সাম্প্রতিক কালে ভূরাজনীতিতে চাপ যেন পিছু ছাড়ছে না ভারতের। পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতার মাঝে এ বার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর বৈঠক উদ্বেগ বাড়াচ্ছে সেবা তীর্থের (পূর্বের সাউথ ব্লক) অলিন্দে। লক্ষণীয়, ট্রাম্পের এ-হেন সফরটি অনুষ্ঠিত হল শুল্ক, ইরান-আমেরিকা সংঘাত এবং তাইওয়ানের মতো বিবিধ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ওয়াশিংটন ও বেজিংয়ের মধ্যে কয়েক মাসব্যাপী উত্তেজনার পর। সফরকালে দুই তরফে যে ধরনের পদক্ষেপ করা হল, তাতে স্পষ্ট দুই বৃহৎ শক্তিই আরও স্থিতিশীল একটি সমীকরণের অন্বেষণে আগ্রহী। এখন, আমেরিকা ও চিন যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সমঝোতার পথে অগ্রসর হয়, তবে এশিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে ভারত যে কৌশলগত সুবিধা পায়, তা হারাতে পারে।
বস্তুত, ভারতের উদ্বেগের কারণ একাধিক। ২০০০ সাল থেকে ভারতের ভূ-রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ আমেরিকা ও চিনের মধ্যে চলমান উত্তেজনার উপর নির্ভরশীল থেকেছে, যা নয়াদিল্লিকে বেজিংয়ের বিরুদ্ধে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের এক অগ্রণী প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু দুই রাষ্ট্রই যদি সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে শুরু করে, তবে আগামী দিনে আমেরিকার কৌশলগত হিসাবে ভারতের গুরুত্ব হ্রাস পেতে পারে। উদ্বেগটি আরও তীব্র হয় যে-হেতু ভারত ও চিন সরাসরি অর্থনৈতিক প্রতিযোগী। চিনের পণ্যের উপর শুল্ক শিথিল হলে বা সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হলে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা ভারতের উদীয়মান সক্ষমতার চেয়ে চিনের প্রতিষ্ঠিত পরিকাঠামো এবং উৎপাদন ব্যবস্থাকে বেশি পছন্দ করতে পারে, যা কোনও মতেই চাইবে না দিল্লি। তা ছাড়া, ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা হরমুজ় প্রণালী দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন হাইড্রোকার্বন প্রবাহের উপর নির্ভরশীল, যা আজ আমেরিকা-ইরান উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক প্রতিবন্ধকতার কারণে ঝুঁকির মুখে। ট্রাম্প যদি অর্থনৈতিক ছাড়ের বিনিময়ে তেহরানের উপর বেজিংয়ের দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে তাঁর চিন সফরকে ব্যবহার করেন, তা হলে যে কোনও আলোচনাভিত্তিক ব্যবস্থায় ভারতকে একঘরে করে দেওয়া হতে পারে। সমস্যা রয়েছে আরও। নয়াদিল্লি দীর্ঘকাল আশা করে এসেছে যে, চিনের প্রতি আমেরিকার বিরূপ মনোভাব পাকিস্তানের প্রতি বেজিংয়ের সামরিক-অর্থনৈতিক সমর্থনের উপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপিত হবে। এমতাবস্থায় আমেরিকা-চিন সম্পর্ক উষ্ণ হলে তা কাশ্মীরের মতো সংবেদনশীল নিরাপত্তা বিষয়ে ভারতকে ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আরও বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে।
ফলে, আগামী দিনে আমেরিকা-চিন সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি পরিবর্তিত হলে ভারতকেও তার ভূ-রাজনৈতিক কৌশলে বৈচিত্র আনতে হবে। সে ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলির সংগঠন এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের মধ্যম শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা ওয়াশিংটন বা বেজিংয়ের উপর নির্ভরশীলতা কমাতে সাহায্য করতে পারে। ভারতের জন্য এখন চ্যালেঞ্জ শুধু চিনকে সামলানো কিংবা আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা নয়, বরং এমন এক বিশ্বব্যবস্থার জন্য প্রস্তুত হওয়া, যেখানে দুই মহাশক্তি হয়তো সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে ভারতের চেয়ে তাদের একে অপরকেই বেশি প্রয়োজন।