West Bengal Elections 2026 Voting Phase 2

কখনও তেড়ে গেলেন তৃণমূল কর্মীদের দিকে, কখনও খেলেন তাঁদেরই দেওয়া নরম পানীয়! ভবানীপুরে বহুরূপে শুভেন্দু

শুভেন্দু জেনেছেন, এই ৭৭ নম্বর ওয়ার্ডই মমতাকে ভবানীপুরে নিশ্চিত জয়ের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তাই ৭৭ নম্বর ওয়ার্ডের খিদিরপুর এলাকার এক হনুমান মন্দিরে সকাল সকাল পুজো দিতে যান তিনি।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ২০:৫০
BJP Suvendu Adhikari raced from one end of Bhabanipur to the other during the election days

শুভেন্দু অধিকারী। বুধবার ভবানীপুরে। —নিজস্ব চিত্র।

দিন শুরু করেছিলেন ৭৭ নম্বর ওয়ার্ড থেকে। তিনি জানতেন, ওই ওয়ার্ডই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশ্চিত জয়ের পথে এগিয়ে দেয়। তাই ওই ওয়ার্ডের এক হনুমান মন্দিরে সকাল সকাল পুজো দিতে গিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী।

Advertisement

বুধবার ছিল রাজ্যের ১৪২টি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোট। কিন্তু সারা রাজ্যের নজর ছিল ভবানীপুরে। যেখানে লড়াই হচ্ছে মমতার বনাম শুভেন্দু।

ভবানীপুরের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি ‘ওয়ার রুম’ খুলেছিলেন শুভেন্দু। ৭৭ নম্বর ওয়ার্ড থেকে তিনি সরাসরি যান ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের ওয়ার রুমে। সেখানে কর্মীদের কাছ থেকে ভোট সংক্রান্ত খোঁজখবর নিয়ে রওনা দেন ৮২ নম্বর ওয়ার্ডে। মেয়র ফিরহাদ হাকিমের ওয়ার্ডের চেতলা গার্লস স্কুলের বুথে গিয়ে ভোটপ্রক্রিয়া নিয়ে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেন। ফেরার সময় কাকতালীয় ভাবে মুখোমুখি হয়ে যান ফিরহাদ-তনয়া প্রিয়দর্শিনী হাকিমের। যদিও কোনও বাক্য বিনিময় হয়নি।

ওই বুথ থেকে বেরোনোর সময়েই শুভেন্দু জানতে পারেন, ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের চক্রবেড়িয়ায় ভোট পরিস্থিতি দেখতে গিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। শোনামাত্রই কনভয় ঘুরিয়ে চেতলা থেকে শুভেন্দু পৌঁছোন চক্রবেড়িয়া রোডের একটি স্কুলের বুথে। উত্তেজনা ছড়াতে পারে ভেবে এলাকায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হয়। যদিও মুখ্যমন্ত্রী বা বিরোধী দলনেতা কেউই তেমন কোনও পরিস্থিতি তৈরি হতে দেননি। মুখ্যমন্ত্রী মমতার মুখোমুখি হওয়ার আগেই এলাকা ছেড়ে পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হন শুভেন্দু। ৭২ নম্বর ওয়ার্ডের একটি বুথে গিয়ে প্রশ্নের জবাবে শুভেন্দু অভিযোগ করেন, মুখ্যমন্ত্রী বুথে বুথে ৫০-৬০ জন লোক নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। যা ‘আইনবিরুদ্ধ’ বলে তাঁর দাবি।

ততক্ষণে ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বোঝা গেল, শুভেন্দু আবহাওয়ার জন্য তৈরি হয়েই বেরিয়েছিলেন। ছাতা বার করে মাথা ঢাকা দেন বিরোধী দলনেতা। বিজেপির ক্যাম্প অফিসে বসে ফোন করে বিশদে খোঁজ নেন আবহাওয়ার। ফোন ছেড়ে বিজেপি নেতা নবীন মিশ্রকে বলেন, ‘‘আর বৃষ্টি হবে না। আমি খবর নিয়েছি। সবাইকে বলে দাও কেউ যেন বুথ না ছাড়ে।’’

অতঃপর শ্রীশিক্ষায়তন স্কুলের বুথে ভোট পরিস্থিতি দেখতে চলে যান শুভেন্দু। ওই স্কুলের বুথ থেকে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠার পরেই দিল্লি থেকে ফোন পান তিনি। ফোনে কথা বলে চলে যান নিজের আইসিসিআরের দফতরে। সেখান থেকে তাঁর সঙ্গে কথা হয় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের। আলোচনা হয় ‘মন্থর’ ভোটপ্রক্রিয়া নিয়ে। দক্ষিম ২৪ পরগনার ফলতার একটি বুথে ইভিএমে বিজেপি প্রার্থীর নামের জায়গায় সেলোটেপ লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও শাহের কাছে অভিযোগ করেন শুভেন্দু। শাহের পরামর্শেই কথা বলেন গোড্ডার বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবের সঙ্গে।

দুপুরের দিকে মুখ্যমন্ত্রীর ভোটকেন্দ্র মিত্র ইনস্টিটিউশনে যান বিরোধী দলনেতা। সেখানে বুথে কয়েকজন ভোটারের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায় তাঁকে। সেখান থেকে ভবানীপুর মুক্তদল মোড়ে যাওয়ার সময় একদল তৃণমূল সমর্থক পটুয়াপাড়ার দিক থেকে ধেয়ে যান শুভেন্দুর কনভয়ের দিকে। স্লোগান দিতে থাকেন, ‘‘চোর, চোর, চোরটা, শিশিরবাবুর ছেলেটা!’’ পাল্টা স্লোগান দেওয়া শুরু করেন শুভেন্দুর সঙ্গী বিজেপি কর্মীরা। স্লোগানযুদ্ধের পরিস্থিতিতে দু’পক্ষের কর্মীদের আক্রমণাত্মক মেজাজ দেখে গাড়ি থামিয়ে নির্বাচন কমিশনে ফোন করে শুভেন্দু বলেন, এলাকায় শীঘ্র বাহিনী পাঠাতে। দ্রুতই সেখানে আসেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানেরা। তাঁদের সঙ্গে করেই শুভেন্দু ধেয়ে যান তৃণমূল কর্মীদের দিকে। দৌড়তে দৌড়তে স্লোগান দিতে থাকেন, ‘‘হিন্দু-হিন্দু ভাই-ভাই।’’

পরে বিজেপি অভিযোগ করে, ৭৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তথা মুখ্যমন্ত্রীর ভ্রাতৃবধূ কাজরী বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশেই শুভেন্দুর কনভয়ের দিকে তেড়ে গিয়েছিলেন এলাকার তৃণমূল কর্মীরা। বাহিনী এসে পরিস্থিতি সামাল দেয়। শুভেন্দু তখন যান ৭৪ নম্বর ওয়ার্ডের ভোট পরিস্থিতির খোঁজ নিতে। আলিপুরের ওই অফিসে গিয়ে ওয়ার রুমে ঢুকে একান্তে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন।

ওয়ার রুম থেকে বেরিয়ে ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের একটি বুথে যাওয়ার সময় তৃণমূলের একটি অস্থায়ী ক্যাম্পের ঢুকে পড়েন বিরোধী দলনেতা। ওই ক্যাম্পের এক প্রবীণের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাঁর স্বাস্থ্য প্রসঙ্গে খোঁজখবর নেন। পাশে তৃণমূলের এক মহিলাকর্মীকে দেখে প্রণাম করে তাঁর সঙ্গেও কুশল বিনিময় করেন। ওই শিবিরেই দু’জন যুব তৃণমূলকর্মীর অনুরোধে তাদের হাত থেকে নরম পানীয়ের বোতল নিয়ে এক ঢোঁক গলায় ঢালেন।

৭১ নম্বর ওয়ার্ডের বিজেপির অস্থায়ী ক্যাম্পে গিয়ে বসে কর্মীদের ভোট পরিচালনার জন্য উৎসাহ দেন। সেখানে বিজেপি কর্মীদের অনুরোধে নরম পানীয়ে গলা ভেজান শুভেন্দু। এর পরে ৭৭ এবং ৮২ নম্বর ওয়ার্ডের কয়েকটি ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে গেলেও আর কোনও বুথে যাননি তিনি। একেবারে শেষে ৭৪ নম্বর ওয়ার্ডে তাঁর নির্বাচনী দফতরে সাংবাদিক বৈঠক করেন শুভেন্দু। দাবি করেন, ভবানীপুরের ৩৫ হাজার সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ২৮ হাজার। তাই ৭৭ নম্বর থেকে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী যে ব্যবধান পেয়ে জয়ের আশা করছেন, তা অনেকটাই কমে গিয়েছে।

ভোটের মাঝপথেই শুভেন্দু জানিয়েছিলেন, ভবানীপুরে ৮০ শতাংশ ভোট হলে তিনি জিতবেন। ৯০ শতাংশ ভোট হলে বড়সড় ব্যবধানে জিতবেন। আর ৫০ শতাংশ ভোট হলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। নির্বাচন কমিশনের হিসাব বলছে, সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ভবানীপুরে ভোট পড়েছে সাড়ে ৮৬ শতাংশ।

Advertisement
আরও পড়ুন