আরাবল্লী পর্বতের পরিবর্তিত সংজ্ঞা আপাতত স্থগিত রাখল সুপ্রিম কোর্ট। আদালতেরই ২০ নভেম্বর তারিখের রায়কে স্থগিত রেখে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চ জানাল, নতুন বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে আরাবল্লী বিষয়ে নতুন ভাবে পর্যালোচনার পরই এই পর্বতের সংজ্ঞা স্থির করা যেতে পারে। ভারতীয় গণতন্ত্রের পরিপ্রেক্ষিতে শীর্ষ আদালতের এই স্বপ্রবৃত্ত হয়ে গ্রহণ করা মামলার গুরুত্ব বিপুল। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত উল্লেখ করেছেন আরাবল্লীর নতুন সংজ্ঞা বিষয়ে গণপরিসরে বিপুল আপত্তির কথা। অর্থাৎ, শাসন বিভাগ বা আইন বিভাগ কোনও অন্যায় আচরণ করলে সেটাই যে শেষ কথা নয়, গণপরিসরে যথেষ্ট আপত্তি তৈরি হলে শেষ পর্যন্ত তার প্রতিফলন ঘটতে পারে আদালতের সিদ্ধান্তেও— এই কথাটি দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করবে। বিশেষত এই ভয়ঙ্কর সময়ে, যখন সরকারের কর্মকাণ্ডে জনস্বার্থের গুরুত্ব ক্রমহ্রাসমান। বস্তুত, আরাবল্লীর ক্ষেত্রেই পাহাড়ের সংজ্ঞাবাচক উচ্চতা কত স্থির হবে, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রক ফরেস্ট সার্ভে অব ইন্ডিয়ার পরামর্শ অগ্রাহ্য করেছিল বলেই অভিযোগ। স্থানীয় ভূমিস্তর থেকে অন্তত একশো মিটার উচ্চতা হলে তবেই তাকে আরাবল্লী পর্বতমালার অংশ হিসাবে গণ্য করা হবে, এবং দু’টি পাহাড়ের মধ্যে ব্যবধান ৫০০ মিটারের বেশি হলে তা আরাবল্লীর অংশ হিসাবে গণ্য হবে না, এই দু’টি সিদ্ধান্তের ফলে আরাবল্লীর যে অপূরণীয় ক্ষতি হত, শীর্ষ আদালতের স্থগিতাদেশের ফলে তা অন্তত সাময়িক ভাবে আটকানো গেল। আশা করা যায়, আদালত যে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করবে, তা এই প্রশ্নগুলিকে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে— তার পর গৃহীত হবে সিদ্ধান্ত।
আরাবল্লী পর্বতমালা নিয়ে জন আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ দিনের। পাহাড়ে বেআইনি খনির বিরুদ্ধে ১৯৯০-এর দশকে আন্দোলন তীব্র হওয়ার ফলে সে অবৈধ কাজকর্ম বন্ধ হয়েছিল। তার এক-দেড় দশক পর থেকে ফের তা শুরু হতে থাকে। এখন পাহাড়ের নীচে থাকা খনিজের প্রতি বাণিজ্যিক লোভ রাষ্ট্রীয় সমর্থন পাচ্ছে, এবং সেই কারণেই পাহাড়ের সংজ্ঞা পাল্টে দেওয়ার এ-হেন প্রচেষ্টা বলে অভিযোগ। সুপ্রিম কোর্টের স্থগিতাদেশ দেখাল, প্রকৃত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নাগরিক প্রতিরোধ যদি জোরদার হয়, তবে সর্বশক্তিমান সরকারের অভিপ্রায়কেও ঠেকানো সম্ভব। কী ভাবে আরাবল্লী দখলের প্রশাসনিক চেষ্টা হয়েছে, তার আরও একটি উদাহরণ হল ‘তিন ডিগ্রি নিয়ম’। এই নিয়ম অনুসারে, কোনও ভূপ্রাকৃতিক গঠনের উন্নতি কোণ যদি অন্তত তিন ডিগ্রি হয়, তবেই তা পাহাড় হিসাবে গণ্য হওয়ার যোগ্য। বর্তমান পরিমাপে ‘আরাবল্লী ডিসট্রিক্ট’-গুলির সামগ্রিক গড় উন্নতি কোণ হিসাব করা হয়েছে। যেখানে এই জেলাগুলির অধিকাংশ অঞ্চলই সমতল, সেখানে গড় উন্নতি কোণ কম হওয়াই স্বাভাবিক। ফলে, ৩৪টির মধ্যে ১২টি জেলার নাম এই তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। আরাবল্লী দখল করার এই সরকারি অত্যুৎসাহ কেন, সে প্রশ্নের উত্তর বোধ হয় ভারতবাসীকে নতুন করে জানানোর প্রয়োজন নেই।
আরাবল্লীর ঘটনাক্রম ভারতীয় গণতন্ত্রের একটি গভীর উদ্বেগের জায়গাকে আরও স্পষ্ট করে দিল। পাহাড় ভেঙে খনি অথবা বহুতল আবাসন গড়ে তুললে কাদের লাভ, তা নিয়ে সংশয়ের কোনও অবকাশ নেই। কাদের ক্ষতি, সে কথাও একই রকম স্পষ্ট। ক্ষতি বাস্তুতন্ত্রের, এবং ক্ষতি সেই পাহাড়ের বাস্তুতন্ত্রের উপরে নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর, যাঁদের একটি বড় অংশ তফসিলি জনজাতিভুক্ত। তার বাইরেও, এই পাহাড় ধ্বংস হলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের একটি বড় অংশে মরুভূমি তৈরি ও প্রসারিত হবে, দূষিততর হবে বাতাস। যাঁর আর্থিক অবস্থা যত খারাপ, সেই বিপদের সঙ্গে লড়ার ক্ষমতা তাঁর ততই কম। এই ঘটনাক্রম দেখাল, এমন পরিস্থিতিতে সরকার কার পক্ষে থাকতে চায়।