West Bengal Assembly Election Results 2026

একচ্ছত্র অভিমুখে

এই নির্বাচনের ফলে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বিজেপি-বিরোধী রাজনীতির চেহারা। বিরোধী অক্ষ ‘ইন্ডিয়া’ কি এর ফলে অনেকাংশে দুর্বল হয়ে পড়ল?

শেষ আপডেট: ০৬ মে ২০২৬ ০৭:০২

পশ্চিমবঙ্গে এ বারের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের গুরুত্ব সুদূরপ্রসারী— ভারতের জন্য। এই দেশের রাজনীতির একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ হল ৪ মে, ২০২৬— বললে অত্যুক্তি হবে না। একান্ন বছর বাদে রাজ্যে ও কেন্দ্রে একই দল সরকারে। একই সঙ্গে, এ বারের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে ঘটল ডিএমকে-র প্রবল পরাজয়— বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিনকে ক্ষমতাচ্যুত করে এ বার নবাগত বিজয় রাজ্য-নেতৃত্বে অভিষিক্ত হতে চলেছেন। দু’টি ঘটনাই অতীব উল্লেখযোগ্য। গত কয়েক দশকে ভারত দেখেছে, সর্বভারতীয় রাজনীতির পাশাপাশি আঞ্চলিক রাজনীতির তুমুল উত্থান। আঞ্চলিক আশা-আকাঙ্ক্ষা, সামাজিক শ্রেণি, ভাষা ও সংস্কৃতির অস্মিতার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন প্রদেশে বিভিন্ন দল সর্বভারতীয় দলগুলির সঙ্গে পাল্লা দিয়েছে, এবং বহু ক্ষেত্রে তাদের কোণঠাসা করতে পেরেছে। গত সাড়ে তিন দশকে রাজনৈতিক মানচিত্রের উল্লেখযোগ্য বিষয়ই ছিল দেশের মূল রাজনীতিতে আঞ্চলিক স্বার্থের স্বতন্ত্র স্থান ও কণ্ঠ তুলে ধরার পরিসর। ক্রমশ পরিস্থিতি পাল্টেছে, গত কয়েক বছরে সেই রাজনীতির চালচিত্রে চিড় ধরেছে ভারতীয় জনতা পার্টির প্রবল অভিযানের ফলে। মায়াবতী, লালুপ্রসাদ যাদব ও তাঁর পুত্র তেজস্বী যাদব, মুলায়ম সিংহ ও তাঁর পুত্র অখিলেশ, চন্দ্রশেখর রাও, নবীন পট্টনায়ক, নীতীশ কুমার— ক্রমান্বয়ে রাজপাট হারিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা হারিয়ে বাম শক্তিও অতি দুর্বল অবস্থায়। পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তামিলনাড়ুতে স্ট্যালিন বিজেপির বিরুদ্ধে আঞ্চলিক প্রতিস্পর্ধার দুই মুখ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। দুই রাজ্যে ২০২৬ সালের ভোটে তাঁদের দুই জনেরই বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক রাজনীতির এই অধ্যায় মোটের উপর সমাপ্ত হল, যদিও তামিলনাড়ুর নবাগত বিজয়ী নেতা ঠিক কোন রাজনৈতিক অবস্থানবিন্দু নিজের জন্য বেছে নেবেন, তা এখনও দেখার।

এই নির্বাচনের ফলে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বিজেপি-বিরোধী রাজনীতির চেহারা। বিরোধী অক্ষ ‘ইন্ডিয়া’ কি এর ফলে অনেকাংশে দুর্বল হয়ে পড়ল? না কি এর ফলে কংগ্রেসের অবস্থানই পাল্টাতে চলেছে— কেননা গত দুই বছরে এই জোটের মধ্যে কংগ্রেসের পাশাপাশি যে বিকল্প ভরকেন্দ্র গড়ে উঠেছিল, যার মূল কেন্দ্রেই ছিলেন মমতা— তার পশ্চাদপসরণ অবধারিত হয়ে উঠল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেবল দলগত ভাবে নয়, ব্যক্তিগত ভাবেও এ বার পরাজিত; সুতরাং সেই বিকল্প এখন অতীত। আবারও কি বিজেপি-বিরোধী পরিসর বর্তমানে ছয়টি রাজ্যের শাসক কংগ্রেসকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠবে? না কি বিরোধী পরিসর বলতে যা কিছু, এই গৈরিক ভারতে তা-ও এখন অতীত হওয়ার পথে?

‘গৈরিক ভারত’ শব্দবন্ধটি আলঙ্কারিক নয়। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রী আসনগ্রহণের সময় ২২ শতাংশ ভারতবাসী রাজ্যস্তরে বিজেপি শাসনে ছিলেন। সেই সংখ্যা বারো বছরে বেড়ে ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০১৪ সালে ৭টি রাজ্যের জায়গায় ২০২৬ সালে ২২টি রাজ্য বিজেপির অধীন হয়েছে। ২০১৪ সালে বিজেপি-শাসিত ভূখণ্ড ছিল ভারতের ৩৪ শতাংশ, ২০২৬ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৭৬ শতাংশে। অর্থাৎ দক্ষিণের কিছু অংশ বাদ দিয়ে ‘এক ভারত’ নির্মাণের প্রয়াস আজ এ দেশে অনেক দূর অগ্রসর। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ১৯৭০-এর দশকের পর আবার এমন ভাবে একচ্ছত্রে বাঁধা পড়ল দেশের তিন-চতুর্থাংশের বেশি। তবে কিনা, বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ বিজয়ের মাহাত্ম্যকে কোনও সংখ্যায় ধরা যায় না। স্বাধীনতার পর প্রথম বার দুর্জয় বঙ্গভূমিকে ক্ষমতার কুক্ষিতে এনে, অসম-ত্রিপুরার সঙ্গে এক রেখায় ফেলে বিজেপি এখন প্রথম বার দেশের পূর্ব সীমান্তের একক নিয়ন্ত্রক। এবং তার সঙ্গে, ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বর্তমান অবতারের প্রথম ও প্রধান ধারক-বাহক।

আরও পড়ুন