স্কুলের সামনে অভিভাবকদের বিক্ষোভ। ছবি: সংগৃহীত।
আয়ুষ তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ত। আমার সন্তানের থেকেও এক বছরের ছোট। এ ভাবে স্কুলের গাফিলতিতে ওইটুকু শিশুর এমন পরিণতি কিছুতেই মানতে পারছি না। তাই তো সকলে মিলে মঙ্গলবার স্কুলের সামনে বিক্ষোভ দেখিয়েছি। মনের মধ্যে একটা চাপা অশান্তি কাজ করছে। মন থেকে মেনে নিতে পারছি না।
আমাদের অভিভাবকদের একটা হোয়াটস্অ্যাপ গ্রুপ রয়েছে। সোমবার সেখানে প্রথম এই খবর পাই। তার পর থেকে শান্তি পাচ্ছি না। যেটুকু শুনেছি, তাতে স্কুলের গাফিলতি ছিল বলেই আমাদের মনে হয়েছে।
গত ১৩ মে প্রথম ক্লাস থেকেই স্কুলের ভিতরে বছর আটেকের আয়ুষকুমার নাথ অসুস্থ হয়ে পড়ে। শুনেছি শ্রেণিশিক্ষিকাকে বলার পরে তিনি আয়ুষকে মাথা নিচু করে বসে থাকতে বলেন। আমরা জানি, স্কুলে সব বাচ্চাদেরই এ রকম বলা হয়। শুনেছি, এ ভাবে অনেকক্ষণ থাকার পরে নাকি আয়ুষের এক সহপাঠী শিক্ষিকাকে বলে, ওর বাড়িতে খবর দেওয়া দরকার। ওইটুকু শিশুর যে কথা মনে হয়েছিল, শিক্ষিকার তা মনে হয়নি! বরং পুরো ছ’টা পিরিয়ড আয়ুষ ও ভাবেই বসে থাকল ক্লাস ঘরে।
আরও অসুস্থ হয়ে পড়ল গরমে। ছুটি পর ওর নিশ্চয়ই মাথা ঘুরে গিয়েছিল। পিঠে ভারী ব্যাগ। সহপাঠীদের কাছে শুনেছি, এক মাসিকে ব্যাগের কথা বলাও হয়েছিল। কিন্তু আয়ুষের থেকে ব্যাগ চেয়ে নেননি কেউ। সিঁড়ি থেকে পড়ে যায় আয়ুষ। মাথায় আঘাত লাগে। বাড়ি ফিরে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে ছোট্ট ছেলেটা।
তিন দিন এখানকার এক বেসরকারি হাসপাতালে ছিল। পরে এসএসকেএম-এ ভর্তি করানোর হয়। অচৈতন্য হয়ে ছিল। রবিবার মারা যায় শিশুটি। এই বেদনাদায়ক ঘটনা আমাদের সকলকে অস্থির করে তুলছে। স্কুলের গাফিলতি ছিলই, নিন্দার ভাষা নেই। একজন পড়ুয়া শরীর খারাপ লাগছে বলা সত্ত্বেও স্কুল কর্তৃপক্ষ কোনও পদক্ষেপ করলেন না। একবার জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করলেন না, ওর কী অসুবিধা হচ্ছে।
প্রতিটি ক্লাসে ৪০-৪২ জন ছাত্রছাত্রী থাকে। দু’টি পাখা লাগানো রয়েছে ক্লাসঘরগুলিতে। অথচ, ভর্তির সময়ে ৩৩ হাজার টাকার বেশি ফি নেওয়া হয়েছিল। তারপরে বই-খাতা, ব্যাগের খরচ তো রয়েছেই। প্রতি বছর নতুন করে ভর্তি করাতেও কুড়ি হাজার টাকার বেশি দিতে হয়। অথচ, শিশুদের দিকে তাকানোর সময় হয় না কর্তৃপক্ষের। স্কুলের শৌচালয়ও ভাল নয়।
এত গরমে এ ভাবে কোনও শিশুকে বসিয়ে রাখে কেউ? শরীর খারাপ হওয়ার পরেও বাড়িতে কেন ফোন করা হল না? ওই স্কুলে আমার সন্তানও পড়ে। স্কুলের আচরণ যদি এত অমানবিক হয়, তা হলে অভিভাবক হিসাবে দুশ্চিন্তায় থাকব। তার মানে বোঝাই যাচ্ছে যে স্কুলের ব্যবস্থাপনাতেই গোলমাল রয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে স্থানীয় বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী এসেছিলেন। আমাদের জানিয়েছেন, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি ভেঙে দেওয়া হবে। জানি না প্রশাসন কী পদক্ষেপ করবে। কিন্তু এক মায়ের কোল খালি হয়ে গেল। কোনও মূল্যেই আর সেই ক্ষতিপূরণ হবে না।
লেখক : ওই স্কুলেরই চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রের বাবা