—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
মাঠেই বস্তাবন্দি হয়ে পড়ে থাকা আলু রোদে-জলে পচে গিয়েছে। খেতের পাশে কটূ গন্ধ। পূর্ব বর্ধমানের মেমারি বিধানসভার কাঁটাপুকুর গ্রামে এই পরিস্থিতির কারণ জানতে চাওয়ায় চোয়াল শক্ত হল মজিদ রহমান, মতিন মণ্ডলদের। বললেন, ‘‘৫০ কেজি আলুর দাম ৮০ টাকা! সে আলু রাখার বস্তাই কিনেছি ২১ টাকায়। হিমঘরে রেখে ভাড়ার টাকাও উঠবে না। মাঠ থেকেও কেউ কেনেনি।’’
লাল স্বর্ণ ধানের বস্তা কোনও মতে প্লাস্টিকের চাদরে ঢাকা। অথচ, পাশেই রয়েছে মড়াই। ধান মড়াইতে রাখেননি? বর্ধমান ২ ব্লকের নবস্থা গ্রামের চাষি তপন সামন্তর দাবি, ‘‘এ বার ধানের দাম নেই। মড়াইতে রাখা, তার পরে আবার মড়াই ভাঙার খরচ পোষাবে না। এমনিতেই চাষের ঋণ শোধ করতে মাইক্রো-ফিনান্স সংস্থা থেকে ধার করতে হয়েছে!’’রাজ্যের ‘শস্য গোলা’ পূর্ব বর্ধমানের মূল ফসল ধান ও আলু। খরিফ মরসুমে বেশিরভাগ জমিতে লাল স্বর্ণ ধানের চাষ হয়। বোরো মরসুমে মূলত মিনিকিট ধান। রায়না থেকে ভাতার, নানা এলাকার চাষিদেরই অভিযোগ, যে হারে সার, বীজ বা কীটনাশকের দাম বেড়েছে, সে তুলনায় কৃষিপণ্যের দাম বাড়েনি। মাটির মান কমতে থাকায়, কমেছে উৎপাদন। কয়েক বছর আগেও বিঘা প্রতি যেখানে লালস্বর্ণ ধানের ফলন মিলত ১০-১১ কুইন্টাল, এখন তা দাঁড়িয়েছে ৮ কুইন্টালের আশেপাশে। সব মিলিয়ে,আয় কমেছে।
সরকার সহায়ক মূল্যে লাল স্বর্ণ চাল কেনে। বর্ধমান উত্তর, ভাতার বিধানসভার বহু চাষির অভিযোগ, সেখানে আবার ‘ফড়ে’র রমরমা। ভাতারের চাষি নবকুমার মালিকের ক্ষোভ, ‘‘চলতি মরসুমে সহায়ক মূল্যের থেকে খোলাবাজারে ধানের দাম কুইন্টাল প্রতি ৪০০-৫০০ টাকা কম ছিল। খোলাবাজার থেকে কম দামে ধান কিনে কিছু ফড়ে সহায়ক মূল্যে বিক্রি করেছে।’’ এখনও খোলাবাজারে ধানের দাম মিলছে না, দাবি ভাতারের সুফল মণ্ডল, জামালপুরের আব্দুল কালামের। তাঁদের অভিযোগ, কিসানমান্ডি তৈরি হলেও, ফসল বিপণনের উপযুক্ত পরিকাঠামো তৈরি হয়নি। সব চাষির ট্রাক্টর বা ধান নিয়ে যাওয়ার গাড়ি নেই। ধান রোয়া থেকে ফসল তোলা পর্যন্ত মহাজনের উপরে নির্ভরশীল অনেকেই। ফলে, ফড়েই ‘গতি’।
মিনিকিট ধান আবার সরকার কেনে না। চালকল মালিকেরাও কেনেন না। চাষিরা জানান, সে কারণে ফড়ে বা ধান ব্যবসায়ীদের মাধ্যমেই এই চাল বিক্রি করতে হয়। শক্তিগড়ের সফিক মোল্লা বলেন, “ধান চাষে আর আগের মতো লাভ করতে পারি না। সরকারেরই বা নজর কোথায়?’’
মেমারি, জামালপুর বিধানসভা এলাকার অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রয়েছে আলু চাষের। অতিরিক্ত ফলনে এ বার জমি থেকে ২-৩ টাকা কেজিতে আলু বিক্রি হয়েছে। সরকার কেজি প্রতি সাড়ে ৯ টাকা সহায়ক মূল্যে আলু কেনার কথা ঘোষণা করলেও, তা শুরু হয়েছে দেরিতে। ফলে, সে সুযোগ কত জন চাষি পেয়েছেন, প্রচারে বেরিয়ে বলতে পারছেন না তৃণমূল নেতা-কর্মীরাও। শক্তিগড়, জামালপুর, মেমারির আলুচাষিদের বড় অংশের দাবি, সহায়ক মূল্যে আলু কেনার ভার সরকার হিমঘর মালিকদের উপরে চাপানোয়, বিষয়টি নিয়েজট পেকেছে।
জেলার দক্ষিণ দামোদরের রায়না, খণ্ডঘোষ বিধানসভায় গোবিন্দভোগ ধান চাষের রমরমা। দক্ষিণ ভারত থেকে পশ্চিম এশিয়ার নানা দেশে গোবিন্দভোগের চাহিদা ভাল। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪-এর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গোবিন্দভোগ রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল কেন্দ্র। চাষি ও ব্যবসায়ীদের দাবি, রফতানি বন্ধ হতেই দাম তলানিতে পৌঁছয়। তখন থেকে দাম ক্রমাগত ওঠা-নামা করছে। রায়নার কুমোরপুরের চাষি কাজি সাইফুল হোসেন বলেন, “আমাদের ধান মজুতের ক্ষমতা নেই। তাই ফড়ের কাছে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি।”
ফসল নিয়ে এই অবস্থায় চাষিরা ঋণের ফাঁসে জড়াচ্ছেন। মেমারির বেগুট গ্রামের তাপস সরকার বলছিলেন, “ধানের দাম নেই। মাঠ থেকে তোলা আলুরও দাম মেলেনি। বোরো চাষের জন্য বাধ্য হয়ে ক্ষুদ্র ঋণদান সংস্থার কাছে হাত পাততে হচ্ছে।” ভাতারের সুফল মণ্ডলের দাবি, “চাষ করতে গেলে ঋণ নিতেই হয়। ফসলে লাভ না হলে, সেই ঋণ শোধ করার জন্য আবার অন্য সংস্থা থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছি।’’ বর্ধমান উত্তরের হাটগোবিন্দপুরের চাষি কল্যাণ সামন্তের কথায়, “বীজ, সার থেকে সেচের জল, সব ব্যবস্থা করতে গিয়ে ঋণে মাথা ডুবে যায়। সরকারই পারে এই অবস্থার পরিবর্তন করতে। কিন্তু কোনও দলই চাষের পরিকাঠামো উন্নয়নের কথা বলছে না।”
রায়না, খণ্ডঘোষ, জামালপুর, ভাতার, মেমারি, বর্ধমান উত্তর, বর্ধমান দক্ষিণ— এই সাত বিধানসভার সবক’টিতেই ২০২১-এ জিতেছিল তৃণমূল। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নানা সভায় দাবি করছেন, চাষিদের পাশে নানা ভাবে রয়েছে তৃণমূলের সরকারই। পূর্ব বর্ধমান জেলা তৃণমূল সভাপতি রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘তৃণমূল সরকার ‘কৃষকবন্ধু’র অনুদানের ব্যবস্থা করেছে। চাষিদের জন্য শস্যবিমার ব্যবস্থা হয়েছে। ফসলে ক্ষতি হলে তাঁরা ক্ষতিপূরণ পান। চাষিদের পাশে আছি। ফলও পাব।’’
বিজেপির রাজ্য নেতা তথা সাংসদ সৌমিত্র খাঁ প্রচারে এসে পাল্টা দাবি করেছেন, ‘‘ফসলের দাম নেই। তৃণমূলের সরকারের হুঁশ নেই। রাজ্যে আমাদের সরকার গঠন হলে শুধু ভিন্ রাজ্য নয়, বর্ধমানের চাষিদের ফসল বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।’’ সিপিএমের কৃষকসভার জেলা-নেতা বিনোদ ঘোষের অভিযোগ, ‘‘চাষিদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সমবায় বলে কিছু নেই। নানা জায়গা থেকে ঋণ নিতে গিয়ে তাঁরা জর্জরিত। হুঁশ নেই কোনও সরকারের, প্রচারে সে কথাই বলছি।’’ পচে যাওয়া আলুর বস্তা দেখিয়ে মজিদ, মতিনরা বলেন, ‘‘বড় কষ্টের ফসল, জানেন!’’