Special Intensive Revision

নীতি, না কৌশল?

কখনও আদালতের নির্দেশের অভিঘাতে, কখনও নির্বাচন কমিশনের অতিবিলম্বিত পুনর্বিবেচনায়, এই ভাবে ভোটার তালিকায় নাম তোলার নথি হিসাবে একে একে যুক্ত হয়েছে আধার কার্ড, মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড।

শেষ আপডেট: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৪:৪৪

গত কয়েক দিনের এসআইআর সংক্রান্ত ঘটনাবলি থেকে স্পষ্ট, কতকগুলি কথা ঠিক সময়ে বলা আর না-বলার মধ্যে পার্থক্য দুস্তর— ব্যবহারিক ও নৈতিক, উভয়তই। যদি যথেষ্ট সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনও মঙ্গলদায়ক কথা উচিত সময়ে না-বলে অনেক পরে বলা হয়, তা হলে পরে বলা কথাটি আর পূর্ণমাত্রায় নৈতিক থাকে না, বলাই যায়। দেশে এই মুহূর্তে ভোটার তালিকার যে বিশেষ নিবিড় সংশোধন চলছে, তার হালচাল দেখে মনে হয়, মানুষের দুর্ভোগ তৈরি করাই এর অন্যতম লক্ষ্য, নতুবা পরে এত বার শর্তগুলি সংশোধন করার অর্থ কী। লিখিত সুবিন্যস্ত নির্দেশ দেওয়ার চল যখন আছেই, তা না করে ওয়টস্যাপে নির্দেশ পাঠানো কেন— যে নির্দেশ সহজেই পাল্টানো যায়? ওই তালিকায় নাম না-উঠলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাগরিক পরিচয়ই বিপন্ন হবে, এই ভাবনার প্রকোপে পড়ে গত কয়েক মাস ধরে ভারতের অগণিত মানুষের দুর্ভাবনা, যন্ত্রণা, অসুস্থতা, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটেছে। তার পর শোনা গিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর পর্যবেক্ষণ— ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লেই নিজে নিজে নাগরিকত্ব চলে যায় না। ভোটার তালিকায় নাম যোগ হওয়া আর তালিকা থেকে নাম বাতিল হওয়া তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার একটি অংশ, তাই নিয়ে নাগরিকত্বের কোনও যোগ নেই। অথচ কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশনায় নির্বাচন কমিশন যখন বিভিন্ন রাজ্যে এই প্রক্রিয়া চালু করেছে, তখন থেকেই এই ভুল ধারণাটি ব্যাপক ভাবে চালু হয়েছে। এত দিনে তা জনসমাজের অন্দরে-কন্দরে প্রবিষ্ট। এমনকি উচ্চশিক্ষিত শহরবাসীও ধরে নিয়েছেন যে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ গেলে নাগরিক হিসাবে তাঁরা সকল সুযোগসুবিধা হারাবেন।

কখনও আদালতের নির্দেশের অভিঘাতে, কখনও নির্বাচন কমিশনের অতিবিলম্বিত পুনর্বিবেচনায়, এই ভাবে ভোটার তালিকায় নাম তোলার নথি হিসাবে একে একে যুক্ত হয়েছে আধার কার্ড, মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড। নতুন করে জানা গিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের নিযুক্ত মাইক্রো-অবজ়ার্ভারদের ক্ষমতার মাত্রা, ইআরও বা এইআরও-র দায়িত্বের ব্যাখ্যা, কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন সে বিষয়ে স্পষ্টতা, নিজে না-থাকতে পারলে অন্য কেউ নথি নিয়ে শুনানিতে যেতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে একের পর এক পরস্পরবিরোধী নির্দেশ। সমস্ত মিলিয়ে মানুষের কেবল নথি নিয়ে দুর্ভোগ পরিব্যাপ্ত হয়নি, সঙ্গে নথি ও পদ্ধতি বিষয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব-অস্পষ্টতা সমুদ্রসম দাঁড়িয়েছে। অথচ জাতীয় নির্বাচন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এই কাজ শুরু করার আগে স্পষ্ট প্রাঞ্জল ভাষায় লিখিত, সার্বিক ভাবে প্রযোজ্য নির্দেশ দিতেই পারত। মানুষের বাস্তব পরিস্থিতি অনুসারে নথির তালিকা দেওয়া যেত। পাশাপাশি, এও বিরাট দুর্ভাগ্য যে, ভারতের রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যেও এ নিয়ে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা বা ইচ্ছা অনুপস্থিত। নতুবা বিরোধী দলগুলি প্রথম থেকেই এসআইআর নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক ধারণাগুলি দূর করার কাজে আত্মনিয়োগ করতে পারত। এ কথা বললে ভুল হবে না যে, অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই এই উৎকণ্ঠা-রাজনীতির সুবিধা নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করেছে।

অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস মামলাটিতে মহামান্য বিচারপতিরা বলেছেন যে, নাগরিকত্ব বিচার নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ার নয়। প্রশ্ন ওঠে— কোনও রাজনৈতিক দল, বা সমাজের একাংশ থেকে যদি নির্দিষ্ট ভাবে এই মর্মে ভীতি ছড়ানোর উদ্যোগ দেখা যায়, তা হলে কমিশন কেন স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে এই বিভ্রান্তি দূর করবে না? কেন সুস্পষ্ট ঘোষণার মাধ্যমে মানুষকে আশ্বাস দেবে না? কমিশনের কাজ তো তালিকা সংশোধন, মানুষকে ভয় পাওয়ানো নয়। সে ক্ষেত্রে সীমান্ত পার করে দেওয়ার মর্মে যে লাগাতার হুমকি, তার সরকারি প্রতিবাদ হওয়া উচিত ছিল। পরিবর্তে দেখা গেল এক মহাসমুদ্রসম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।

আরও পড়ুন