LPG Gas Crisis

হেঁশেল-বিপদ

এলপিজি সঙ্কটের কথা সরকারপক্ষও স্বীকার করছে। দেশের মোট এলপিজি চাহিদার ৬০ শতাংশের বেশি আমদানি করতে হয়, এবং তার সিংহভাগ আসে হরমুজ় প্রণালী দিয়ে। কয়েকটি এলপিজি-বাহী জাহাজ ভারতে পৌঁছেছে, কিন্তু বহু জাহাজ এখনও আটকে আছে।

শেষ আপডেট: ২৫ মার্চ ২০২৬ ০৬:০৪

আশঙ্কা সত্যি করে পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ঢুকে পড়ল ভারতের হেঁশেলে। আক্ষরিক অর্থেই। বাড়িতে রান্নার গ্যাসের সরবরাহে টান পড়তেই বহু পরিবারকে বিকল্প হিসাবে বেছে নিতে হচ্ছে কাঠকুটো অথবা কয়লার উনুন; অন্য দিকে, বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও হোটেল-রেস্তরাঁগুলিকে কেরোসিন, কয়লা বা কাঠকুটো ব্যবহারের অনুমতি দিতে হয়েছে। রাস্তাঘাটে অটোরিকশা বাড়ন্ত— গ্যাস স্টেশনের সামনে লম্বা লাইন; অনেকেই জানাচ্ছেন যে, অপেক্ষার পরও শেষ অবধি গ্যাস মেলেনি। এলপিজি সঙ্কটের কথা সরকারপক্ষও স্বীকার করছে। দেশের মোট এলপিজি চাহিদার ৬০ শতাংশের বেশি আমদানি করতে হয়, এবং তার সিংহভাগ আসে হরমুজ় প্রণালী দিয়ে। কয়েকটি এলপিজি-বাহী জাহাজ ভারতে পৌঁছেছে, কিন্তু বহু জাহাজ এখনও আটকে আছে। সরকার এখন এক দিকে গৃহস্থালির সরবরাহ বজায় রাখার উপরে জোর দিচ্ছে, অন্য দিকে কেরোসিনের জোগান বাড়িয়েছে। গোবর-কাঠকুটো ব্যবহারের মতো ক্ষতিকর পন্থাও সাময়িক ছাড়পত্র পেয়েছে। এই সব পদক্ষেপই এক ধরনের জরুরি পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। আরও গভীর উদ্বেগের বিষয়, গত এক দশকে যে জ্বালানি-রূপান্তরের পথে ভারত ধীর গতিতে হলেও এগোচ্ছিল— কাঠকুটো থেকে এলপিজি— তার বিপরীত অভিমুখে যাত্রা অন্তত সাময়িক ভাবে কার্যত অনিবার্য হয়ে উঠছে। স্বচ্ছ জ্বালানির পরিবর্তে আবার দূষণ সৃষ্টিকারী জ্বালানিতে প্রত্যাবর্তন কেবল পরিবেশের পক্ষে ক্ষতিকর নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও বিপজ্জনক। এই প্রত্যাবর্তন এখনও ‘সাময়িক’ বলেই বিবেচিত হচ্ছে— কিন্তু, মানুষের অভ্যাস এক বার পাল্টে গেলে তাকে সুস্থ পথে ফিরিয়ে কতখানি কঠিন, অভিজ্ঞতা সে কথার সাক্ষ্য দেবে।

এই পরিস্থিতিতে সরকারের প্রতিক্রিয়ায় বেশ খানিকটা অস্বচ্ছতা এবং অনিশ্চয়তা রয়েছে, যা বিপজ্জনক হতে পারে। সরকারপক্ষ এত দিন পরিস্থিতি লঘু করে দেখাতে চাইছিল— সোমবার লোকসভায় স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীই বিপদঘণ্টা বাজিয়ে দিলেন। বিশেষ করে অতিমারির প্রসঙ্গোল্লেখ মানুষকে আরও উদ্বিগ্ন করবে। তবে, প্রশ্ন উঠতে পারে যে, পাঁচ রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগেই এই আতঙ্ক-প্রকাশের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ‘মামেকং শরণং ব্রজ’-র বার্তা দিতে চাইছেন কি না। হরমুজ় প্রণালীর উপর অতি-নির্ভরতা, এলপিজি আমদানির উচ্চ হার— এই কাঠামোগত দুর্বলতাগুলি নতুন নয়। কিন্তু বর্তমান সঙ্কট দেখিয়ে দিচ্ছে, সেই দুর্বলতাগুলি মোকাবিলার যথেষ্ট প্রস্তুতি ছিল না। প্রধানমন্ত্রী বলার আগেই এই কথাটি সম্ভবত সাধারণ মানুষ নিজেদের মতো বুঝে নিয়েছিলেন— যে দেশে মানুষ গ্যাসের অভাবে বিকল্প জ্বালানি মজুত করতে শুরু করেন, সেখানে সরকারের উপরে মানুষের ভরসার পরিমাণ নিয়ে আর কোনও প্রশ্ন থাকে না।

এই পরিস্থিতিতে দ্বিস্তরীয় নীতি-প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন। স্বল্পমেয়াদে কর্তব্য, আপৎকালীন ব্যবস্থাপনা কার্যকর করা— জোগানশৃঙ্খল স্থিতিশীল রাখা; বাজারে যাতে আতঙ্কই চালিকাশক্তি হয়ে না দাঁড়ায় তা নিশ্চিত করা; এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নাগরিকদের কাছে স্বচ্ছ ও একমুখী বার্তা পৌঁছে দেওয়া। তথ্যের অস্পষ্টতা সঙ্কটকে আরও গভীর করে। কিন্তু এই স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থাই সরকারের একমাত্র কর্তব্য নয়। ভারতের শক্তি-নীতি বিষয়ে নতুন করে ভাবতে হবে— অত্যধিক আমদানি-নির্ভরতার ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে। কারণ, তেল বা গ্যাসের সরবরাহ পথ এখন যেমন অবরুদ্ধ হয়েছে, ভবিষ্যতেও তা হতে পারে। বিকল্প শক্তিকে কেবল পরিবেশ-নীতি নয়, কৌশলগত নিরাপত্তার অঙ্গ হিসাবে বিবেচনা করা জরুরি। শক্তি-নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ সেই দিকেই নিহিত। এই সঙ্কটকে সরকার সাময়িক ব্যতিক্রম হিসাবে দেখবে, না কি তা থেকে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত শিক্ষা নেবে, তা-ই নির্ধারণ করবে ভারতের ভবিষ্যৎ গতিপথ।

আরও পড়ুন