Words in Geopolitics

শব্দের আড়ালে

লক্ষণীয়, প্রথম মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্প চিনকে এমন এক কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করতেন, যাকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মোকাবিলা করা প্রয়োজন ছিল।

শেষ আপডেট: ৩০ জুন ২০২৬ ০৮:০২

কখনও কখনও একটিমাত্র শব্দের অন্তর্ধান কোনও বড় নীতি-ঘোষণার চেয়েও বেশি কিছু প্রকাশ করতে পারে। তেমনই, ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’এর চেয়ে ‘এশিয়া’-কে প্রাধান্য দেওয়ার যে প্রবণতা বাড়ছে, তা কেবলই শব্দচয়নগত মনে হলেও ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে ভাষার ব্যবহার প্রায়শই কৌশলগত অভিপ্রায়ের ইঙ্গিত বহন করছে। আমেরিকার প্রতিরক্ষা বিভাগের সম্প্রতি ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’ (ইন্দোইউএসপ্যাকম)-এর নাম বদলে পুনরায় ‘প্যাসিফিক কমান্ড’ (ইউএসপ্যাকম) করার বিষয়টি ব্যাপক ভূ-রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ ভারত, কোয়াড এবং এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্য— তিনটির উপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে নানা মত। বিশেষত, ভারতের ক্ষেত্রে এর প্রভাব শব্দচয়নের গণ্ডি ছাড়িয়ে কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে, সেই নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণাটির জন্ম হয়েছিল একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে। পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেকার কৃত্রিম বিভাজন রেখা মুছে ফেলা, ভারতকে একটি কৌশলগত কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করা এবং বেজিংকে এই বার্তা দেওয়া যে পারস্য উপসাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলটিই আমেরিকার সমন্বিত নজরদারির আওতায় রয়েছে— এ সব লক্ষ্য নিয়েই এটি প্রণীত হয়েছিল। কিন্তু আমেরিকার সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্পষ্ট— সে যুগ আর নেই। পূর্ব ইউরোপ, পশ্চিম এবং পূর্ব এশিয়া— এই বিশাল অঞ্চল জুড়ে একই সঙ্গে সীমিত সামরিক সম্পদ মোতায়েন রাখতে গিয়ে পেন্টাগন সর্বত্র সমান ভাবে কৌশলগত সহযোগিতা বজায় রাখতে পারছে না। সে ক্ষেত্রে, আমেরিকার ‘ইন্দোইউএসপ্যাকম’-এর পরিচিতি সঙ্কুচিত করার বিষয়টি সামরিক সম্পদ আরও সুনির্দিষ্ট ভাবে ব্যবহারের প্রয়াসেরই ইঙ্গিতবাহী। লক্ষণীয়, প্রথম মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্প চিনকে এমন এক কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করতেন, যাকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মোকাবিলা করা প্রয়োজন ছিল। তবে দ্বিতীয় মেয়াদে বেজিংয়ের প্রতি এক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হচ্ছে, যেখানে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে অর্থনৈতিক বাস্তববাদ এবং শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যায়ের কূটনীতির উপর। অন্য দিকে, এই পরিবর্তনের কাঠামোগত প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট ‘কোয়াড’-এর ক্ষেত্রে। আমেরিকা, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে গঠিত জোটটিকে ‘মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক’ অঞ্চল বজায় রাখার প্রধান কাঠামো হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। সেই ধারণাটি ক্রমশ অন্তঃসারশূন্য বলে মনে হচ্ছে।

আশঙ্কা, আমেরিকার পুনরায় ইউএসপ্যাকম-এ ফিরে আসার বিষয়টি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরবচ্ছিন্ন সংহতি বিষয়ক ধারণার সমাপ্তি ঘটিয়ে এক অধিকতর খণ্ডিত ও লেনদেন-ভিত্তিক সামুদ্রিক ব্যবস্থার সূচনা করতে চলেছে। সে ক্ষেত্রে উদ্ভূত পরিস্থিতিকে ভারতের কোনও বিপর্যয় বা পরিত্যাগ হিসেবে ভাবা উচিত নয়। বরং সময় এসেছে উপযুক্ত পদক্ষেপ করা— নৌবাহিনীর দ্রুত সম্প্রসারণ, আরও তীক্ষ্ণ কূটনীতি এবং এমন এক বিদেশনীতির অবলম্বন, যা বাইরের কোনও নিশ্চয়তার প্রত্যাশার চেয়ে আত্মনির্ভরশীলতার উপর প্রতিষ্ঠিত। ভারতকেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যে মহাসাগরকে সে নিজের বলে মনে করে, সেখানে সে ঠিক কী ধরনের শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।

আরও পড়ুন