(বাঁ দিকে) অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (ডান দিকে)। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
সাংসদ হিসাবে নিজের লোকসভা কেন্দ্র ডায়মন্ড হারবারে স্বাস্থ্য পরিষেবা শিবির ‘সেবাশ্রয়’ শুরু করেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ইতিমধ্যেই পর পর দু’বছর সেই কর্মসূচি তিনি করে ফেলেছেন। তার পরে হীরক বন্দরের সীমানা পেরিয়ে অভিষেক তাঁর কর্মসূচি নিয়ে গিয়েছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর বিধানসভা কেন্দ্র নন্দীগ্রামে। অভিষেকের মস্তিষ্কপ্রসূত স্বাস্থ্য শিবিরের সাফল্য সকলেই স্বীকার করে নিয়েছেন। সেই স্বাস্থ্য শিবিরে ভিড় জমিয়েছেন দূরদূরান্তের রোগীরাও। ওই শিবিরের যে বিস্তৃতি হবে, তা প্রায় নিশ্চিত ছিল। তৃণমূলের সর্বময় নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় সেই ইঙ্গিত বার্তায় পরিণত হল। তৃণমূল চতুর্থবারের জন্য রাজ্যের ক্ষমতায় ফিরলে অভিষেকের সেই কর্মসূচি সরকারি মোড়ক পাবে। শুক্রবার বিধানসভা নির্বাচনের ইস্তাহার প্রকাশ করে তেমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলের শীর্ষনেত্রী।
নির্বাচনী ইস্তেহারের সঙ্গেই ‘দিদির ১০ প্রতিজ্ঞা’ প্রকাশ করা হয়েছে তৃণমূলের তরফে। সেই ১০টি প্রতিজ্ঞার অন্যতমটি হল, তৃণমূল সরকারে ফিরলে প্রতি বছর, রাজ্যের প্রতিটি ব্লকে স্বাস্থ্য পরিষেবা শিবির করা হবে সরকারি উদ্যোগে। অভিষেকের ‘সেবাশ্রয়’-এর নাম মমতা উল্লেখ করেননি বটে। তবে ওই স্বাস্থ্য পরিষেবা শিবিরের যে ধারণা তিনি দিয়েছেন, তা অবিকল ‘সেবাশ্রয়’-এর ধাঁচেই। ভোটের আগে তৃণমূলনেত্রী ইঙ্গিত দিয়ে দিয়েছেন, এ বার সরকারি উদ্যোগেই রাজ্যের ব্লকে ব্লকে স্বাস্থ্য পরিষেবা শিবির হবে। যাকে মমতা অভিহিত করেছেন ‘দুয়ারে স্বাস্থ্য’ বলে।
শুক্রবার তাঁর কালীঘাটের বাড়ির লাগোয়া দফতর থেকে নির্বাচনী ইস্তাহার প্রকাশ করেন মমতা। তাঁর পাশে ছিলেন অভিষেকও। প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যখন ডায়মন্ড হারবার লোকসভার অন্তর্গত সাতটি বিধানসভাতেই অভিষেক স্বাস্থ্য পরিষেবা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন, তখন বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছিল, মমতার হাতে থাকা স্বাস্থ্য দফতরকেই পরোক্ষে ‘চ্যালেঞ্জ’ করা হচ্ছে কিনা। সেই পর্ব থেকেই অভিষেক ধারাবাহিক ভাবে বলে আসছেন, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে তাঁর স্বাস্থ্য পরিষেবা কর্মসূচির কোনও ‘সংঘাত’ নেই। এটি সমান্তরাল কোনও স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরিরও চেষ্টা নয়। বরং মানুষের কাছে আরও নিবিড় ভাবে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াস মাত্র।
ডায়মন্ড হারবারে ‘সেবাশ্রয়’ প্রকল্পের সাফল্যের পরে নন্দীগ্রাম থেকে ওই শিবির করার অনুরোধ এসেছিল অভিষেকের দফতরে। বলা বাহুল্য, সেই অনুরোধে অভিষেক সাড়া দেন। চলতি বছর জানুয়ারি মাসে নন্দীগ্রামের দু’টি ব্লকে ১৫ দিন ধরে অভিষেকের স্বাস্থ্য পরিষেবার কর্মসূচি চলে। ১৫ জানুয়ারি শিবিরের সূচনার দিন নিজেও নন্দীগ্রামে গিয়েছিলেন অভিষেক। তখন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, শুধু নন্দীগ্রাম নয়, রাজ্যের সর্বত্র এই স্বাস্থ্য শিবির হতে পারে। মানুষকে স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার জন্য তাঁর ওই উদ্যোগ গোটা রাজ্যের যে কোনও বিধানসভা এলাকায় করা যেতেই পারে। শুক্রবার মমতার কথায় অভিষেকের সেই বক্তব্যেই ‘সরকারি সিলমোহর’ পড়ল।
প্রসঙ্গত, তৃতীয় মেয়াদে মমতার সরকারকে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য ক্ষেত্র নিয়েই সব থেকে বেশি ‘বিড়ম্বনা’ পোহাতে হয়েছে। নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার হয়ে জেলে গিয়েছিলেন মমতার সরকারের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়। একই মামলায় বিধায়ক মানিক ভট্টাচার্য গ্রেফতার হয়েছিলেন। বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ সাহা এখনও জেলবন্দি। উল্লেখ্য, ইস্তাহারে মমতা এ-ও ঘোষণা করেছেন যে, যথাযথ ভাবে সরকারি স্কুলগুলির পরিকাঠামো উন্নয়ন করা হবে। আধুনিক ব্যবস্থায় যাতে পড়ুয়ারা স্কুলের পঠনপাঠন পায়, তা নিশ্চিত করবে সরকার।
শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভের পাশাপাশিই ২০২৪ সালের অগস্ট মাসে আরজি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ করে খুনের ঘটনায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য প্রশাসন নিয়ে গণবিক্ষোভ আছড়ে পড়ে রাজপথে। তবে অক্টোবরের শেষ দিক থেকে সেই নাগরিক আন্দোলন স্তিমিত হতে শুরু করে। তার অব্যবহিত পরেই ডায়মন্ড হারবারে ‘সেবাশ্রয়’-এর প্রস্তুতি শুরু করে দেন অভিষেক।
প্রথম পর্বের ‘সেবাশ্রয়’-এ অত্যাধুনিক পরিকাঠামো দেখা গিয়েছিল ডায়মন্ড হারবারে। দ্বিতীয় পর্বে তা কলেবরে আরও বেড়েছিল। নন্দীগ্রামের দু’টি ব্লকের শিবিরেও ঝাঁ-চকচকে পরিকাঠামো তৈরি করেছিলেন অভিষেক। ডায়মন্ড হারবার লোকসভার সাতটি বিধানসভা এবং নন্দীগ্রামের ক্ষেত্রে ‘সেবাশ্রয়’ তৃণমূলের থেকে বেশি করে ‘অভিষেকের কর্মসূচি’ হিসাবেই উপস্থাপিত হয়েছিল। মমতা চতুর্থবার নবান্নে গেলে সেই কর্মসূচিতে ‘সরকারি মোড়ক’ পড়বে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তৃণমূল। সামগ্রিক ভাবে স্বাস্থ্যক্ষেত্র সম্পর্কে বলা হয়েছে, তৃণমূল ক্ষমতায় ফিরলে ব্লক স্তরের প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ন্যায্যমূল্যের ওষুধের দোকান রাখার পরিকাঠামোও গড়ে তোলা হবে।