Women Harassment

চেনা অস্ত্র

হিংসা-বিদ্বেষের এই রূপটি মোটেই অচেনা নয়, বরং এ এক বহু-ব্যবহৃত অস্ত্র। মহিলাদের বিরুদ্ধে তার প্রয়োগ আরও বেশি, এবং তা বেশি ‘কার্যকর’ও, কারণ ভারতীয় সমাজ মেয়েদের ‘চরিত্র’ সম্পর্কে যত স্পর্শকাতর, তাঁদের প্রতিভা বা কৃতিত্ব নিয়ে তত নয়।

শেষ আপডেট: ২৩ মার্চ ২০২৬ ০৬:৫৯

সাফল্য, মেধা, খ্যাতির উল্টো পিঠেই কি থাকে ঈর্ষা, বিদ্বেষ, অপবাদ? কেরল হাই কোর্টে এক অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে এফআইআর ও মামলা হয়েছিল, বিজ্ঞাপন ও চলচ্চিত্রে অশালীন অভিনয় করার ‘অভিযোগ’-এ। আদালত যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট আইন খতিয়ে দেখে রায়ে সেই অভিযোগ খারিজ করেছে, সঙ্গে বলেছে এ আসলে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে এক জন মহিলার চরিত্রহননের অপচেষ্টা, তাঁকে সমাজে তথা প্রকাশ্যে অপদস্থ করার চেষ্টা। এই সূত্রেই বিচারপতি উল্লেখ করেছেন ‘সামাজিক হিংসা’র— যখন কোনও মহিলার মেধা, কাজ, জনপ্রিয়তা বা সাফল্যকে কোনও ভাবে খণ্ডন বা অতিক্রম করা যাচ্ছে না, তখন ভিত্তিহীন ভাবে তাঁর চরিত্র কালিমালিপ্ত করাই সামাজিক হিংসা, এবং তা প্রবল অন্যায় ও অবিচারের নামান্তর।

হিংসা-বিদ্বেষের এই রূপটি মোটেই অচেনা নয়, বরং এ এক বহু-ব্যবহৃত অস্ত্র। মহিলাদের বিরুদ্ধে তার প্রয়োগ আরও বেশি, এবং তা বেশি ‘কার্যকর’ও, কারণ ভারতীয় সমাজ মেয়েদের ‘চরিত্র’ সম্পর্কে যত স্পর্শকাতর, তাঁদের প্রতিভা বা কৃতিত্ব নিয়ে তত নয়। কেরল হাই কোর্টের এই রায় বেরোল এমন এক সময়ে যখন দেশ জুড়ে নারী দিবস উদ্‌যাপন, মেয়েদের ক্ষমতায়ন নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক নানা মঞ্চ থেকে নানা বার্তা দেওয়া চলছে। তার গায়ে-গায়েই দেখা যাচ্ছে এই প্রবল বৈপরীত্য: নিজগুণ ও কাজের সুবাদে যে মেয়েরাই সফল, তাঁদের টেনে নামাতে চরিত্রহননের সহজ পথটি নেওয়া হচ্ছে। পর্দাসফল অভিনেত্রী থেকে নির্বাচনী আবহে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেত্রী— কেউই এ থেকে ছাড় পাচ্ছেন না, ‘সাধারণ মেয়ে’দের কথা নাহয় ছেড়েই দেওয়া গেল। আর্থ-সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে মেয়েদের চরিত্রহননের ভূরি উদাহরণ সমাজমাধ্যমে চোখে পড়বে; ব্যক্তিগত বিদ্বেষ থেকে রাজনৈতিক অভিসন্ধি যার চালিকাশক্তি।

মেয়েদের চরিত্রহননের এই কৌশলটি ক্ষমতাতন্ত্র ও পুরুষতন্ত্রের অতিপরিচিত ছক। এর মূলে আছে এই ভাবনা: মেয়েদের হাতে ক্ষমতা থাকবে না, থাকতে পারে না। স‘ক্ষমতা’ যখন একটি নারীকে রাজনীতি, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসন, সংস্কৃতির পরিসরে উদাহরণীয় ও জনপ্রিয় করে তুলছে, পুরুষতন্ত্র তা সহ্য করতে পারছে না। লক্ষণীয়, কেরল হাই কোর্ট এই দিকটিও উল্লেখ করেছে এই ভাবে— নারীদের ক্ষমতায়ন মানে তাঁদের সাধ্বী হতে হবে এমন নয়, এর অর্থ তাঁদের স্বকীয়তা, ইচ্ছা ও সাফল্যের ন্যায্য স্বীকৃতি। যখন এই স্বীকৃতি দেওয়া অপরিহার্য অথচ সহ্যাতীত হয়ে পড়ে, তখনই পুরুষতন্ত্রের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায় চরিত্রহনন। এই প্রসঙ্গেই এ কথাটিও বলা দরকার যে, সাফল্য বা কৃতিত্বের ধারণার নানা রূপ হতে পারে। রাজনীতির মঞ্চ বা রুপোলি পর্দার কৃতী নারী যে ভাবে আইন-আদালত, সমাজ-পরিকাঠামো ও জনসমর্থন পাবেন, সমাজের বিপুলসংখ্যক মেয়ে তা না-ও পেতে পারেন। অথচ এঁরাও রোজ মেধা ও শ্রম সহায়ে নিজেদের কাজ করে যাচ্ছেন ঘরে ও বাইরে— খেত-খামারে, কারখানায়, অফিসে, রাস্তায়। এই মেয়েদের সামাজিক দৃশ্যমানতা কম, খ্যাতি বা জনপ্রিয়তাও নেই, কিন্তু কুৎসা-কলঙ্কের ঝুঁকি এঁদের কিছুমাত্র কম নয়। তাঁদের অবমাননার ঘটনাগুলি হয়তো আদালতের দুয়ার অবধিও পৌঁছয় না। সামাজিক হিংসা থেকে এঁদের বাঁচাবে কে?

আরও পড়ুন