নাম বদলে কি সত্যিই কিছু আসে যায়, বিশেষ করে সেই নাম যদি গঙ্গার দূষণ রোধের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়? এক দিকে উষ্ণায়নের কারণে ভারতের প্রধান নদীটির ক্রমশ ক্ষীণধারা হয়ে ওঠার আশঙ্কা, অন্য দিকে মাত্রাছাড়া দূষণের পরিপ্রেক্ষিতে গঙ্গাকে কলুষমুক্ত করার যে কোনও প্রকল্পে লক্ষ্যপূরণই শেষ কথা হওয়া উচিত। কিন্তু কেন্দ্র ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার সেই পথে ভাবে না। বরং দেখা গিয়েছে, পরিবেশ সংক্রান্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারি প্রকল্পের নামকরণ, কিছু সময় পর নাম পরিবর্তন, এবং বিশাল অঙ্কের বরাদ্দ ঘোষণার চমকটুকুই শুধু পড়ে থাকে। গঙ্গার ক্ষেত্রেও এই নাম বদলের খেলাটির অন্যথা হয়নি। পশ্চিমবঙ্গে যে সংস্থাটি গঙ্গার দূষণ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল, সেই ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট এনজিআরবিএ প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট গ্রুপ’ এখন থেকে ‘পশ্চিমবঙ্গ গঙ্গা পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করার প্রকল্প’ নামে পরিচিত হবে। জানা গিয়েছে, কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রকের নির্দেশিকার পরিপ্রেক্ষিতেই এ-হেন পরিবর্তন। বলা হয়েছে, এটি কেন্দ্রীয় বরাদ্দের স্বচ্ছতা এবং জাতীয় স্তরের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ পরিকাঠামো গড়ে তুলতে অপরিহার্য ছিল।
কিন্তু তাতে দূষণরোগ থেকে গঙ্গার মুক্তি মিলবে কি? গঙ্গাকে পরিশুদ্ধ রাখতে ১৯৮৬ সালে গৃহীত হয় ‘গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান’, কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে। কিন্তু দুর্বল নিকাশি পরিকাঠামো, সরকারি স্তরগুলির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, দূষণকারী শিল্পগুলির বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থার অভাবে সেই প্রকল্প সাফল্যের মুখ দেখেনি। অতঃপর ২০১৪ সালে বিজেপির কেন্দ্রে ক্ষমতাদখল এবং গঙ্গার পুনরুজ্জীবন নিয়ে স্বপ্ন দেখানোর শুরু। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বয়ং ‘গঙ্গা পুনরুজ্জীবন’ শব্দবন্ধটি যোগ করেন জলসম্পদ মন্ত্রকের নামে। এই বছরেই সূচনা হয় ‘নমামি গঙ্গে’ প্রকল্পের, যার জন্য বরাদ্দ হয়েছিল কুড়ি হাজার কোটি টাকা। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল নানাবিধ উচ্চাকাঙ্ক্ষী পদক্ষেপেরও। যেমন— প্রতি রাজ্যে গঙ্গার ধারে নির্দিষ্ট এলাকা চিহ্নিত হবে, যেখানে কোনও নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হবে না। গঙ্গায় যাতে সরাসরি বর্জ্য এসে না মেশে তার জন্য নদীর ধারের জেলাগুলিতে ব্যবস্থা করা হবে, ইত্যাদি। কিন্তু এত ঢাক পেটানো সত্ত্বেও রিপোর্ট বলছে, এক দশকেরও বেশি সময় পর মোট বরাদ্দের মাত্র ৬৯ শতাংশ অর্থ ব্যবহৃত হতে পেরেছে। গঙ্গাকে ঘিরে ধর্মীয় আবেগ উস্কে দেওয়ার প্রচেষ্টা যতখানি, দূষণমুক্তির ক্ষেত্রে তা নয়। রাজ্যগুলির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক, বিবিধ বিজ্ঞাপন, প্রকল্পে অকাতর অর্থবরাদ্দ সত্ত্বেও মূল সমস্যা কমেনি।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও অধিকাংশ নিকাশি শোধনাগার এখনও পূর্ণ ক্ষমতায় কাজ করছে না বিবিধ সমস্যায়। কলকারখানার বর্জ্য গঙ্গায় মেশা পুরোপুরি ঠেকানো যায়নি। ঘাট সংলগ্ন এলাকায় আবর্জনা জমা সমস্যারও মুক্তি মেলেনি। গঙ্গায় বিসর্জনের দূষণ রোধ করতে প্রশাসন তৎপর হলেও কলকাতার বাইরে অবস্থাটি এখনও আদৌ আশাপ্রদ নয়। এমতাবস্থায় প্রকল্পের নামে ‘পরিচ্ছন্নতা’ শব্দ জোড়ার নির্দেশটিকে ঠাট্টা বোধ হয়। গঙ্গার উপর পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের এক বিরাট অংশের মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। গঙ্গাকে ঘিরে সরকারি অর্থ ও সময়ের অপচয়ে তাঁদের অস্তিত্বটি বিপন্নতর হয়ে উঠছে। কাজ বহু বাকি। নাম বদলের প্রহসনটি ছেড়ে এ বার সে দিকে মন দেওয়া হোক।