— প্রতীকী চিত্র।
রাজ্যে প্রথম দফায় ভোট কারা দিতে পারবেন, তা স্পষ্ট হয়ে যাবে মঙ্গলবার রাতের মধ্যেই। কমিশন সূত্রে খবর, ট্রাইবুনালে নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া ভোটারদের নাম বুধবারের মধ্যে প্রার্থী এবং রাজনৈতিক দলগুলিকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। বিধানসভা এবং বুথ অনুযায়ী তালিকা দেওয়া হবে। ওই তালিকায় যাঁরা ভোট দিতে পারবেন, তাঁদেরই নাম থাকবে। সেই সঙ্গে যাঁদের নাম ট্রাইবুনাল বাতিল করবে, তাঁদের নামও থাকবে। ২৩ এপ্রিল রাজ্যের ১৬টি জেলার ১৫২টি আসনে ভোট। তার ৪৮ ঘণ্টা আগে, মঙ্গলবার বিকেল ৪টে থেকে ওই জেলাগুলিতে শুরু হয়ে গিয়েছে ‘সায়লেন্স পিরিয়ড’।
সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ১৪২ ধারার ক্ষমতা প্রয়োগ করে জানিয়েছে, প্রথম দফার ১৫২টি আসনে (২৩ এপ্রিল) ভোট হওয়ার আগে ২১ এপ্রিল, মঙ্গলবার পর্যন্ত বাদ পড়া যে ভোটারদের আবেদন স্বীকৃতি পাবে, তাঁদের নাম সর্বশেষ ভোটার তালিকায় উঠবে। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ অগ্রবাল জানান, ট্রাইবুনাল যাঁদের ছাড়পত্র দেবে, তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় তুলে দেওয়া হবে। প্রথম দফায় কারা ভোট দিতে পারবেন, তা জানা যাবে মঙ্গলবার রাতের মধ্যেই।
প্রথম দফায় যে আসনগুলিতে ভোট রয়েছে, সেগুলিতে এসআইআর শুরু হওয়ার আগে ভোটারের সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৯৮ লক্ষ ১৪ হাজার ৮০১। সেখানে বিবেচনাধীন ভোটারের সংখ্যা ছিল ৩৬ লক্ষ ৫৮ হাজার ৫১৭। নিষ্পত্তির পরে শেষ পাওয়া পরিসংখ্যান অনুসারে, ওই আসনগুলিতে ভোটারের সংখ্যা হল ৩ কোটি ৬০ লক্ষ ৭৭ হাজার ১৭১। বিবেচনাধীনের তালিকায় থাকা যে ভোটারদের নাম বিচারকদের নির্দেশে ভোটার তালিকায় ওঠেনি, তাঁরা ট্রাইবুনালে আবেদন করেছেন। এ বার ট্রাইবুনাল সেই ভোটারদের আবেদন মঙ্গলবার রাতের মধ্যেই নিষ্পত্তি করবে। তার পরে যে ভোটার ভোটদানে ছাড়পত্র পাবেন, তাঁর নামও জুড়বে তালিকায়।
অন্য দিকে, মঙ্গলবার বিকেল ৪টের সময় ১৬টি জেলায় বন্ধ হল ভোটপ্রচার। জন প্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী, ১৯৫১-র ১২৬ ধারায় এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করার অধিকার রয়েছে নির্বাচন কমিশনের। কোনও ধরনের নির্বাচনী প্রচার, মতামত বা রাজনৈতিক প্রচারে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করা হয়। সিইও দফতরের তরফে প্রকাশিত ‘সায়লেন্স পিরিয়ড’ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, যাঁরা যে কেন্দ্রের ভোটার নন এবং বাইরে থেকে এসেছেন, তাঁদের প্রচার শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে (ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগে) এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হবে। জেলা নির্বাচনী আধিকারিক (ডিইও), পুলিশ সুপার ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সাহায্যে এই নির্দেশ কঠোর ভাবে কার্যকর করতে হবে। বহিরাগত রাজনৈতিক কর্মীদের শনাক্ত করার জন্য এলাকার হোটেল, লজ, গেস্ট হাউস, ধর্মশালায় চেকিং করতে হবে।
বাহিনী মোতায়েন
২৩ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফার বিধানসভা ভোট। কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রথম দফার ভোটে মোট ২,৪০৭ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করতে চলেছে তারা। কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, প্রথম দফায় সমগ্র উত্তরবঙ্গের জেলাগুলির ভোটগ্রহণ হয়ে যাবে— দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, উত্তর এবং দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদহ। পাশাপাশি, জঙ্গলমহলেও প্রথম দফায় নির্বাচন রয়েছে। ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়ার পাশাপাশি বীরভূম, মুর্শিদাবাদে এই দফাতেই ভোট হবে। অন্য দিকে, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর এবং পশ্চিম বর্ধমানেও এই দফায় ভোটগ্রহণ। প্রথম দফার ভোটে সবচেয়ে বেশি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন হচ্ছে মুর্শিদাবাদ জেলায়। তবে মুর্শিদাবাদ জেলাকে দু’ভাগে ভাগ করেছে কমিশন। এক, মুর্শিদাবাদ পুলিশ জেলা। দুই, জঙ্গিপুর পুলিশ জেলা। দুই মিলিয়ে মুর্শিদাবাদে মোট কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন হচ্ছে ৩১৬ কোম্পানি। তার মধ্যে মুর্শিদাবাদ পুলিশ জেলাতেই থাকবে ২৪০ কোম্পানি বাহিনী। বাকি ৭৬ কোম্পানি মোতায়েন হবে জঙ্গিপুরে। মুর্শিদাবাদের পরেই রয়েছে পূর্ব মেদিনীপুর। কমিশন জানিয়েছে, ওই জেলায় ২৭৩ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে। পশ্চিম মেদিনীপুরে ২৭১ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করছে কমিশন। বাঁকুড়ায় কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন হবে ১৯৩ কোম্পানি। তার পরেই বীরভূম। ওই জেলায় ১৭৬ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা করেছে কমিশন। এ ছাড়াও, মালদহে ১৭২ কোম্পানি, পুরুলিয়ায় ১৫১ কোম্পানি, কোচবিহারে ১৪৬ কোম্পানি, দক্ষিণ দিনাজপুরে ৮৩ কোম্পানি, ঝাড়গ্রামে ৭৪ কোম্পানি, দার্জিলিঙে ৬১ কোম্পানি, কালিম্পঙে ২১ কোম্পানি, জলপাইগুড়িতে ৯২ কোম্পানি, আলিপুরদুয়ারে ৭৭ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন হচ্ছে। উত্তর দিনাজপুরকেও পুলিশ জেলা হিসাবে দু’ভাগে ভাগ করেছে কমিশন। ইসলামপুর এবং রায়গঞ্জ পুলিশ জেলা। এই দুই পুলিশ জেলায় কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন থাকবে যথাক্রমে ৬১ কোম্পানি এবং ৭১ কোম্পানি। উত্তর দিনাজপুরে মোট ১৩২ কোম্পানি বাহিনী থাকছে। শিলিগুড়ি এবং আসানসোল-দুর্গাপুর কমিশনারেটে থাকছে যথাক্রমে ৪৪ কোম্পানি এবং ১২৫ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী।
প্রার্থী সংখ্যা
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দফায় ১৫২টি আসনে ভোটে লড়ছেন ১,৪৭৮ জন প্রার্থী। কোচবিহার দক্ষিণ এবং ইটাহার— প্রথম দফার এই দু’টি আসনে ভোটে লড়ছেন সবচেয়ে বেশি প্রার্থী। দু’টি আসনের প্রতিটিতে প্রার্থী সংখ্যা ১৫। কোচবিহার দক্ষিণ, ইটাহারে প্রার্থীর সংখ্যা প্রতিটিতে ১৫। মাথাভাঙা, ধূপগুড়ি (এসসি), ময়নাগুড়ি (এসসি), জলপাইগুড়ি (এসসি), ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি, চাকুলিয়া, রায়গঞ্জ, রতুয়া, সুজাপুর, রানিনগর, দুর্গাপুর পশ্চিম এবং রামপুরহাট কেন্দ্রে প্রার্থীর সংখ্যা প্রতিটিতে ১৪। প্রথম দফায় মনোনয়ন জমা পড়েছে ১,৫২৫টি। তার মধ্যে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা ১,৪৭৮। সবচেয়ে বেশি মনোনয়ন জমা পড়েছে করণদিঘি বিধানসভা কেন্দ্রে। ১৭টি। তার মধ্যে ২টি বাতিল হয়েছে। সবচেয়ে কম মনোনয়ন জমা পড়েছে এগরা, চন্দ্রকোনা (এসসি), শালবনি, শালতোড়ায় (এসসি)। এই কেন্দ্রগুলিতে ৬টি করে মনোনয়ন জমা পড়েছে। সবচেয়ে বেশি মনোনয়ন বাতিল হয়েছে নাগরাকাটা (এসটি), কার্শিয়ং, করণদিঘি, গঙ্গারামপুর (এসসি), গাজোল (এসসি), মোথাবাড়ি, সাগরদিঘি এবং বান্দোয়ানে (এসটি)। প্রতি কেন্দ্রে দু’টি করে মনোনয়ন বাতিল হয়েছে।
‘সায়লেন্স পিরিয়ড’
ভোট শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে থেকে শুরু হয়, ‘সায়লেন্স পিরিয়ড’। ‘সায়লেন্স পিরিয়ডে’ আইন মেনে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ মতো কাজ করতে হবে। এই মর্মে সব থানার ওসি-কে সার্টিফিকেট দিতে বলল নির্বাচন কমিশন। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতর সূত্রে খবর, মঙ্গলবার ওই সার্টিফিকেট দিতে হবে সংশ্লিষ্ট ওসি-দের। মঙ্গলবারই রাত ৯টার মধ্যে সব জেলার পুলিশ সুপারকে ওই বিষয়ে সিইও দফতরে রিপোর্ট দিতে হবে। কোনও ধরনের নির্বাচনী প্রচার, মতামত বা রাজনৈতিক প্রচারে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করা হয়। কমিশন জানিয়েছে, কোনও অফিসার যদি গাফিলতি বা পক্ষপাতিত্ব করেন, তা হলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাঁরা ওই কেন্দ্রের ভোটার নন এবং বাইরে থেকে এসেছেন, তাঁদের প্রচার শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে (ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগে) এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হবে। জেলা নির্বাচনী আধিকারিক (ডিইও), পুলিশ সুপার ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সাহায্যে এই নির্দেশ কঠোর ভাবে কার্যকর করতে হবে।
প্রচারে হেমা, অনুরাগ
পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফার ভোটপ্রচার শেষ হওয়ার ঘণ্টা কয়েক আগে কোচবিহারে রোড শো করলেন বিজেপি সাংসদ হেমা মালিনী। কোচবিহার দক্ষিণের বিজেপি প্রার্থী রথীন্দ্রনাথ বসুর হয়ে সেই রোড শো করেন হেমা। বিজেপির জেলা কার্যালয় থেকে রাসমেলা ময়দান, মিনা কুমারী চৌপথী হয়ে হুডখোলা জিপে চেপে রোড শো করেন তিনি। অন্য দিকে, কলকাতায় সাংবাদিক সম্মেলন সেরে পাত পেড়ে মাছ-ভাত খেলেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর। মনে করা হচ্ছে, তৃণমূলের কটাক্ষের জবাব দিতেই মাছ-ভাত খান তিনি। তার পরে মাছ হাতে নিয়েই অনুরাগ বলেন, ‘‘খান এবং খেতে দিন, তবে খাবার।’’ তৃণমূল প্রচারে বার বার দাবি করেছে, বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাঙালির মাছ-ভাত খাওয়া বন্ধ করে দেবে। মনে করা হচ্ছে, সেই কটাক্ষের জবাব দিয়ে বঙ্গবাসীকে আশ্বস্ত করতেই মাছ-ভাত খেলেন অনুরাগ। সেই আশ্বাসের সুরেই বলেন, ‘‘রাজ্যের মানুষের যা খুশি তা-ই খাবেন, নিজের ধর্মাচরণ করবেন। কিন্তু অন্যের খাদ্যাভ্যাস বা ধর্মাচরণে বাধাদান নয়।’’
শুভেন্দুর কেন্দ্রে রদবদল
নন্দীগ্রামের পুলিশ পর্যবেক্ষককে এ বার সরিয়ে দিল নির্বাচন কমিশন। ২৩ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার এই বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ রয়েছে। তার ৪৮ ঘণ্টা আগে ওই কেন্দ্রের পুলিশ পর্যবেক্ষক বদল করল কমিশন। নতুন পুলিশ পর্যবেক্ষক হিসাবে নিয়োগ করা হয়েছে অখিলেশ সিংহকে। নন্দীগ্রামে পুলিশ পর্যবেক্ষক হিসাবে হিতেশ চৌধরিকে নিয়োগ করেছিল কমিশন। কিন্তু সেই কমিশনই এ বার তাঁকে সরিয়ে নতুন পুলিশ পর্যবেক্ষক নিয়োগ করল। কেন এই বদল তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে কমিশন জানিয়েছে, অবিলম্বে বদলির নির্দেশ কার্যকর করতে হবে।
অধ্যাপকদের নিয়োগ
ভোটে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপকদের প্রিসাইডিং অফিসার হিসাবে নিয়োগ নিয়ে নির্বাচন কমিশন যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেটাই বহাল থাকবে। মঙ্গলবার এমনই জানাল কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি শম্পা সরকার এবং বিচারপতি অজয়কুমার গুপ্তের ডিভিশন বেঞ্চ। সহকারী অধ্যাপকদের ভোটের কাজে নিয়োগ নিয়ে সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশের উপর স্থগিতাদেশ দিল হাই কোর্ট।