস দেয় না। দুর্ঘটনা এড়াতে বাধ্য হয়ে তাঁদের যানবহুল পথে নামতে হয়। তদুপরি রয়েছে ফুটপাতে অস্থায়ী দোকান, হকারদের পসরা, যা অনেক ক্ষেত্রেই আইন মেনে চলেনি। ফুটপাতের দুই-তৃতীয়াংশকে হকারমুক্ত রাখার চেষ্টা পূর্বতন বাম ও তৃণমূল সরকারও করেছিল, বর্তমান সরকারও সে বিষয়ে উদ্যোগী হয়েছে। কিন্তু যথাযোগ্য সমাধানসূত্র এখনও অধরা। সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে যে ‘নিরাপদে হাঁটার অধিকার’-এ জোর দিয়েছে, তা পালন হবে কোন পথে?
আধুনিক শহরে মসৃণ যান চলাচলের জন্য চওড়া রাস্তা থাকবে, পথচারীদের নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য থাকবে প্রশস্ত ফুটপাত, সাবওয়ে, ফুটব্রিজের ব্যবস্থা। দুইয়ের মধ্যে উপযুক্ত ভারসাম্য রক্ষাই প্রশাসনের কর্তব্য। শুধুমাত্র নির্মাণ নয়, নাগরিকের স্বার্থে এগুলির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ চাই। কিন্তু ভারতের ক’টি শহরে সেই সদিচ্ছার প্রমাণ মেলে? ফুটপাতে হাঁটার অধিকারকে সরাসরি মৌলিক অধিকার বলা যায় কি না, তা নিয়ে অবশ্য বিতর্ক থাকবে। প্রবীণ কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশও যেমন এই প্রসঙ্গ তুলে ভোটাধিকারকে সংবিধানে মৌলিক অধিকার বলে ঘোষণার দাবি করে মৌলিক অধিকারের সংজ্ঞার প্রতি নির্দেশ করেছেন। তবে ‘মৌলিক’ হোক বা না-হোক, নিরাপদে ফুটপাত ব্যবহার এক গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক অধিকার। তা নিশ্চিত করে নাগরিক সুরক্ষার বিষয়ে রাজ্য প্রশাসনের উদ্যোগী হওয়ার সময় এসেছে।