Deepak Kumar

বীর নয়, মানুষ

দীপকের কাজটি বীরোচিত, কিন্তু তিনি বার বার বলছেন তিনি বীর হতে চাননি, একটি অন্যায় পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে এক জন নাগরিকের যে যৌক্তিক আচরণ কাম্য, তিনি তা-ই করেছেন।

শেষ আপডেট: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:১৬
দীপক কুমার।

দীপক কুমার।

উত্তরাখণ্ডের দীপক কুমার তথা ‘মহম্মদ দীপক’ বের্টোল্ট ব্রেখটের নাটক পড়েছেন কি না, আমাদের জানা নেই। ছোট্ট শহর কোটদ্বারের একটি জিমের মালিক ও প্রশিক্ষকের জীবনে সাহিত্যচর্চার অবকাশ হয়তো বিরল। তবে নিজের শহরে ক’দিন আগে এক প্রবীণ মুসলমান দোকানি ও তাঁর দোকানটিকে হিংস্র হিন্দুত্ববাদী দুর্বৃত্তদের হাত থেকে বাঁচাতে তিনি যেমন ‘বীরোচিত’ ভাবে, একার শক্তিতে রুখে দাঁড়ালেন, এবং তার পরের ঘটনাক্রম যে দিকে গড়াল, তা ব্রেখটের নাটকের সেই বহুচর্চিত সংলাপ মনে করাবে: দুর্ভাগা সেই দেশ, যেখানে শুধু বীরেরই প্রয়োজন হয়। ব্রেখটের নায়ক বিজ্ঞানীপ্রবর শেষাবধি ক্ষমতাতন্ত্রের কাছে বাহ্যত নতিস্বীকারে বাধ্য হয়েছিলেন। দীপকের বিরুদ্ধেও উত্তরাখণ্ড পুলিশ এফআইআর করেছে— অহিংসা ও মানবিকতা দিয়ে হিংসা রোখার, সহমানুষের মান রক্ষার আক্কেল সেলামি। এ তো তবু তাৎক্ষণিক ও প্রত্যক্ষ শাস্তি, সুদূরপ্রসারী ক্ষতিসাধনের চেষ্টাগুলি আরও ভয়ঙ্কর— মনে রাখা যাক, ঘটনার পর থেকেই দীপক আর তাঁর জিম খুলতে পারেননি, রোজগারের সংস্থান কার্যত বন্ধ, পাড়াপড়শি বড় একটা কাছে ঘেঁষছেন না, শিশুকন্যাটিকে আত্মীয়ের বাড়িতে দূরে পাঠিয়ে দিতে হয়েছে, বাড়িতে স্ত্রী ও বৃদ্ধা মা সন্ত্রস্ত দিনযাপন করছেন।

বীরের মহিমাকীর্তনের পর্বটি পেরিয়ে, যে লাঞ্ছনাময় রূঢ় বাস্তব দীপকের জন্য অপেক্ষমাণ তার সামনে দাঁড়ালে এই প্রশ্নটি জেগে ওঠে— দীপক কি তবে তাঁর প্রতিবেশী মুসলমান মানুষটির মান বাঁচিয়ে, বজরং দলের উগ্র জমায়েতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে ভুল করেছেন? যে কাজ করে সাময়িক ভাবে বিপদ ঠেকানো যায়, কিন্তু পরিবর্তে নিজের ও সম্ভবত যাঁর মান বাঁচানো হল তাঁরও বৃহত্তর বিপদপাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়, সে কাজ কি তবে শুভবোধসম্পন্ন মানবিক নাগরিক আর করবেন না— এই ভারতে? দীপকের কাজটি বীরোচিত, কিন্তু তিনি বার বার বলছেন তিনি বীর হতে চাননি, একটি অন্যায় পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে এক জন নাগরিকের যে যৌক্তিক আচরণ কাম্য, তিনি তা-ই করেছেন। মারমুখী হিন্দুত্ববাদীদের প্রশ্নের উত্তরে এক হিন্দু যুবকের ‘আমার নাম মহম্মদ দীপক’ বলা কোনও লোক-দেখানো বাহাদুরি নয়, সমানুভূতির অকৃত্রিম প্রকাশ। যে সমানুভূতি বলে, এক জন সংখ্যালঘু মানুষ নিজের বস্ত্রবিপণির নামে ‘বাবা’ শব্দটি রাখলে মহাভারত তিলমাত্র অশুদ্ধ হয় না, বরং যে বহুত্বের সহাবস্থান ভারতীয় ধর্ম সমাজ ও সংস্কৃতিকে বিশিষ্ট করে তুলেছে, তারই মান বাড়ে।

বহুত্ব, সহিষ্ণুতা, অসাম্প্রদায়িকতার মতো মূল্যবোধগুলি আজকের ভারতশাসকদের কাছে যে অনাদৃত, তা কোনও নতুন কথা নয়। কিন্তু এই সব কিছুর উপরেও মানবিকতা নামে একটি গোড়ার মূল্যবোধ আছে, যা সাধারণ মানবপ্রবৃত্তির চালিকাশক্তি। ধর্ম, পোশাক, খাদ্য, পেশা, আচার-অনুষ্ঠান, যা কিছু নিয়েই গোল বাধুক না কেন, অন্তত এই বিষয়টি এতকাল ভারতসমাজে প্রত্যাশিত ছিল যে— একের বিরুদ্ধে অনেকের অন্যায় আক্রমণ হলে ‘অন্য অনেক’ মানুষ এসে তার প্রতিবাদ করবেন, অন্তত মানবিকতার প্রণোদনায়। তাতে সমাজের একটা অংশ পাশে না দাঁড়াক, শাসক বা তার ধ্বজাধারী তাঁবেদাররা তর্জন-গর্জন করুক, আইন-শৃঙ্খলার নিয়ামকরা পর্যন্ত রক্ষকের পরিবর্তে ভক্ষক হয়ে উঠুক— যা কিছু সাদা চোখে অন্যায্য ও অমানবিক তার বিরুদ্ধে গলা তুলতে এই মানুষেরা দ্বিধা করবেন না। উত্তরাখণ্ডের ঘটনা কিন্তু দেখিয়ে দিল, মানবিকতার সেই বোধও আজ বিপন্ন, বিরল। সেই জন্যই মাত্র এক জন ‘মহম্মদ দীপক’ই এগিয়ে আসছেন; তাঁর যে প্রতিবাদ এক স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া বলে বোধ হওয়ার কথা, তাও এই ভারতীয় সমাজে বীরোচিত ঠেকছে। গালিলেয়োর ছাত্রের আক্ষেপ ছিল, দুর্ভাগা সেই দেশ, যেখানে এক জনও বীর নেই। দীপকের মতো বীরত্ব পরের কথা, বাদবাকি সমাজের ছিটেফোঁটা মানবিকতাও কি আর এই দুর্ভাগা দেশে অবশিষ্ট আছে!

আরও পড়ুন