Hindutva

আগ্রাসন সংস্কৃতি

গণতান্ত্রিক নির্বাচনী পরিবর্তনের সম্ভাবনাসূত্রে একটি কথা মাঝেমধ্যেই শোনা যায়: সরকার পাল্টানো আর বড় কথা কী, যেখানে সমাজই ভিতর থেকে পাল্টে গিয়েছে।

শেষ আপডেট: ০২ মার্চ ২০২৬ ০৭:০৯

পর পর ঘটে গেল দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে কতকগুলি চূড়ান্ত অপ্রীতিকর ঘটনা, হিন্দুত্ব ব্রিগেডের আস্ফালন ও আগ্রাসন। তার জেরে অশান্তি ও সংঘর্ষ ঘটায় দিল্লি পুলিশের হাতে গ্রেফতার বড় সংখ্যক ছাত্রছাত্রী। জেএনইউ-এর উপাচার্য দলিত ও আদিবাসী বিরোধী আপত্তিজনক মন্তব্য করায় ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবাদ মিছিল বার করে, এবং রোহিত ভেমুলা আইন অনুযায়ী ঘটনার প্রতিকার দাবি করে। প্রতিকারের প্রশ্নই ওঠেনি, বরং তার পর নেমে আসে প্রতিবাদ-নিষ্পেষণ। কিছু কাল আগেই ঘটেছে আর একটি ঘৃণ্য ঘটনা। ইতিহাসবিদ এস ইরফান হাবিব যখন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন, তাঁর গায়ে জল ঢেলে তাঁকে উত্ত্যক্ত করা হয়, যা আসলে ইতিহাস চর্চার প্রচলিত উদারবাদী ধারার উপরই আক্রমণ, এবং তাঁর সংখ্যালঘু পরিচিতির প্রতি ধাবিত। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন নিয়মিত একের পর এক আলোচনাসভা শেষ মুহূর্তে বাতিল করে দেওয়ার চল শুরু হয়েছে, কেননা প্রস্তাবিত আলোচ্য বিষয়বস্তু যদি হিন্দুত্বের ব্রিগেডের সায় না থাকে, তা হলে তা ছাড়পত্র পায় না। একমাত্র যা কিছু সেই ব্রিগেড সত্য ও শ্রবণযোগ্য বলে মনে করে, সেটুকুই যখন আলোচ্য— এই ব্যবস্থাটিকে ফ্যাসিজ়ম না বলেও উপায় থাকে না। লক্ষণীয়, কেবল মুসলমান-বিরোধিতা নয়, দলিত-বিরোধিতাও এখন হিন্দুত্বের ব্রিগেডের ঘোষিত লক্ষ্য, এবং প্রাত্যহিক কার্যক্রমের ভিত্তি। এই কারণেই রাজধানীর দু’টি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাপদ্ধতি ও পাঠ্যক্রমের উপর, এবং ছাত্রসমাজের উপর, বারংবার হিন্দু-ফ্যাসিবাদী আক্রমণ নেমে আসছে। সম্প্রতি প্রতিটি ঘটনার মধ্যেই দেখা যাচ্ছে ধর্মভিত্তিক ও জাতভিত্তিক বিদ্বেষের চিৎকৃত প্রকাশ— যা দশ বছর আগে এই মানের সারস্বত প্রতিষ্ঠানে চিন্তার অতীত ছিল। মোদীশাসিত ভারতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি কত গভীর ভাবে পাল্টে গিয়েছে, এই দু’টি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকালেই তা বিলক্ষণ স্পষ্ট হয়।

গণতান্ত্রিক নির্বাচনী পরিবর্তনের সম্ভাবনাসূত্রে একটি কথা মাঝেমধ্যেই শোনা যায়: সরকার পাল্টানো আর বড় কথা কী, যেখানে সমাজই ভিতর থেকে পাল্টে গিয়েছে। হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসনের ক্ষেত্রে এখন ভারত ঠিক এই বিন্দুতে পৌঁছে গিয়েছে। এখন এই তাণ্ডব, হিংসা কিংবা আক্রমণাত্মক ব্যবহারের জন্য রাজনৈতিক নেতা বা জনতার দিকে তাকাতে হয় না, সমাজের নিজস্ব পরিসর থেকেই তা উঠে আসে। এই সমাজই এখন অসহিষ্ণুতার প্রধান বাহক, বৈষম্যের উল্লাসে গ্রস্ত, আক্রমণের উত্তেজনায় মত্ত। কেবল ভারত নয়, বৈশ্বিক ভাবেই এই দক্ষিণপন্থী কর্তৃত্ববাদ ও অসহিষ্ণু বৈষম্যবাদের সামাজিক রমরমা এখন, যার সঙ্গে সরাসরি তুলনা টানা হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইউরোপের, আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগের সামাজিক-রাজনৈতিক চালচিত্রের।

আবার ইতিহাসবোধই বলে দেয় যে, ওই সময়ের সঙ্গে এখনকার সরাসরি বিচারও চলে না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপের বহু দেশকেই অর্থনৈতিক ভাবে খাড়া খাদের কিনারে দাঁড় করিয়ে দেয়, যার থেকে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বা ফ্যাসিজ়ম উগ্র রূপে উৎসারিত হয়। একবিংশ শতকের বিশ্ব কিংবা ভারত, কোনও ক্ষেত্রেই সেই তুলনা সরাসরি প্রযোজ্য নয়। তবে অন্য এক দিক দিয়ে এই দুই শতকান্তর ছবির কিছু সাদৃশ্য লক্ষণীয়— সমাজের সামূহিক অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা, এবং তজ্জনিত ‘অপর’-আতঙ্কের মধ্যে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফলে সৃষ্ট বিশ্ব-অর্থনৈতিক পরিবর্তন। এই প্রেক্ষিতেই দিল্লির বিশ্ববিদ্যালয়ে তরুণ ছাত্রছাত্রীদের পুলিশ ভ্যানে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার উপর্যুপরি ছবি সংবাদমাধ্যমে, সমাজমাধ্যমে ভেসে উঠে মনে করিয়ে দেয় যে, কত বহুমাত্রিক জটিল পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ভারতীয় সমাজের বৈচিত্রমণ্ডিত বহুসংস্কৃতিবাদ আজ আক্রান্ত, এবং আত্মরক্ষণের মরিয়া সংগ্রামে প্রত্যহ ধ্বস্ত।

আরও পড়ুন