অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। — ফাইল চিত্র।
ভোটগণনা নিয়ে সরাসরি কারচুপির অভিযোগ তুললেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কমিশনকে চ্যালেঞ্জও ছুড়লেন তিনি। বললেন, অন্তত ১০টি গণনাকেন্দ্রের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করুক কমিশন। রাজারহাট-গোপালপুর তার মধ্যে অন্যতম। কমিশন তা করতে পারলে তিনি মেনে নেবেন যে, এটাই জনাদেশ। পাশাপাশি, তৃণমূলকর্মীদের মারধর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন অভিষেক। আঙুল তুলেছেন বিজেপির দিকে। তিনি জানান, বিজেপির শীর্ষনেতৃত্ব ‘ভরসা’ দিলেও শেষ পর্যন্ত কথা রাখা হয়নি। গত ২৪ ঘণ্টায় শ’য়ে শ’য়ে দফতরে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। কর্মীদের বাড়িতে ঢুকে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
মঙ্গলবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অভিষেক বলেন, ‘‘আপনারা দেখেছেন গণনাকেন্দ্রে থেকে তৃণমূলকে তাড়িয়েছে। সেই সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করুক কমিশন! তারা কিছু করলেই তো সংবাদমাধ্যমকে হোয়াটসঅ্যাপ করে। এটাও দিক।’’ অভিষেক সুর চড়িয়ে বলেন, ‘‘কমিশন বলুক, গণনাকেন্দ্রে কিছু হয়নি। আমি মেনে নেব, জনাদেশ রয়েছে।’’ তার পরে সরাসরি অভিষেক চ্যালেঞ্জ ছোড়েন কমিশনকে। তিনি বলেন, ‘‘আমি চ্যালেঞ্জ করছি, ১০০টি ফুটেজ দেব আমি, কমিশন অন্তত ১০টি (ফুটেজ) দিক। গণনাকেন্দ্রের সারা দিনের ফুটেজ দিক। বিশেষত (সোমবার) ১২টা থেকে ৬টার ফুটেজ দিক। জনতার উপরে ভরসা থাকলে, চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুন। সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করুন। ’’
অভিষেক এ-ও দাবি করেছেন যে, ইভিএমের নম্বর আর ১৭-সি অনেক জায়গায় মেলেনি। তাঁর কথায়, ‘‘আমি অভিযোগের প্রতিলিপি দিচ্ছি, যেখানে ইভিএমের নম্বর আর ১৭-সি মেলেনি। গণনার টেবিলে যে ইভিএম এসেছে, তা অন্য যন্ত্র ছিল। সোমবারও দিয়েছি কাউন্টিং এজেন্সিকে।’’ অভিষেক জানিয়েছেন, যে ইভিএম যন্ত্র ১২ ঘণ্টা ব্যবহার হয়েছে, তা যখন গণনার টেবিলে আনা হয়, তখন দেখা যায়, ওই যন্ত্রে ৯০ শতাংশ চার্জ রয়েছে। অভিষেকের প্রশ্ন, যে যন্ত্রে চার্জ কমে ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ হওয়ার কথা, সেখানে কী করে এত চার্জ থাকল। তাঁর কথায়, ‘‘কমিশন ফুটেজ দিক, তার পরে জনাদেশ রয়েছে মেনে নেব। লোকে যা আদেশ দেবে, মাথানত করে মেনে নেব। এটাই গণতন্ত্র।’’
এর পরেই কেন্দ্রীয় সরকারের দিকে সরাসরি আঙুল তুলেছেন অভিষেক। তিনি বলেন, ‘‘আবহ তৈরি করে লোককে ভোটার তালিকা থেকে বার করে, কখনও ইডি, সিবিআই, এনআইএ-কে দিয়ে নোটিস পাঠিয়েছে। কাউন্টিং এজেন্টদেরও নোটিস পাঠিয়েছে। কমিশনকে বলুন, দুপুর ১২টা থেকে ৬ টার ফুটেজ দিন।’’
অভিষেকের অভিযোগ, ধীর গতিতে গণনা হয়েছে। কেন তা হয়েছে, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘শুধু ভবানীপুর নয়, অনেক কেন্দ্রেই হয়েছে (ধীরে গণনা)। মঙ্গলবার ৩টে পর্যন্ত একটি আসনের ফল ঘোষণা হয়নি। কমিশনের ওয়েবসাইট বলল, ১৬ হাজার ভোটে তৃণমূল এগিয়ে রয়েছে। তার পরে ২ রাউন্ড রিকাউন্টিং হল। তার পরে বিজেপি ১০০ ভোটে জিতে গেল। কমিশনের কি সাহস আছে, রাত ৮টা থেকে ১২টা পর্যন্ত সিসিটিভি ফুটেজ দেবে রাজারহাট নিউটাউন আসনের?’’ অভিষেক কমিশনের দিকে আঙুল তুলে বলেন, ‘‘এজেন্টদের লাথি মেরে কেন্দ্রীয় বাহিনী তাড়িয়েছে। রিটার্নিং অফিসার আপনার লোক, মাইক্রো অবজার্ভার আপনার লোক, কাউন্টিং এজেন্ট, অবজার্ভার আপনার লোক। রক্ষাকারী কেন্দ্রীয় বাহিনী আপনার লোক!’’
এর পরে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুরেই অভিষেক বলেন, ‘‘আমরা হারিনি। লুট করে হারিয়েছে। আজ সকাল থেকে অন্তত ১০০ জন প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলেছি, যাঁরা অভিযোগ করেছেন। ইভিএমের ভোট হয়তো কারচুপি করা যায় না, কিন্তু ইভিএম বদল করা যায়!’’ তিনি কল্যাণী, মেমারি থেকে এ ধরনের অভিযোগ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘১০০ গণনাকেন্দ্র নিয়ে চ্যালেঞ্জ করে কোর্টে গেলে দেখা যাবে, দুপুর ২টোর পরে সেখানে কাউন্টিং এজেন্টদের মেরে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। ২টো পর্যন্ত যেখানে ৮০-৯০ শতাংশ গণনা হয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে ২-৩ রাউন্ড গণনা হয়েছে।’’ অভিষেক আরও বলেন, ‘‘২৪ রাউন্ড বাকি ছিল। ১০ শতাংশ কাউন্টিং করে এমন আবহ তৈরি করেছে, দেখিয়েছে, বিজেপি জিতেছে। গণনাকেন্দ্রে রাজ্যের লোক ছিল না। সকলে কেন্দ্রের লোক।’’
অভিষেক জানান, রাজ্যে তৃণমূল এবং বিজেপির ভোটের ফারাক ৩২ লক্ষ। ৩০ লক্ষ জনকে ভোটার তালিকা থেকে সরানো হয়েছে। সাত লক্ষ নতুন ভোটার যোগ করা হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘১০-১৫ লক্ষ গণনায় ম্যানিপুলেট করেছে। জনতার রায়ে ভরসা থাকলে গণনাকেন্দ্রে কেন্দ্র এবং রাজ্যের কর্মচারী— সকলকে রাখুন।’’
তার পরেই অভিষেক অভিযোগ করেছেন, ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকে তৃণমূলের কর্মীদের উপরে নির্যাতন চলছে। তাঁর কথায়, ‘‘যে ভাবে আমাদের উপর অত্যাচার হচ্ছে, পার্টি অফিস ভাঙছে, ঘরে ঢুকে মারছে, সকলকে বলব, তৃণমূলের সৈনিকোরা শক্ত থাকুন। দল আপনাদের সঙ্গে রয়েছে। যতদূর যেতে হবে, যাব। ১২ সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি রয়েছে।’’ তার পরেই তিনি আরও বলেন, ‘‘কর্মী খুন হয়েছে নানুরে। বেলেঘাটায় খুন হয়েছেন এক জন। ২৪ ঘণ্টা কাটেনি। ৩০০-৪০০ পার্টি অফিস ভেঙেছে ওরা। ১৫০ প্রার্থীর ঘরে ঢুকে হামলা করেছে। ঘরে, গ্যারেজে ঢুকে হামলা করেছে। এটা বিজেপির ভরসার মডেল! বাকি মানুষ স্থির করবে।’’
পশ্চিমবঙ্গে হবু বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠক করতে আসছেন অমিত শাহ। সেই প্রসঙ্গে অভিষেক বলেন, ‘‘অসুবিধা কী? আমরা চাই, বিজেপির নেতা, বিশেষত কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসুন এখানে। শুধু নির্বাচনের সময়ে আসেন, সেই নিয়ে তখন চ্যালেঞ্জ করেছিলাম।’’ অভিষেক জানান, রাহুল গান্ধীর সঙ্গেও তাঁর কথা হয়েছে। দলনেত্রীর সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন তিনি।