যে দেশ এআই-এ পেশিপ্রদর্শন করতে অতি ব্যস্ত, এবং এআই প্রতিশ্রুতির কিয়ৎ ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই প্রাপ্ত— সে দেশের কোনও রাজ্যের শিক্ষাপাঠক্রম থেকে যখন গণিত, রসায়ন, ভৌতবিজ্ঞানের জায়গা অনেকখানি কমিয়ে দেওয়া হয়, তখন তাকে কী বলা যায়? উত্তর হল— কালিদাস। বিস্ময়ের আর সীমা নেই দেখে যে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে স্কুলপাঠক্রমে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে এই বিষয়গুলির মান এক ধাক্কায় নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ জানিয়েছে, এই বিষয়গুলির ভার কমিয়ে বিজ্ঞান পড়তে ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহিত করতে বিজ্ঞানের অন্যান্য বিষয়ের উপর মাধ্যমিক-উত্তীর্ণদের ‘সাধারণ ধারণা’ তৈরি করা হবে, অনলাইন বা সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং যোগ করা হবে পাঠ্যক্রমে। কিন্তু, সে উদ্যোগের আগে প্রশ্ন করা প্রয়োজন— বিজ্ঞান-পাঠ্যক্রমে এমন ‘অনুৎসাহ’ কেন? দেড়-দুই দশক আগেও এ রাজ্যে বিজ্ঞান পড়ার বিপুল ঝোঁক ছিল ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান নিয়ে পড়ত প্রায় ৩ লক্ষ পড়ুয়া। ২০১৫ সালে সেই সংখ্যা কমে ৯৫ হাজারে দাঁড়াল। গত বছর মাধ্যমিক-উত্তীর্ণদের মাত্র চোদ্দো শতাংশ বিজ্ঞান নিয়ে ভর্তি হয়েছে। কেন এই দ্রুত অবনতি?
পশ্চিমবঙ্গে বিজ্ঞান শিক্ষার পরিস্থিতি কত বেহাল, তা বুঝতে হলে তাকাতে হবে সর্বভারতীয় চিত্রের দিকে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় বোর্ড সিবিএসই-তে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের প্রায় অর্ধেকই বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রী। কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের সমীক্ষায় প্রকাশ, তামিলনাড়ু, তেলঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশে অর্ধেকেরও বেশি ছাত্রছাত্রী উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে বিজ্ঞান পড়ছে। স্পষ্টতই, পশ্চিমবঙ্গে বিজ্ঞান শিক্ষায় অনাগ্রহের অন্যতম কারণ স্কুলগুলির পরিকাঠামোয় দুর্বলতা। তথ্য বলছে, পশ্চিমবঙ্গের দশটি স্কুলের চারটিতেও ল্যাবরেটরি নেই, জাতীয় গড়ের (৫৭%) চেয়ে যা অনেকটাই কম। রয়েছে শিক্ষকের অভাব। বহু স্কুলে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির পৃথক শিক্ষক পদ দেওয়া হয়নি, স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষকরাই একাদশ-দ্বাদশে পড়াতেন। ইতিমধ্যে নিয়োগ দুর্নীতির জেরে শিক্ষার সঙ্কট ঠিক কতখানি তীব্র হয়েছে, তার প্রকৃত চিত্র বোঝার মতো পরিসংখ্যান নেই। নানা সংবাদ প্রতিবেদন দেখাচ্ছে যে, বহু স্কুল শিক্ষকের অভাবে উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। গত বছর ‘ক্লাস্টার’ পদ্ধতিতে বিজ্ঞান পাঠের পরামর্শ দিয়েছিল উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ। অর্থাৎ যে সব স্কুলে রসায়ন বা গণিতের শিক্ষক রয়েছেন, সেখানে আশেপাশের স্কুলগুলির পড়ুয়ারা এসে ক্লাস করবে। যে স্কুলে ল্যাবরেটরি রয়েছে, সেখানে গিয়ে হাতে-কলমে কাজ করবে। এমন জোড়াতালি দেওয়া ব্যবস্থা ছাত্রছাত্রীদের ভরসা দিতে পারে না, তাতে সন্দেহ কী।
তবে সমগ্র দেশের সঙ্গে তুলনা করতে হলে, কেবল সংখ্যা নয়, গুণমানের কথাও উঠবে। উঠবে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিবদলের বিষয়টিও। নবপ্রবর্তিত ‘জাতীয় শিক্ষা নীতি’র ফলে বিজ্ঞানশিক্ষার বৃহত্তর চালচিত্র দ্রুত পাল্টাচ্ছে— বিজ্ঞানের গবেষণায়, সমাজে বৈজ্ঞানিক মানসিকতা তৈরিতে কেন্দ্রীয় সরকারের অনীহা প্রখর রৌদ্রের মতো স্পষ্ট। বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়গুলির পরিবর্তে ঐতিহ্য-নামধারী প্রাচীন ধারার দিকে অধিক মনোযোগে, প্রায়োগিক বিষয়ের দিকে ঝোঁক তৈরিতে, গবেষণার অর্থসাহায্য ও পরিকাঠামোর ন্যূনতায় এখন বিজ্ঞান শিক্ষার চত্বরে দেশব্যাপী সঙ্কট। এই পরিস্থিতিতে স্বল্পবিত্ত পরিবারের মেধাবী ছেলেমেয়েদের কি বিজ্ঞানশিক্ষায় উৎসাহ বোধ করার কথা? পাঠক্রমে, গবেষণার বিষয়ের উপর অযৌক্তিক নিয়ন্ত্রণ আরোপে কি বিজ্ঞানপড়ুয়াদের উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী হওয়ার কথা? ভবিষ্যৎ সমাজকে ক্রমেই বিজ্ঞান থেকে বিযুক্ত করে, আর যা-ই হোক, ভারতকে ‘বিকশিত’ করা অসম্ভব।