আরও এক বার উমর খালিদ ও শরজিল ইমামের জামিনের আবেদন খারিজ হল। শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, বিচারপ্রক্রিয়া এখন যে পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে এই দু’জনকে জামিন দেওয়া যায় না। ২০২০ সালের দিল্লির সাম্প্রদায়িক হিংসায় চক্রান্তের অভিযোগে উমর ও শরজিলের সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া বাকি অভিযুক্তরা বিবিধ সময়ে জামিন পেয়েছেন; এই দফাতেও জামিন পেলেন পাঁচ জন। শীর্ষ আদালতের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা বজায় রেখেও কিছু প্রশ্ন তোলা ভারতীয় গণতন্ত্রের কর্তব্য। যে মামলায় বাকিরা জামিন পেতে পারেন, সেখানে এই দু’জনের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্তের পিছনে যে কারণ রয়েছে, তা ভারতীয় বিচারব্যবস্থার উদার দার্শনিক অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কি? বিশেষত, পাঁচ বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এই মামলায় চূড়ান্ত বিচারের ধারেকাছে পৌঁছনো যায়নি— ফলে, এই দীর্ঘ সময় তাঁরা কারাবন্দি রয়েছেন নিছক অভিযোগের ভিত্তিতে। শেষ বিচারে যদি তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হয়, তা হলে এই বন্দিত্ব তাঁদের অহেতুক শাস্তি হবে। প্রশ্নটি উঠছে, কারণ গত এক দশকে ইউএপিএ বা দেশদ্রোহ আইনের প্রয়োগ বেড়েছে প্রবল ভাবে। এক গবেষণাপত্রে দেখা যাচ্ছে, ২০১০-১৪’কে ভিত্তি ধরলে ২০১৪ থেকে ২০২০ অবধি প্রতি বছর ইউএপিএ-র অধীনে মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ২৮%। কিন্তু, ২০১৯-২০২৩’এর মধ্যে ইউএপিএ-র অধীনে গ্রেফতার হওয়া অভিযুক্তদের মাত্র ৩.২% দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। ৯৭ শতাংশ অভিযুক্ত হয় বেকসুর খালাস পেয়েছেন, বা বিচারপ্রক্রিয়া শুরুই হয়নি। উমর-শরজিলের জামিনের আবেদনকে কি এই পরিপ্রেক্ষিতে দেখা বিধেয় ছিল না?
উল্লিখিত পরিসংখ্যানে যে কথা স্পষ্ট, ভারতীয় গণতন্ত্র তা গত দশ বছরের অভিজ্ঞতাতেই জেনেছে— এই জমানায় শাসকরা ইউএপিএ বা দেশদ্রোহ আইনের মতো দমনমূলক আইনকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার কাজে ব্যবহার করেছেন। এই অবস্থায় বিচারপ্রক্রিয়ায় বিলম্ব যদি জামিনের আবেদন খারিজ করার কারণ হিসাবে বিবেচিত হয়, তা এক ভয়ঙ্কর ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে। কোনও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে তদন্ত করা, তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা ইত্যাদি ভার পুলিশ বা এনআইএ-সিবিআই-ইডি’র মতো সংস্থার হাতে। ‘খাঁচার তোতা’ এখন কতখানি বশ মেনেছে, তা নিয়ে সংশয়ের কোনও অবকাশই নেই। ফলে, সে সব সংস্থা কত দ্রুত বা কত শিথিল ভাবে তদন্ত করবে, তার উপরে শাসকের রাজনৈতিক প্রভাব প্রচুর। শ্লথ গতিতে চলা তদন্ত বা বিচারপ্রক্রিয়া যদি অভিযুক্তের জামিন খারিজের যথেষ্ট কারণ হিসাবে বিবেচিত হয়, তা হলে তা কেন্দ্রীয় শাসকদের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার মোক্ষম অস্ত্র হয়ে উঠবে কি না, গণতন্ত্রের স্বার্থেই সে কথা ভেবে দেখা প্রয়োজন। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালে ভারতীয় কারাগারগুলিতে প্রতি চার জন বন্দির মধ্যে তিন জনই বিচারাধীন ছিলেন— পরবর্তী তিন বছরে পরিস্থিতিটি পাল্টেছে, তেমন আশা করা কঠিন। অপরাধ প্রমাণ হওয়ার আগেই দীর্ঘ কারাবাসের বাধ্যবাধকতা নাগরিকের মানবাধিকার লঙ্ঘন কি না, শীর্ষ আদালতের কাছে সে প্রশ্ন করা বিধেয়।
মনে রাখা প্রয়োজন যে, কোনও মামলায় কাউকে জামিন দেওয়া মানেই তাঁকে নিরপরাধ ঘোষণা করা নয়। সুস্থ ও ন্যায্য বিচারপ্রক্রিয়ার শেষে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবশ্যই তাঁর শাস্তি হবে। কিন্তু, সেই বিচারের অপেক্ষায় কাউকে অনন্তকাল বন্দি না-রেখে তাঁকে জামিন দিলে সংবিধানের মূলগত অবস্থানটির প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয়— অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে সাজা দেওয়া চলে না। আশা করা যায়, উমর-শরজিলের ক্ষেত্রেও এই নীতি অনুসৃত হবে। আইনবিভাগ ও শাসনবিভাগ যখন ক্রমে আরও অগণতান্ত্রিক হয়ে উঠছে, সেই পরিস্থিতিতে গণতন্ত্র বিচারবিভাগেরই মুখাপেক্ষী।