Women Reservation Bill Amendment

রাজনীতি সত্য

প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বলেছেন, এই বিল আটকে ‘ভ্রূণহত্যার মতো পাপ’ করেছেন বিরোধীরা।

শেষ আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:১২
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ফাইল চিত্র।

সবার উপরে রাজনীতি সত্য, এ কথায় কম-বেশি সব রাজনীতিকই বিশ্বাসী। তবে, এই বচনের উপরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিশ্বাসের জোর সম্ভবত অন্যদের চেয়েও বেশি। ফলে, সংসদে মহিলা সংরক্ষণ বিলের আড়ালে লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাসের অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তটি পাশ করিয়ে নিতে ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দিলেন, তার আদি মধ্য অন্ত জুড়ে বিরাজ করল শুধু রাজনীতিই। হিসাব করে দেখা গিয়েছে, তিনি নাকি মোট ৫৯ বার কংগ্রেসের নাম উল্লেখ করেছেন; তৃণমূল কংগ্রেস এবং ডিএমকে-র নাম উল্লেখ করে সমালোচনা করেছেন তাদের। বিজেপির নেতা হিসাবে নন, প্রধানমন্ত্রী হিসাবে যখন তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছেন, তখন এমন প্রকট রাজনীতি তাঁর আসনের পক্ষে শোভন কি না, নরেন্দ্র মোদীকে সে প্রশ্ন করা অর্থহীন— কারণ, তিনি রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠতে সক্ষম হয়েছেন, এমন উদাহরণ তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের এক যুগে নেই; গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তার আগের এক যুগের প্রসঙ্গ ঊহ্য রাখাই ভাল। অভিযোগ উঠেছে, পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুতে বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণ গণতান্ত্রিক শিষ্টতার সীমা উল্লঙ্ঘন করল। ধরে নেওয়া যায়, প্রধানমন্ত্রীর কাছে যে-হেতু রাজনীতিই মোক্ষ, ফলে নির্বাচনের মুখে এমন সুযোগ তিনি ছাড়েননি। গণতন্ত্রের একটি সীমা লঙ্ঘন করার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে অন্য একটি সীমা লঙ্ঘন করলেন তিনি, এই ঘটনাটিকে তিনি বা তাঁর রাজনীতির সমর্থকরা যথেষ্ট দুর্ভাগ্যজনক বলে বিবেচনা করেন না। ভারতীয় গণতন্ত্রের পক্ষে তা অবশ্যই সুসংবাদ নয়। দলের নেতা থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার জন্য ঠিক কত দিন সময় লাগে?

প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বলেছেন, এই বিল আটকে ‘ভ্রূণহত্যার মতো পাপ’ করেছেন বিরোধীরা। তাঁর শব্দচয়ন সর্বদাই সচেতন— ফলে, মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, তিনি নিজেকে দেশের মহিলাদের পক্ষে দেখাতে উদ্‌গ্রীব। দুর্জনের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে মহিলা ভোটারদের প্রশ্ন যে-হেতু অতি তাৎপর্যপূর্ণ, সেই কারণেই কি এই মুহূর্তে এই ‘নারীবাদী’ শব্দচয়ন? বিশেষত, প্রশ্নটি যখন আদৌ মহিলা সংরক্ষণের নয়— সে বিল ২০২৩ সালে সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়ে গিয়েছে— বরং, প্রশ্নটি আসন পুনর্বিন্যাসের, যাকেও মহিলা প্রশ্ন হিসাবে দেখানো হচ্ছে? কিন্তু, সে কূট প্রশ্ন আপাতত তোলা থাকুক। বরং, সন্ধান করা যাক যে, গত বারো বছরে এমন কোনও ঘটনা কি ঘটেছে, যাতে মনে হতে পারে, প্রধানমন্ত্রী আসলেই মেয়েদের পাশে দাঁড়াতে চান? যেমন, বিজেপিশাসিত রাজ্যে যখন ধর্ষণে অভিযুক্ত নেতাকে নিয়ে সমর্থকরা বিজয়মিছিল বার করেন, তখন তিনি তার নিন্দা করেছেন কি? আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের মুখ উজ্জ্বল করা মহিলা কুস্তিগিররা যখন বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে যৌন নিগ্রহের অভিযোগ করলেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে সেই নেতার শাস্তি চেয়েছিলেন কি? অথবা, লকডাউনের সময় মহিলা পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য কোনও বিশেষ ব্যবস্থার কথা ভেবেছিলেন তিনি? মণিপুরের নির্যাতিত মেয়েদের জন্য কি ব্যয় করেছেন এক ফোঁটা চোখের জল?

প্রশ্নগুলির উত্তর জানা। তিনি যে দলের সর্বোচ্চ নেতা, তার তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে মনুবাদী সমাজদর্শনের ভিত্তিতে। প্রধানমন্ত্রী আজ অবধি এমন একটি কাজও করেননি, যাতে মনে হতে পারে যে তিনি সেই কঠোর পুরুষতান্ত্রিক অনুশাসনের বাইরে পা ফেলতে আগ্রহী। এই মুহূর্তেও তাঁর অশ্রুধারায় মহিলাদের জন্য উদ্বেগ আছে, তেমন কথা বিশ্বাস করার তিলমাত্র কারণ নেই। তাঁর কাছে আর সবের মতো মহিলারাও রাজনীতির আয়ুধমাত্র। এই মুহূর্তে বিরোধীদের প্রতি আক্রমণ শাণাতে মহিলাদের কথা কার্যকর হতে পারে, অতএব তিনি তাঁদের নিয়ে আবেগমথিত। প্রধানমন্ত্রী সম্বন্ধে এই কথাটি ভারতকে বিশ্বাস করতে হচ্ছে, এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী-ই বা হতে পারে।

আরও পড়ুন