West Asia Issues

সংক্রামক অস্থিরতা

ভারতে ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করা হয়, যার একটি বড় অংশ পশ্চিম এশিয়া-নির্ভর। সেই সঙ্গে এলপিজি আমদানির সিংহভাগও এই পথ দিয়ে আসে। অর্থাৎ হরমুজ় প্রণালী কেবল একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ নয়; ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

শেষ আপডেট: ১১ মার্চ ২০২৬ ০৫:৫৩

পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমে প্রবলতর হয়ে ওঠা সামরিক সংঘাত এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে হরমুজ় প্রণালী বন্ধের ঘোষণায় পৌঁছয়নি। কিন্তু, সেই সম্ভাবনার ইঙ্গিতেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিসর গভীর ভাবে উদ্বিগ্ন। ইরানের তরফে এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করার হুঁশিয়ারি, উপসাগরীয় অঞ্চলে তেলবাহী জাহাজের গতি হ্রাস বা দাঁড়িয়ে থাকা— সব মিলিয়ে স্পষ্ট যে, আনুষ্ঠানিক ভাবে হরমুজ় প্রণালী বন্ধ করার ঘোষণার আগেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য-পরিবহণ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি-পরিবহণ পথ; প্রতি দিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং বিপুল পরিমাণ এলপিজি এই পথেই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছয়। সেই রফতানির ৮৪ শতাংশের গন্তব্য এশিয়া। ফলে যুদ্ধ আরও তীব্র হোক বা না-হোক, এই সামুদ্রিক করিডরে নিরাপত্তা-ঝুঁকি তৈরি হলেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, পরিবহণ খরচ ও বিমা প্রিমিয়াম, এবং বাণিজ্যিক সময়সূচির উপর তার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে। অশান্তির সূত্রপাতের পর জাহাজ চলাচল কমে যাওয়া, এবং অন্তত দেড়শো ট্যাঙ্কারের সমুদ্রে অপেক্ষমাণ থাকার খবরই সেই প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, এই অনিশ্চয়তার মাত্রাও ততই বাড়বে— আঞ্চলিক উত্তেজনা ক্রমে বৈশ্বিক সঙ্কটে পরিণত হবে।

ভারতে ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করা হয়, যার একটি বড় অংশ পশ্চিম এশিয়া-নির্ভর। সেই সঙ্গে এলপিজি আমদানির সিংহভাগও এই পথ দিয়ে আসে। অর্থাৎ হরমুজ় প্রণালী কেবল একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ নয়; ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ইতিমধ্যেই এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে, পেট্রল-ডিজ়েলের দাম নিয়েও অনিশ্চয়তা প্রবল। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কৃষি উৎপাদনের প্রশ্নও। ডিএপি বা এসএসপি সারের উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গন্ধকের বড় অংশ আমদানি হয় পশ্চিম এশিয়া থেকে। খরিফ মরসুমের গোড়ায় এই সরবরাহে বিঘ্ন কৃষি ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্য দিকে, অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক দাম যদি দ্রুত বৃদ্ধি পায়, তার অভিঘাত পরিবহণ ব্যয়, শিল্প উৎপাদন এবং খাদ্যদ্রব্যের মূল্যে ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগে না। অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করেছেন, তেলের দাম যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের আশেপাশে থাকে, তবে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিও উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়তে পারে। ভারতের ক্ষেত্রেও সেই চাপ স্পষ্ট হবে— কারণ জ্বালানি ও খাদ্য, উভয় ক্ষেত্রেই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি ভোক্তা মূল্যসূচকে প্রতিফলিত হয়। পাশাপাশি সমুদ্রপথে পরিবহণ ব্যয় এবং বিমা প্রিমিয়াম বাড়লে সময়-সংবেদনশীল রফতানি— কৃষিজ পণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বা ক্ষুদ্র শিল্পের উৎপাদন— আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এই পরিস্থিতিতে সরকারের ভূমিকা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে এখনও বেশ কিছু দিন চলার মতো তেল মজুত আছে বলে জানা গিয়েছে। আমেরিকাও ভারতকে আপাতত রাশিয়া থেকে তেল আমদানির ‘অনুমতি’ দিয়েছে— যদিও, ভারতের বাণিজ্য নীতির ক্ষেত্রে আমেরিকার ‘অনুমতি’-র প্রয়োজন পড়া সুখবর নয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ইতিমধ্যেই কিছু পদক্ষেপ করছে, কিন্তু সেগুলি মূলত তাৎক্ষণিক চাপ সামলানোর কৌশল। বৃহত্তর প্রশ্নটি কাঠামোগত— সীমিত কয়েকটি উৎস এবং কয়েকটি সঙ্কীর্ণ সামুদ্রিক করিডরের উপর অতিনির্ভরতা যে অর্থনীতির একটি স্থায়ী দুর্বলতা, তা আরও এক বার স্পষ্ট হল। আমদানির উৎস-বৈচিত্র, কৌশলগত জ্বালানি মজুত সম্প্রসারণ, বিকল্প সরবরাহ পথের উন্নয়ন এবং রফতানি-বাণিজ্যের পরিবহণ-সুরক্ষা— এই বিষয়গুলির নীতিগত পুনর্মূল্যায়ন এখন জরুরি। বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করার সাধ্য ভারতের নেই, কিন্তু তার অভিঘাত সামলানোর প্রস্তুতি নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

আরও পড়ুন